বাংলাদেশের বিজয়ের মাস শুরু : ৭১’র যোদ্ধা না হয়েও অনেকে নিচ্ছেন সুযোগ-সুবিধা

16-december.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(১ ডিসেম্বর) :: আজ পহেলা ডিসেম্বর। শুরু হল মহান বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসেই অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। দীর্ঘ প্রায় ৯ মাসের সশস্ত্র যুদ্ধ শেষে এ মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ১৯৭১ সালে পহেলা ডিসেম্বরেই শত্রুমুক্ত হয় বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল। বিভিন্ন অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করতে এদিনই চলতে থাকে বিভিন্ন মিশন ও পরিকল্পনা। এদেশের দামাল ছেলেরা মরিয়া হয়ে একের পর এক সফল অপারেশনের মাধ্যমে পাক বাহিনী ও সহযোগী রাজাকারদের মনোবল ভেঙ্গে দিচ্ছিলো। আর বাঙালি অধীর আগ্রহে গুনছিল শেষ প্রহর, কখন আসবে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

সর্বশেষ এ মাসের ১৬ তারিখে আসে সেই মাহেন্দ্র ক্ষণ। আসে বাঙালির সেই কাঙ্ক্ষিত মহান স্বাধীনতা। পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় রক্তিম সূর্যের একটি লাল সবুজের দেশ, আমাদের বাংলাদেশ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্মরণীয়-বরণীয় এই মাস। পুরো মাস জুড়েই নানা আয়োজনে বিজয় উদযাপন করে বাঙালিরা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন ছাড়া বাঙালি জাতির ওপর অত্যাচার, নির্যাতন ও বঞ্চনার অবসান হবে না। তাই তিনি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বিশাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা দেন বাংলার স্বাধীনতার।

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’- ১৮ মিনিটের তার এই কালজয়ী ঘোষণার মধ্য দিয়ে মূলত সেদিন থেকেই শুরু হয় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।

প্রতিবাদী বাঙালিকে দমাতে পাকিস্তান বাহিনী একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানে চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। ‘অপারেশ সার্চ লাইট’ নামে পরিচালিত ওই অভিযানে নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এর পরপরই রাতের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।

বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করেন। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয়। এই সরকার ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে শপথ গ্রহণ করে এবং মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে।

স্বাধীনতার বিজয়ের ঠিক দুদিন আগে ১৪ ডিসেম্বর জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত বেদনা বিধুর একটি দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যখন ঠিক সুনিশ্চিত তখনই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসররা ১৪ ডিসেম্বর জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের রাতের আঁধারে নির্মমভাবে হত্যা করে।

দেশকে মেধাশূন্য করার অপচেষ্টা হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা হাতে নেয় পাকবাহিনী। এই হত্যাকাণ্ড ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম এক বর্বর ঘটনা যা বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষকে স্তম্ভিত করেছিল। এ দিবসটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। ওই দিন বিকেলে পাকিস্তানি বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। জাতি পায় স্বাধীন রাষ্ট্র, নিজস্ব পতাকা ও জাতীয় সংগীত।

বঙ্গবন্ধুর অপরিসীম ত্যাগ ও আপসহীন নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ৩০ লাখ শহিদ এবং দুই লাখ মা-বোনের অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। আর হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্বাধীনতার ৪৯তম দিবসে এসেছি আমরা।

মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল তালিকা হয়নি ৫০ বছরেও : ’৭১-এর যোদ্ধা না হয়েও অনেকে নিচ্ছেন সুযোগ-সুবিধা

নির্ভুল তালিকা হয়নি ৫০ বছরেও

বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে সরকারের কাছ থেকে প্রতি মাসে ভাতা পাচ্ছেন ১ লাখ ৮৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। বাকি ৫০ হাজারের ভাতা বন্ধ রয়েছে। কিন্তু কেন তাদের ভাতা বন্ধ তা পরিষ্কার করেনি সরকার। তাদের সনদও বাতিল করা হচ্ছে না। তবে তাদের অনেকের সন্তানরা এই সনদ দেখিয়ে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, এই ৫০ হাজার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। ভুল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েছেন। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ২৫৭ জনের সনদ বাতিল করেছে। এর মধ্যে বিভিন্ন বাহিনী ও সরকারি দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছেন। আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির বিষয়ে গত সেপ্টেম্বরে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে ‘প্রবাসে বিশ্বজনমত’ নামে আরেকটি শ্রেণি। এই শ্রেণিতে ওই মাসেই একজনকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও অন্য একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন তারা বলছেন, যে প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হচ্ছে তাতে কেয়ামত পর্যন্ত প্রকৃত তালিকা তৈরি করা সম্ভব হবে না। বরং অমুক্তিযোদ্ধারাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন, সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন।মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে লাল মুক্তিবার্তা, ভারতীয় তালিকা ও বিভিন্ন বাহিনীর গেজেটকে। আর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি মানদ  নির্ধারণ করে গত ২৪ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতীয় তালিকা, ভারতীয় তালিকা (পদ্মা), ভারতীয় তালিকা (মেঘনা), ভারতীয় তালিকা (সেক্টর) ও ভারতীয় তালিকা (সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী); লাল মুক্তিবার্তা, লাল মুক্তিবার্তা স্মরণীয় যারা বরণীয় যারা; বেসামরিক গেজেট, মুজিবনগর গেজেট, বিসিএস ধারণাগত জ্যেষ্ঠতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গেজেট, বিসিএস গেজেট, স্বাধীন বাংলা শব্দসৈনিক গেজেট, বীরাঙ্গনা গেজেট, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গেজেট, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ বাহিনী গেরিলা বাহিনী গেজেট ও বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়োজিত/দায়িত্ব পালনকারী মুক্তিযোদ্ধা গেজেট এবং সেনাবাহিনী-বিমানবাহিনী গেজেট, নৌবাহিনী গেজেট, নৌ-কমান্ডো গেজেট, বিজিবি গেজেট, পুলিশবাহিনী গেজেট ও আনসার বাহিনী গেজেটকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চিহ্নিত করতে যেখানে লাল মুক্তিবার্তা ও ভারতীয় তালিকা রয়েছে, সেখানে নতুন করে নানা ভাগে শ্রেণিবিন্যাস করে মুক্তিযোদ্ধা শনাক্ত করা নিয়েও আছে নানা বিতর্ক।

পেছনের কথা : দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮২-৮৩ সাল পর্যন্ত দেশে কোনো মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করা হয়নি। ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও চেয়ারম্যান হন। অথচ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বিধান অনুযায়ী কোনো অমুক্তিযোদ্ধার চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ নেই। এরশাদ মুক্তিযোদ্ধা না হয়েও সংসদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জোর করে। এটা ছিল প্রথমবারের মতো কোনো অমুক্তিযোদ্ধার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও প্রধান পৃষ্ঠপোষক হওয়ার ঘটনা।

এরশাদ সংসদের দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পর প্রথমবারের মতো মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করার উদ্যোগ নেন। তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ তালিকা তৈরির কাজ করেন। এতে সারা দেশে ১ লাখ ৩-৪ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হয়। তবে এ তালিকা নিয়ে সব মহলে বিতর্ক তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অনেক আওয়ামী লীগ নেতা এ তালিকার সমালোচনা করেন।

ওই সময় তারা বলেন, কোনোরকম যাচাই-বাছাই ও সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই মুক্তিযোদ্ধাদের এ তালিকা করা হয়। এরপর এ প্রক্রিয়া অনেকটা চাপা পড়ে যায়। এভাবে আরও বেশ কয়েক বছর কেটে যায়। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে অনেক পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারকে ২ হাজার এবং আহতদের ৫০০ ও ১ হাজার টাকা করে এককালীন ভাতা দেন। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আর কোনো কাজ হয়নি।

যদিও স্বাধীনতার দুই বছরের মধ্যে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত কিছু সার্টিফিকেট মুক্তিযোদ্ধা দাবিদার অনেককে দেওয়া হয়। পরে এ সার্টিফিকেট বাজারে বিক্রি হতে থাকে। এ সার্টিফিকেট নিয়েও তৈরি হয় নানা বিতর্ক। একইভাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব তসলিম আহমদের সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত কিছু সার্টিফিকেট দেওয়া হয় মুজিববাহিনী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) সদস্যদের।

শেখ হাসিনার নির্দেশেই তালিকা শুরু : মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল আহাদ চৌধুরী জানান, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসংবলিত দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

তার এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি কাদের এই সুযোগ-সুবিধা দেব?’ তখনই আহাদ চৌধুরী স্বচ্ছ তালিকা তৈরির একটা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রীর এতে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং কাজ শুরু করতে বলেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল তিন দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি ফরম্যাট উপস্থাপন করে।

তখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ১৯৯৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মহাপরিচালক মমিন উল্লাহ পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ইস্যু করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো ‘মুক্তিযোদ্ধা তালিকা চূড়ান্তকরণ’বিষয়ক ওই চিঠিতে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা কী পদ্ধতিতে হবে তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর দফতরের ওই চিঠি থেকে জানা যায়, এ ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রথম, একটি কমিটি গঠনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, কমিটিতে থাকবেন, ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সংশ্লিষ্ট সদস্য, কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি, জেলা কমান্ডের প্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট থানা কমান্ডের সব কর্মকর্তা, যুদ্ধকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের পাঁচজন কমান্ডার; সংশ্লিষ্ট থানার পাঁচজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এবং সংশ্লিষ্ট থানার অধীন প্রত্যেক ইউনিয়ন কমান্ডের কমান্ডার ও একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা।

দ্বিতীয়, যাচাই কার্যক্রম পদ্ধতি হবে- কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল কর্তৃক নির্ধারিত দিন, সময় ও স্থানে কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে কেন্দ্র থেকে প্রেরিত খসড়া তালিকা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট থানার মুক্তিযোদ্ধাদের একটি একটি করে নাম ও বিবরণ ঘোষণার পর কমিটি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলে নামের ডান পাশে ‘টিক’ চিহ্ন দেবে; না-সূচক জবাব দিলে নামের পাশে ‘ক্রস’(ী) চিহ্ন দেবে; ক্ষেত্রবিশেষ কমিটির সদস্যদের মত দ্বিধাবিভক্ত হলে ‘প্রশ্নবোধক’(?) চিহ্ন দেবে এবং সরেজমিন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে।

তৃতীয়ত, আপিল বোর্ড গঠন করা হবে। মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী কোনো মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হতে পারলে বা ফরম পূরণ করেননি এমন অভিযোগ করলে কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল আপিল বোর্ড গঠন করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

চতুর্থত, থানা পর্যায়ে গঠিত কমিটি কর্তৃক তালিকা চূড়ান্তকরণ বিষয়ে একই পদ্ধতি অনুসরণার্থে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল একটি গাইডলাইন তৈরি করবে এবং কমিটিকে তা অনুসরণ করতে অনুরোধ করবে।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই চিঠির ফরম্যাট অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে আবেদন আহ্বান করা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। ওই আহ্বানের পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবিদার প্রায় ৫ লাখ আবেদন জমা পড়ে। এসব আবেদন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করা হয়। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ১ লাখ ৫৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত করে লাল বই বের করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানান, এ তালিকা করার ক্ষেত্রে ভারতীয় তালিকাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতীয় তালিকায় ৫৫ থেকে ৫৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। যারা একাত্তরে ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তাদের নাম, ঠিকানা ভারতীয় বাহিনীর কাছে রয়েছে, যা ১৯৭৩ সালে ভারত সরকার ও সে দেশের সেনাবাহিনী বাংলাদেশ আর্মির কাছে হস্তান্তর করে। এ তালিকা চট্টগ্রামে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল কোর (ইবিআরসি) সংরক্ষণ করে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কাউন্সিলের তৎকালীন নেতা এবং এ তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৭৮ খে র লাল বই তৈরি করা হয়। তারপর একে সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, সাধারণসহ পৃথক আটটি খ  করা হয়। তার পরও যদি মুক্তিযোদ্ধারা বাদ পড়েন সেই সংখ্যা ১৫ থেকে ২০ হাজারের বেশি হবে না। তারা জানান, লাল বই তৈরির মধ্য দিয়ে ২০০১ সালের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা করা হয়।

তালগোল পাকায় বিএনপি-জামায়াত আমলে : ২০০১ সালের শেষ দিকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদে নিযুক্ত হন রেদওয়ান আহমদ। তিনি সব কাগজপত্র নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। তবে তিনি লাল বই নিতে পারেননি। তার পরই মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে তালগোল পাকানো শুরু হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলেই ৫০ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়। এদের বিষয়ে কোনোরকম যাচাই-বাছাই করা হয়নি। সেই যে মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করার প্রক্রিয়া শুরু হলো আজও সেই ধারাবাহিকতা চলছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে এবং চলছেও। অনেকেই বলছেন, এসব মুক্তিযোদ্ধার অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। আবার কারও কারও নাম বাদও পড়ছে। তবে এ সংখ্যা নগণ্য।

এসব মুক্তিযোদ্ধার বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম আরিফ-উর-রহমান গত বুধবার বলেন, যারা ভাতা পাচ্ছেন না তারা হয়তো ভাতার জন্য আবেদন করেননি। আবার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সঠিক তথ্য না থাকার কারণে প্রায় সাড়ে ৩ হাজারের ভাতা বন্ধ রয়েছে।

সচিবের মতে, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। তিনি বলেন, আমাদের এখানে যে সংখ্যা আছে তা সঠিক। গেজেটে যখন নাম আছে, সেটাই আমাদের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।

লাল বইয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধার কথা উল্লেখ করা হলেও এখন এত মুক্তিযোদ্ধা কীভাবে এবং কীসের ভিত্তিতে করা হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, সব রকম যাচাই-বাছাই করেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হয়েছে। কবে নাগাদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকা চূড়ান্ত হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, তালিকা তো চলমান। এটা বন্ধ হওয়ার সুযোগ নেই।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, দেশে মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা সব মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ থেকে ৮৫ হাজারের বেশি হবে না। লাল বইয়ে যাদের নাম আছে তারাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা উল্লেখ করে ওই সূত্রগুলো বলছেন, নানা কারণে বড়জোর ২৫ থেকে ৩০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন।

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri