buy Instagram followers
kayseri escort samsun escort afyon escort manisa escort mersin escort denizli escort kibris escort rize escort sinop escort usak escort trabzon escort

সমুদ্র সৈকতে পর্যটক নাই, তাই জমছে না কক্সবাজারের ব্যবসাও

beach-.jpg

আব্দুল কুদ্দুস রানা,প্রথম আলো(৩০ জুলাই) :: ২৮ জুলাই, বেলা তিনটা। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট। এ পয়েন্ট দিয়েই বেশির ভাগ পর্যটক সমুদ্রসৈকতে নামেন। বালুচরে সারিবদ্ধভাবে তৈরি শতাধিক দোকান। দোকানে সাজিয়ে রাখা শামুক-ঝিনুক দিয়ে তৈরি রকমারি আসবাব ও গয়না। আছে আচার, প্রসাধন সামগ্রী। কিছু দোকানে রাখা পোশাক, শুঁটকি, ডাবসহ অন্যান্য মালামাল। একটি দোকানে বসে মুঠোফোনে হিন্দি সিনেমার গান দেখছিলেন তরুণ কর্মচারী সিরাজুল ইসলাম। দোকানে ঢুকতেই তাঁর জিজ্ঞাসা, ‘আসেন স্যার, কী নিবেন দেখুন স্যার?’

 ব্যবসার কী অবস্থা?

জবাবে সিরাজুল বললেন, ‘ব্যবসা নেই, খুবই খারাপ অবস্থা। করোনায় সৈকতে পর্যটক নাই, তাই ব্যবসাও জমছে না। লকডাউনের কারণে ২০ মার্চ থেকে টানা চার মাস দোকান বন্ধ। ১০-১২ দিন হলো দোকান খুলেছেন, কিন্তু বিক্রিবাট্টা নাই।’

আক্ষেপের সুরে সিরাজুল আরও বলেন, করোনার আগে সৈকতে দিনে বিক্রি হতো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার আচার ও ঝিনুক পণ্য। আর এখন এক টাকাও না।

কিছুক্ষণ পর দোকানে এলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের একজন সদস্য। তিনি পাঁচটার আগে দোকান বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে গেলেন।

দোকানের ১০ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছেন লাল পোশাক পরা দুই তরুণ। তাঁদের গলায় ঝুলছে পরিচয়পত্র, হাতে পুরোনো ডিজিটাল ক্যামেরা। তাঁরা ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার। সৈকতে আসা পর্যটকদের ছবি তুলে দিয়ে যে টাকা আয় হয়, তার একটি অংশ তাঁরা পেয়ে থাকেন।

পর্যটক মনে করে দুই ফটোগ্রাফারই ছুটে এলেন। কামরুল নামের একজন বললেন, ‘স্যার ছবি তুলবেন? যেভাবে বলেন, সেভাবেই তুলে দেব, ছবি সুন্দর না হলে টাকা দিয়েন না।’

জানতে চাইলাম, ছবি তুলে আজ কত টাকায় আয় হয়েছে? জবাবে কামরুল বললেন, এক টাকাও না। সারা দিন মিলে একজন লোকও পাওয়া যায়নি ছবি তোলার জন্য। চার মাস ধরে বেকার।

অন্যজন বললেন, ‘সরকার দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন সবকিছু খুলে দিয়েছে। কিন্তু পর্যটকদের জন্য কেন সমুদ্রসৈকত উন্মুক্ত করে দিচ্ছে না বুঝতে পারছি না। পর্যটক না এলে কক্সবাজারের কোনো ব্যবসাই হবে না।’

সৈকতে ভ্রাম্যমাণ ফটোগ্রাফার আছেন প্রায় ৬০০। সিগাল পয়েন্টে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক ফটোগ্রাফার মো. সোহেল। তাঁর মুখেও ক্লান্তির চাপ। সোহেল বললেন, আগে ছবি তুলে দিনে তিন হাজার টাকাও আয় করেছেন। গত চার মাসে ঠিক তাঁর উল্টো। অনাহারে-অর্ধাহারে চলছে জীবন।

সোহেলের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। তিন বছর ধরে তিনি সৈকতে ফটোগ্রাফারের কাজ করছেন। আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি পরিবারের জন্য পাঠান। এখন নিজেরই চলতে কষ্ট হচ্ছে।

ফটোগ্রাফারদের সংগঠন ‘স্টুডিও সমবায় সমিতির’ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, পর্যটক না থাকায় প্রায় ৬০০ ফটোগ্রাফার কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। জীবন চালাতে অনেকে পথে পথে চা বিক্রি করছেন। কেউ দিনমজুরি। আবার কেউবা রিকশা চালানোসহ অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়েছেন।

সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে দক্ষিণ দিকে কলাতলী ও উত্তর দিকে সিগাল, তারপর লাবণী পয়েন্ট। মোট চার কিলোমিটার সৈকতে কাউকে পাওয়া গেল না কথা বলার জন্য। কয়েকটি পয়েন্টে পাহারা বসিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। তাঁদের দায়িত্ব কোনো লোক সৈকতে নামলে হুইসেল বাজিয়ে তাঁদের উঠিয়ে দেওয়া।

লাবণী পয়েন্টেও রয়েছে ঝিনুক-শামুক দিয়ে তৈরি রকমারি পণ্য বিক্রির কয়েক শ দোকান। আছে শুঁটকি মাছ ও খাবার বিক্রির একাধিক দোকান-রেস্তোরাঁও। পর্যটক নেই, তাই অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ।

একটি রেস্তোরাঁয় বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। আলোচনায় মূল বিষয় ঈদুল আজহার পর প্রশাসন সমুদ্রসৈকত পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে কি না? বেশির ভাগ সদস্যের অভিমত, ঈদের পর অবশ্যই সৈকত উন্মুক্ত হবে, তখন পর্যটকের ঢল নামলে ব্যবসা চাঙা হবে।

ঝিনুক ব্যবসায়ীদের সংগঠন ‘কক্সবাজার সৈকত ঝিনুক ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি’র সভাপতি মো. রুবেলের মুখেও একই সুর। বললেন, পর্যটক না এলে কক্সবাজারের কোনো ব্যবসাই জমবে না।

সৈকতের মূল আকর্ষণ ‘কিটকট’ চেয়ার-ছাতা। পানি বরাবর বালুচরে সারিবদ্ধভাবে বসানো থাকে কিটকট। পর্যটকেরা কিটকটে বসে সমুদ্র দর্শন, পশ্চিম আকাশে অস্তগামী সূর্য এবং রাতে সমুদ্রের গর্জন উপভোগ করেন। কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত বসানো থাকে অন্তত দেড় হাজার কিটকট। আর এখন পুরো সৈকতে একটাও কিটকট নেই। সব কিটকট বালুচরের বিভিন্ন অংশে স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে।

কিটকট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, করোনাকাল বলেই এই অবস্থা। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাঠের কিটকটগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভাঙাচোরা চেয়ারগুলো পুনরায় সংস্কার করার সামর্থ্য কারোর নেই।

সৈকতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ১৮ মার্চ থেকে পর্যটকসহ স্থানীয় কাউকে সৈকতে নামতে দেওয়া হচ্ছে না জানিয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশের এসপি মো. জিললুর রহমান বলেন, এ জন্য সৈকতে ১০টি পয়েন্টে পাহারা বসিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।

যেন বিরানভূমি। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক। ছবি: প্রথম আলো

যেন বিরানভূমি। কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক।

১২০ কিলোমিটার সৈকত ফাঁকা

কক্সবাজার চেম্বারের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরীর ভাষ্য, করোনার প্রভাবে কক্সবাজারের পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল, সাত শতাধিক রেস্তোরাঁ, দুই শতাধিক শুঁটকির দোকান, দুই হাজার অন্য পণ্যের দোকানপাটসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা খাতে ব্যবসায় ক্ষতি হয়েছে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার। এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় তিন লাখ মানুষ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে সীমিত আকারে হলেও হোটেল মোটেল, রেস্তোরাঁ খুলে দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা বাড়লে কক্সবাজারে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। তাই শর্ত সাপেক্ষে ঈদুল আজহার পর সীমিত আকারে হোটেল মোটেল ও সৈকত উন্মুক্ত করে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে। তবে সেটাও নির্ভর করছে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ওপর।

সংক্রমণে কক্সবাজারের অবস্থান চতুর্থ

২৯ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ৩২৯। এর মধ্যে মারা গেছেন ৫৯ জন। শনাক্তদের মধ্যে অন্তত ১ হাজার ১০০ জন রয়েছেন শুধু সৈকত তীরের কক্সবাজার পৌরসভার।

জেলা সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান বলেন, সংক্রমণ রোধে ৬ জুন পুরো পৌরসভাকে রেড জোন ঘোষণা করে ১৪ দিনের কঠোর লকডাউন করা হয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয় আরও ১০ দিনের লকডাউন। এখন করোনা রোগী শনাক্তের জন্য পৌরসভার ১২টি ওয়ার্ডে ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবী দিয়ে ‘কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং’-এর কাজ চলছে। এমন পরিস্থিতিতে শহরে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটলে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে।

ফাঁকা ৫০০ হোটেল

২৫ জুলাই, বিকেল চারটা। সৈকতের কলাতলী ও লাবণী পয়েন্টের মধ্যভাগে সিগাল পয়েন্ট। এ পয়েন্ট দিয়ে ভিআইপি টাইপের লোকজন সৈকতে ওঠানামা করেন। কারণ এ পয়েন্ট দিয়ে সৈকতে নামার জন্য বালুর ওপর দৃষ্টিনন্দন কাঠের সেতু বানিয়ে দিয়েছে তারকা হোটেল সিগাল কর্তৃপক্ষ। করোনার আগে এই সেতু লোকজনে ভরপুর থাকত। এখন ফাঁকা। কয়েকটি ছিন্নমূল শিশু সেতুর পাশে বসে খেলা করছিল। তাদের একজন সোহেল বলল, পর্যটক থাকলে তারা গান শুনিয়ে, শরীর ম্যাসাজ করে দিয়ে ২০০-৫০০ টাকা পেত। এখন সে পথ বন্ধ।

সেতুর উল্টো পাশে বিশাল তারকা হোটেল ‘সি-গাল’। হোটেলের প্রধান ফটকটি বন্ধ। ভেতরে দাঁড়ানো দুই নিরাপত্তাকর্মী। গেট বন্ধ কেন জানতে চাইলে একজনের জবাব, ‘স্যার, ট্যুরিস্ট নাই চার মাস, তাই হোটেল বন্ধ।’ ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, শহরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সুইমিংপুলটি ফাঁকা পড়ে আছে। হোটেলে নেই কোনো অতিথি। এই হোটেলে ১৭৯টি কক্ষে রাত যাপনের ব্যবস্থা আছে ৩৫০ জন অতিথির।

হোটেলের প্রধান নির্বাহী শেখ ইমরুল ইসলাম ছিদ্দিকী বলেন, করোনাকাল, করার কিছুই নেই। ২০ মার্চ থেকে হোটেল বন্ধ। প্রতি মাসের বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খরচ প্রায় ১০ লাখ টাকা। করোনাকালে এই একটি হোটেলেই অন্তত সাত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে হলেও হোটেল, মোটেল খুলে দেওয়া না হলে হোটেলমালিকদের পথে বসতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সিগাল হোটেলের দুই পাশে ও পেছনে রয়েছে হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইস, হোটেল কল্লোল, মিডিয়া ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল অভিসার, সি ওয়ার্ল্ড, হোটেল কক্স টুডেসহ অন্তত দুই শতাধিক হোটেল ও গেস্টহাউস। সব হোটেলই বন্ধ।

একই অবস্থা বিদেশি পর্যটকদের পছন্দের জায়গা পরিবেশবান্ধব পর্যটনপল্লি ‘মারমেইড বিচ রিসোর্ট’-এর। শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে প্যাঁচার দ্বীপের এই রিসোর্টে ২৭ জুলাই বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে, প্রধান ফটকটি তালাবদ্ধ। চার-পাঁচজন কর্মচারী সেখানে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছেন।

রিসোর্টের মহাব্যবস্থাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, মার্চ থেকে তাঁরা রিসোর্ট বন্ধ রেখেছেন। চালুর ব্যাপারে তাঁরা এখনো প্রশাসনের নির্দেশনা পাননি। রিসোর্টের ৩৫০ জন কর্মচারীর বেতন-ভাতা, বিদুৎ বিলসহ নানা খাতে তাঁদের প্রতি মাসে লোকসান যাচ্ছে ২৫ লাখ টাকা। করোনাকাল হলেও এই রিসোর্টে কোনো কর্মচারী ছাঁটাই হয়নি। রিসোর্টের ৫১টি কটেজে ১০০ জন অতিথি থাকার ব্যবস্থা আছে।

সৈকত এলাকার ছোট-বড় মিলে হোটেল, মোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ আছে পাঁচ শতাধিক। হোটেল, মোটেলে অতিথি রাখার ধারণক্ষমতা প্রায় দুই লাখ। করোনা সংক্রমণ রোধে ১৮ মার্চ থেকে সৈকতে পর্যটকের আগমন নিষিদ্ধ করা হয়। এতে হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁসহ বিনোদনকেন্দ্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে পড়ে।

কলাতলী হোটেল, মোটেল জোনে ছোট আকৃতির কটেজ আছে ১২০টি। প্রতিটা কটেজে ঝুলছে তালা। একটি কটেজের এক কর্মচারী বললেন, পর্যটক আসা নিষিদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ ৯৫ শতাংশ জনবল ছাঁটাই করেছে বেতন ছাড়াই। কর্মচারীদের জীবন কীভাবে কাটছে, সেই খবর নেওয়ার লোক নেই।

অধিকাংশ হোটেলমালিক প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের এপ্রিল, মে, জুন মাসের বেতন, হোটেলের বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন দাবি করে ‘কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, চার মাসে এখানকার হোটেল-মোটেলেই দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন সীমিত আকারে হলেও হোটেল-রেস্তোরাঁ খুলে দেওয়া দরকার বলে দাবি করেন তিনিও। মুকিম খান বলেন, তাঁদের সমিতিভুক্ত ৫২ হোটেলে কর্মচারী ছিলেন তিন হাজার। এর মধ্যে দেড় হাজার কর্মচারীকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুবীর চৌধুরী বলেন, ৩১ মে সারা দেশে লকডাউন তুলে নেওয়া হয়েছে। এরপর গণপরিবহন-অফিসসহ অনেক কিছু সীমিত আকারে খুলে দিয়েছে সরকার। এর আওতায় কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প সীমিত আকারে চালু হলে শ্রমিক-কর্মচারীরা জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পেতেন। ক্ষতিগ্রস্ত পর্যটনশিল্প কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেত।

ফাঁকা সৈকতের বালুচরে ডালপালা মেলেছে সবুজ সাগর লতা। ছবি: প্রথম আলো

বিপাকে তরুণ উদ্যোক্তা

শহরের ঝাউতলার একটি ভবনের নিচতলায় ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান ‘ডাইনেস্টি ট্যুর অ্যান্ড ইভেন্ট’। ২৭ জুলাই বিকেলে এটি বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানের সামনে পায়চারি করছিলেন কলেজছাত্র নুরুল হাসান। তাঁর মতো বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজপড়ুয়া ১৬ জন তরুণ-তরুণী মিলে যৌথ তহবিলে গড়ে তোলেন প্রতিষ্ঠানটি।

গত বছরের ডিসেম্বরে মাঠে নামেন এই তরুণ উদ্যোক্তারা। নুরুল হাসান বলেন, বেশির ভাগ পর্যটক কক্সবাজার আসেন সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের জন্য। ২০ মার্চ থেকে সেন্ট মার্টিন যাতায়াত বন্ধ, তাই ব্যবসাও অচল। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল বলেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি তিন মাস তাঁদের ভালো ব্যবসা হয়েছে। করোনার কারণে মার্চ থেকে সবকিছু লন্ডভন্ড।

পর্যটকদের সেন্ট মার্টিন, টেকনাফ, মহেশখালী, চকরিয়া ডুলাহাজার সাফারি পার্ক, হিমছড়ি-ইনানী ও রামু বৌদ্ধপল্লিসহ বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটিতে আনা-নেওয়ার ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান আছে প্রায় ২০০। গত ২০ মার্চের পর থেকে সব কটি বন্ধ। ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ‘ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুয়াক) সভাপতি তোফায়েল আহমদ বলেন, করোনায় ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানগুলোর ১২ হাজার বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও কর্মচারী চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন। অনেকের জীবন এখন কাটছে কষ্টে। সীমিত আকারে হলেও হোটেল-মোটেলসহ বিনোদনকেন্দ্র খুলে দিয়ে পর্যটকদের ভ্রমণে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য তাঁরও।

বিক্রির জন্য তৈরি হচ্ছে শুঁটকি। কিন্তু কেনার লোক নেই। ছবি: প্রথম আলো

অন্ন কষ্ট লাখো শ্রমজীবীর

২৪ জুলাই বেলা তিনটা। সৈকতের কেএফসি রেস্তোরাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন কর্মজীবী নারী খালেদা বেগম। পাশের আরেকটি রেস্তোরাঁয় পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। রেস্তোরাঁটি খুলেছে কি না, দেখতে এসেছেন। রেস্তোরাঁ বন্ধ দেখে বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। হতাশ মুখে খালেদা বলেন, করোনার আগে ওই রেস্তোরাঁয় কাজ করে তিনি দিনে মজুরি পেতেন ৪০০ টাকা। সেই টাকায় সংসার চলত। অসুস্থ স্বামীর ওষুধ কেনাসহ দুই সন্তানের পড়ালেখার খরচ চালাতেন। এখন খেয়ে না-খেয়ে জীবন চলছে তাঁদের। ইতিমধ্যে ৩৪ হাজার টাকা ধারকর্জ হয়ে গেছে। এখন হাত পাতার জায়গা নেই।

কক্সবাজার হোটেল ম্যানেজার ও অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য, করোনায় হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে বেতন-ভাতা না দিয়েই বাধ্যতামূলক ছুটিতে (ছাঁটাই) পাঠিয়েছে মালিকপক্ষ। অধিকাংশ কর্মচারীর বসতি শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাড়িতে। এখন তাঁরা চরম অর্থসংকটে দিন কাটাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তাঁদের কেউই ত্রাণসহায়তা পাননি।

নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজারের পর্যটনের ভরা মৌসুম। হোটেল মালিক সমিতির তথ্য, গত নভেম্বর থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত চার মাসে কক্সবাজারে ভ্রমণে এসেছে অন্তত ১৮ লাখ দেশি বিদেশি পর্যটক। এর মধ্যে রোজার ঈদের টানা আট-নয় দিনের ছুটিতে এসেছিলেন ৫-৭ লাখ পর্যটক। হোটেল ব্যবসা তখন লাভজনক হলেও করোনাকালে কর্মচারীদের পাশে নেই মালিকপক্ষ।

কর্মচারীদের জীবনমানের উন্নয়নে পর্যটক আগমন নিশ্চিত করতে হোটেল-মোটেল, বিনোদনকেন্দ্র ও সমুদ্রসৈকত উন্মুক্ত করার দাবিতে সোচ্চার বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন। এ লক্ষ্যে ১৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই স্মারকলিপি পাঠানো হয়।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন, ‘ধরে নিয়েছিলাম কোরবানির ঈদের আগে হোটেল-মোটেলসমূহ খুলে দেওয়া হবে। এখন বলা হচ্ছে ঈদের পরে। ফলে ৪০ হাজারের বেশি হোটেল-রেস্তোরাঁ কর্মচারীর দুঃখকষ্ট আরও বেড়ে গেল।’

চারদিকে সুনসান নীরবতা

শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে টেকনাফের দিকে ১২ কিলোমিটার গেলে সামনে পড়ে পাহাড়-ঝরনা ও প্রাকৃতিক গুহার দৃষ্টিনন্দন ‘দরিয়ানগর পর্যটনপল্লি’। ২৫ জুলাই বিকেলে গিয়ে দেখা গেছে বেহাল অবস্থা। কোনো দর্শনার্থী নেই। পল্লিতে প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে আছে ইট-পাথরের বিশাল এক তিমি। মাছের মুখ দিয়ে ঢুকেই প্রবেশ করতে হয় পল্লিতে। দর্শনার্থী নেই বলে তিমির মুখটি গাছের ডালপালা দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। পল্লির ভেতরে উঁচু পাহাড়ের নিচে রয়েছে কয়েক শ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শাহেনশাহ গুহা, পাহাড়চূড়ার কটেজ। পাহাড়ের পাদদেশে তৈরি টংঘর অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। তবে বানরসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বিচরণ ও কিচিরমিচির বেড়েছে অনেক।

একটু দূরেই হিমছড়ি ঝরনা। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এটি। সেখানেও কোনো দর্শনার্থী নেই। রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই পড়ে আছে ঝরনার স্পট। হিমছড়ি ঝরনাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাধিক রেস্তোরাঁ, দোকানপাট। এখন সবকিছুই বন্ধ।

হিমছড়ি বিনোদনকেন্দ্রের ঝিনুক পণ্য ব্যবসায়ী আক্কাস আলী বলেন, লকডাউনের পর থেকে ব্যবসা বন্ধ। দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সব ব্যবসায়ী ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। ব্যবসা বন্ধ থাকায় ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তাঁরা।

উখিয়ার পাথুরে সৈকত ইনানী ও টেকনাফ সৈকতের অবস্থাও একই। সেখানেও নেই দর্শনার্থী। টেকনাফ মডেল থানার ভেতরে রয়েছে ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনির ‘মাথিন কূপ’। প্রতিবছর কূপটি দেখতে যান আট লাখের বেশি পর্যটক। করোনার চার মাসে কোনো দর্শনার্থী নেই বলে জানালেন ওসি প্রদীপ কুমার দাশ।

প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনও পর্যটকশূন্য। করোনা সংক্রমণরোধে ১৯ মার্চ থেকে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচলকারী প্রমোদতরি (পযটকবাহী জাহাজ) বন্ধ রাখা হয়েছে।

এক পাশে উঁচু পাহাড়, অন্য পাশে উত্তাল বঙ্গোপসাগর। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে বিশ্বের দীর্ঘতম ‘কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ’। মেরিন ড্রাইভের অপরূপ সৌন্দর্য দেখার জন্যও সকাল-বিকেল সড়কে ভিড় জমাতেন হাজারো মানুষ। এখন পুরো সড়ক ফাঁকা। উখিয়ার আদিগুহা কানা রাজার সুড়ঙ্গ, রামুর ঐতিহাসিক রামকোট, বৌদ্ধপল্লি, মহেশখালী আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, চকরিয়ার ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, টেকনাফের নেচার পার্ক দেখার যেন কেউ নেই।

জেলা শহরের বিভিন্ন বিপণিকেন্দ্রের দোকানপাট খোলা, কিন্তু ক্রেতা নেই। অলস সময় পার করেন দোকানিরা। ছবি: প্রথম আলো

বর্মিজ মার্কেট, রূপচর্চাকেন্দ্র বন্ধ

পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় শহরের টেকপাড়ার ‘বর্মিজ মার্কেট’। রাখাইন ও মারমা সম্প্রদায়ের তরুণীরা মার্কেটের অধিকাংশ দোকানপাট পরিচালনা করেন। রাখাইন তরুণীদের বিউটি পারলারের চাহিদাও অনেক। করোনায় বর্মিজ মার্কেট ও বিউটি পারলারগুলোও বন্ধ।

বাজারঘাটার অর্বিট জোন মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘উর্মি বিউটি পারলার’। পারলারটি পরিচালনা করেন রাখাইন তরুণী ছেন খিন মে। কর্মচারী ১৫ জন, সবাই রাখাইন ও মারমা সম্প্রদায়ের তরুণী। বিভিন্ন বয়সী নারীরা পারলারে এসে মেকআপ, ফেসিয়াল, চুল কাটা, ব্রুপ্লাস, বউসাজ, পার্টি মেকআপ, হেয়ার ট্রিটমেন্ট ও চুল স্পিট করাতেন। চার মাস ধরে বন্ধ পালরারগুলো। এতে বেকার হয়ে পড়েন রূপচর্চার কাজে নিয়োজিত অসংখ্য তরুণী।

ছেন খিং মে বলেন, করোনাকাল হলেও তরুণীরা রূপচর্চায় আগ্রহী। কিন্তু চার মাস ধরে সব বন্ধ। রূপচর্চা করতে না পেরে অস্থির নারীরা।

আরেকটি বিউটি পারলারের পরিচালক উ ম্য চিন বলেন, করোনার কারণে ঈদুল ফিতরে ব্যবসা করতে পারেননি তাঁরা। সারা বছরের মধ্যে এই ঈদুল ফিতরে তাঁদের আয়রোজগার হয় অন্য সময়ের তুলনায় চার-পাঁচ গুণ বেশি। কোরবানির ঈদেও রুপচর্চাকেন্দ্রগুলো চালু করা গেল না। এতে সবাই হতাশ।

করোনার কারণে ক্রেতাশূন্য যাচ্ছে বর্মিজ মার্কেটের। ২৪ জুলাই দুপুরে মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, ৩০৭টি দোকানের মধ্যে ২০-২৫টি খোলা। কিন্তু কেনাকাটার কেউ নেই। একটি দোকানের কর্মচারী এথিনু মারমা বলেন, মার্কেটের বেশির ভাগ ক্রেতা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক। করোনার কারণে পর্যটক আসা বন্ধ। তাই মার্কেটও ফাঁকা। এতে প্রায় ৮০০ কর্মচারী বিপদে।

এভাবেই সৈকত ঘিরে টিকে থাকা মানুষগুলোর এখন করুণ অবস্থা। সবার ভেতরে চাপা কান্না। চাওয়া একটাই—খুব দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি। প্রকৃতি আর প্রতিবেশের সঙ্গে লড়াইয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না যে অনেকেই।

জেলা শহরের বড়বাজার, টেকপাড়া, বাজারঘাটা, বার্মিজ মার্কেট এলাকার ৭০টি শপিংমল ও বিপণিকেন্দ্র নিয়ে সংগঠন ‘কক্সবাজার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’। এর আওতাধীন দোকান ১ হাজারের বেশি। সংগঠনের সভাপতি ও সৈকত টাওয়ারের মালিক মাহবুবুর রহমান বলেন, করোনায় বিপর্যস্ত ব্যবসায়ীরা। বিক্রিবাট্টা বন্ধ থাকায় তাঁরা ব্যাংকঋণ, কর্মচারীদের বেতন ও দোকান ভাড়া পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, জানে না কেউ।

Share this post

PinIt
izmir escort bursa escort Escort Bayan
scroll to top
en English Version bn Bangla Version
error: কপি করা নিষেধ !!
bahis siteleri