বাংলাদেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোর “চিকিৎসক বিপণন ব্যয়” বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা !

doctor-medicine-money.jpg

কক্সবাংলা ডটকম(১ ডিসেম্বর) :: কিছুদিন আগে সপরিবারে ইন্দোনেশিয়ায় বেড়াতে যান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সরকারি হাসপাতালের একজন চিকিৎসক। এর ব্যয় বহন করে ওষুধ প্রস্তুতকারক একটি কোম্পানি। শুধু তিনি নন, তার বিভাগের প্রায় ১০ জন চিকিৎসক বিভিন্ন সময় সপরিবারে বিদেশ ঘুরে এসেছেন ওষুধ কোম্পানির টাকায়। ঢাকার আরেকটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের বাসায় এসেছে নতুন ফ্রিজ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে উপহারস্বরূপ ওই ফ্রিজ পাঠানো হয়েছে। কোম্পানির নিয়োগকৃত মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের (এমআর) মাধ্যমে চিকিৎসকের বাসায় উপহার সামগ্রীটি পৌঁছে দেয় ওষুধ কোম্পানি।

বিদেশ ভ্রমণ বা উপঢৌকন হিসেবে ফ্রিজ-টেলিভিশনই শুধু নয়, কোনো কোনো ওষুধ কোম্পানি চিকিৎসকদের ফ্ল্যাট-গাড়ির মতো দামি উপহারও দিয়ে থাকে। এসবই তারা করছে ওষুধ বিপণনের প্রয়োজনে। আর বিপণন বাবদ মোট টার্নওভারের ২৯ শতাংশের বেশি ব্যয় করছে কোম্পানিগুলো। দেশে ওষুধের বাজারের আকার এরই মধ্যে ২০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ হিসাবে শুধু বিপণন বাবদ ওষুধ কোম্পানিগুলো বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করছে।

যদিও ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধিনিষেধ থাকায় এ কৌশল অবলম্বন করছে তারা। কারণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া প্রচারমাধ্যমে ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচার ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ অবস্থায় ওষুধের বিজ্ঞাপন বাবদ বিপুল অংকের এ অর্থ ব্যয় কোথায় হয়, সে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন  প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। সেখানেও বিপণন বাবদ ব্যয় হওয়া এ অর্থ কে পায়, সুনির্দিষ্টভাবে তা বলা নেই। তবে বিপণন ব্যয়ের খাত সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। এমআরের মাধ্যমে চিকিৎসক ও ফার্মেসিতে ওষুধ পৌঁছে দিতে, হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরিতে ও বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ক্যাম্পেইনে এ অর্থ ব্যয় করছে কোম্পানিগুলো। টেন্ডার ও বিজ্ঞাপনেও কিছু অর্থ ব্যয় হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধ বিপণন একটি নিয়মের মধ্যে এলেও দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ওষুধ কোম্পানির টাকায় চিকিৎসকদের বিদেশ ভ্রমণ বা উপঢৌকন নেয়ার মতো অনৈতিক চর্চাগুলো তদারকির মধ্যে নেই। ফলে বিপণন খরচের বড় অংশ অনৈতিকভাবে ব্যয় হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি ড. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন ব্যয় কোনোভাবেই ১৫ শতাংশের বেশি হওয়ার যৌক্তিকতা নেই। বিশ্বের অনেক দেশে ওষুধের বিপণন নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে এ বিতর্ক নিরসনে বিপণন ব্যয়ে জাতীয়ভাবে নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে নৈতিক চর্চা প্রায় অনুপস্থিত। সরকারের উচিত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিপণনের খাতগুলো নজরদারির মাধ্যমে তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করা।

দেশের ওষুধ শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ শীর্ষক গবেষণার প্রয়োজনে ২৬টি কোম্পানির ওপর জরিপ চালান বিআইডিএসের গবেষকরা।

সমীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ওষুধ শিল্পের বার্ষিক টার্নওভারের ২৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ ব্যয় হয় বিপণনে। এ হিসাবে বার্ষিক বিপণন ব্যয় হয় ৬ হাজার ২২ কোটি টাকা। ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারে বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বিপণন ব্যয়ের এ পরিমাণকে অস্বাভাবিক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, এমআরের মাধ্যমে ওষুধগুলো চিকিৎসকের সহযোগিতায় ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর কৌশলই ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণ করে। চিকিৎসক, হাসপাতাল ও ফার্মেসিগুলোর ওষুধ পৌঁছে দিতেই এমআরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পণ্য বিপণনের বড় কৌশল এ এমআরদের ঘিরেই।

ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা চিকিৎসককে মোটিভেট করে। এমআরদের কাছে জানতে চাইলে তারা উপহার দেয়ার তথ্য জানিয়েছেন। বড় সেমিনারে পুরো পরিবারসহ যাওয়ার খরচ তারা বহন করেন। কিংবা হলিডে পালনের ব্যয়ও বহন করেন তারা। বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনও ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলো করে থাকে এমআরদের মাধ্যমে। শুধু চিকিৎসক নন, বড় ফার্মেসিতেও ওষুধ বিপণনের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ ব্যয় বহন করে থাকেন এমআররা, যা পণ্য মূল্যতেও প্রভাব রাখে।

গবেষণায় বিআইডিএস দেখিয়েছে, ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশজুড়ে আছে সেলস ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। ওষুধ প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মীর ৪ শতাংশ ফার্মাসিস্ট, ২ শতাংশ কেমিস্ট, ১ শতাংশ বায়োকেমিস্ট, অন্যান্য কারিগরি কর্মী ৬ শতাংশ, প্রশাসনিক ১৯ শতাংশ, উৎপাদনসংক্রান্ত নন-টেকনিক্যাল কর্মী ১৭ শতাংশ ও ড্রাইভার-অন্যান্য কর্মী ১ শতাংশ। সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ কর্মীর হার ১৯ শতাংশ ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের হার ৪৬ শতাংশ।

সেলস ও মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রগুলোও দেখানো হয়েছে বিআইডিএসের গবেষণায়। সমীক্ষার আওতায় থাকা ২৬ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৯৬ শতাংশ ওষুধ বিক্রি হয় বেসরকারি ফার্মেসিগুলোতে। বেসরকারি হাসপাতালে বিক্রি হয় ৭৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, চিকিৎসকের কাছে ৪৬ দশমিক ১৫, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় ২৩ দশমিক শূন্য ৮ ও দাতা সংস্থায় বিক্রি হয় ২৩ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য মাধ্যমে বিক্রি হয় ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

বিপণন কৌশলের পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণে সমীক্ষায় বিআইডিএস দেখিয়েছে, বিপণন কৌশলের ৩৬ দশমিক ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কাছে ওষুধ পৌঁছে এমআরের মাধ্যমে। কৌশলের ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে এমআরের মাধ্যমে ফার্মেসির কাছে ওষুধ পৌঁছে। ওষুধ প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি হাসপাতালের কাছে পৌঁছার কৌশল ব্যবহার হয় ১২ দশমিক ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে। বিভিন্ন সংস্থার কাছে প্রচারণা চালানোর কৌশলের হার ৭ দশমিক ৬৯। প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসকের কাছে ওষুধ পৌঁছার কৌশল অনুসরণ হয় ৬ দশমিক ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে। টেলিভিশন ও অন্যান্য বিজ্ঞাপন মাধ্যম ব্যবহারে কৌশলের হার ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। অন্যান্য ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ।

ওষুধ বিপণন ব্যয়ের হারের যৌক্তিকতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ওষুধ শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও রেনাটা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সৈয়দ এস কায়সার কবির বলেন, বিপণন ব্যয় বেড়ে যাওয়া দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা। এর প্রভাবে দেশের ওষুধ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। মূলত ব্লকবাস্টার পণ্যের স্বল্পতা বিপণনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ।

 

Share this post

PinIt
scroll to top
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri