বিশেষ প্রতিবেদক :: অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যে ভরপুর দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন এখন চরম সংকটে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের ফলে সেখানকার বাস্তুসংস্থানে এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার ফলে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে প্রবালের পরিমাণ। কমছে গাছপালা আচ্ছাদিত অঞ্চলের পরিমাণ, নষ্ট করা হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা কেয়া বন। একদিকে যেমন পর্যটন সম্ভাবনা বিকশিত হয়েছে অন্যদিকে হচ্ছে পরিবেশের বিপর্যয়।
সরকার সেন্টমার্টিন দ্বীপকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার ২৬ বছর অতিবাহিত হলেও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গ্রহণ করা কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন হয়নি।
যার ফলে গড়ে উঠছে অপরিকল্পিত পর্যটায়ন।
সেন্টমার্টিনে স্থায়ী বাসিন্দা প্রায় ১০ হাজার হলেও প্রতিদিন রাত্রিযাপন করে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। এ কারণে প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য হারাতে বসেছে দ্বীপটি।
প্রতিবেশগত সংকটে থাকা স্বত্বেও সরকারি সিদ্ধান্ত মতে শনিবার (১ নভেম্বর) থেকে থেকে পর্যটকদের জন্য আবার উন্মুক্ত হচ্ছে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন।
তবে আজ কোনো পর্যটক যাচ্ছেন না এই দ্বীপে। কোনো জাহাজ মালিক অনুমতি না নেওয়ায় শনিবারও পর্যটক শূন্যই থাকছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্র।
শর্তের বেড়াজালে নভেম্বরে সেন্ট মার্টিনে গেলেও পর্যটকদের রাত্রিযাপনের সুযোগ নেই। দিনে গিয়ে দিনেই ফিরতে হবে কক্সবাজারে।
ফলে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করে এ সময়ে দ্বীপ ভ্রমণে আগ্রহী নন পর্যটকেরা।
সরকারি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে পর্যটনবাহী জাহাজ চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হলেও নভেম্বরে জাহাজ চলবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দিনের বেলায় গিয়ে একই দিনে ফেরার শর্তে পর্যটকের আগ্রহ কম। ফলে প্রস্তুতি থাকলেও যাত্রী পাওয়া যাবে না।
তারা মূলত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি— এই দুই মাসকে কেন্দ্র করে জাহাজ চলাচলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ দুই মাসে সেন্ট মার্টিনে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকবে।
‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বলেন, ‘অনুমোদন মিললেও নভেম্বরে যাওয়ার মতো যাত্রী নেই, তাই জাহাজ চলছে না।
গত বছরের মতো ডিসেম্বর–জানুয়ারি জাহাজ চলবে। গত বছর এই দুই মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন গেছেন।’
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরের আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রবালসমৃদ্ধ সেন্ট মার্টিনে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটকের যাতায়াত বন্ধ আছে।
নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস ভ্রমণের সুযোগ মিলবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যেতে পারবেন। তবে মানতে হবে সরকারের ১২টি নির্দেশনা।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নভেম্বরে শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণ করা যাবে, রাত্রিযাপন করা যাবে না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি— এ দুই মাসে রাত্রিযাপনের সুযোগ থাকবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিআইডবলিউটিএ ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান চলতে পারবে না।

পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টাল থেকে অনলাইনে টিকিট নিতে হবে।
প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট হবে নকল।
তথ্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি মাস পর্যন্ত সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যেতে পারবেন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আবার ৯ মাস দ্বীপে যাতায়াত বন্ধ থাকবে।
ভ্রমণের সময়সূচি ও উপস্থিতি এবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি পর্যটক যেতে পারবেন না।
শুক্রবার ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক দম্পতি সালমান ও আফরোজা জানান, শুনেছি সেন্ট মার্টিন এখন পরিবেশগতভাবে মারাত্বক সংকটে রয়েছে। এ খবরটি জানার পর সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ বাতিল করেছি। এছাড়া দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রা করে স্বল্প সময়ের জন্য সেন্ট মার্টিন যাওয়ার কোন মানে হয় না। এর বদলে আমারা সেন্ট মার্টিনের বিকল্প পাথুরে বীচ ইনানী ও পাকুয়ারটেক ভ্রমণ করেছি। তাই প্রবাল দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সেন্ট মার্টিনকে কয়েক বছর প্রতিবেশগতভাবে ভারসাম্য ফেরার সুযোগ সবার দেয়া উচিত।
কক্সবাজারের পরিবেশবাদীদের দাবী, সেন্টমার্টিন দ্বীপের বেসিরভাগ হোটেল ও জাহাজ ব্যবসায়ী ঢাকা কেন্দ্রিক। পরিবেশ রক্ষায় সরকারের এ সিদ্ধান্তে দ্বীপের মানুষের ক্ষতির সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ মৎস্য আহরণ,শুটকি ব্যবসা ও কৃষিকাজ করে স্বাবলম্বি। দ্বীপে ৫ থেকে ৭ হাজার মানুষ বসবাস করে। অথচ পর্যটন মৌসুমে লাখ লাখ পর্যটক আগমনের কারণে দ্বীপটি রেড জোনে রয়েছে। প্রতিবছর হোটেল ও জাহাজ ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে দ্বীপের মানুষকে সামনে রেখে নানা ষড়যন্ত্র করে। আর আশ্চর্য বিষয় সেন্টমার্টিনের সমস্যা নিয়ে দ্বীপে না করে ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে হোটেল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটরা। আবার দাবী করে তারা নাকি সেন্টমার্টিনের নাগরিক!
এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের ১২ নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।আগে টেকনাফ থেকে জাহাজ চললেও নিরাপত্তার কারণে এবার কক্সবাজার শহর থেকে জাহাজ সেন্ট মার্টিনে যাবে।’

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত বছরের মতো এবারও কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়ার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে সেন্ট মার্টিনে যাবে পর্যটকবাহী জাহাজ। আইনগত বিধি নিষেধ থাকায় উখিয়ার ইনানী থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার সুযোগ নেই।
গত ২৭ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তরকে নীতিগত সম্মতি প্রদান বিষয়ে পাঠানো চিঠিতে এমন সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে।
এদিকে নভেম্বরে রাত্রিযাপন বন্ধের সিদ্ধান্তে দ্বীপের বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে দাবি করেছেন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানমালিকেরা।
সেন্ট মার্টিন দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘দুই বছর আগেও পাঁচ মাস পর্যটকেরা দ্বীপে রাতে থাকতেন। এখন রাত যাপনের সুযোগ না থাকায় বিক্রি নেই, ৬০–৭০টি দোকান বন্ধ।’
সেন্ট মার্টিন হোটেল–রিসোর্ট মালিক সমিতির সভাপতি শিবলুল আযম কোরেশী বলেন, ‘পরিবেশ রক্ষার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত।
কিন্তু বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে, দ্বীপের মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে ফেলে ভালো পর্যটন আশা করা যায় না।’
তিনি আগের মতো অক্টোবর–ফেব্রুয়ারি পাঁচ মাস রাত্রিযাপনের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
উল্লেখ্য সরকার ১৯৯৯ সালের ১৯ এপ্রিল ৫২৯ হেক্টর আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে। গত ৪ জানুয়ারি সরকার বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২-এর ক্ষমতাবলে দ্বীপের অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৪৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকার ৭০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এলাকাকে ‘সেন্ট মার্টিন মেরিন প্রটেক্টেড এলাকা’ ঘোষণা করে।
কিন্তু সেন্ট মার্টিনে পর্যটকের যাতায়াত সীমিতকরণ, অনলাইনে নিবন্ধন এবং পর্যটকদের মাথাপিছু টাকা আদায়ের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসছে জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন এবং হোটেল-কটেজ ব্যবসায়ীরা।

সেন্টমার্টিন যেতে যে ১২ নির্দেশনা মানতে হবে
গত ২২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী,
১. বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্ট মার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি পাবে না।
২. পর্যটকদের অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে।
৩. দ্বীপে ভ্রমণের সময়সূচি এবং পর্যটক উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
৪. নভেম্বরে পর্যটকেরা শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণ করতে পারবেন, রাত্রিযাপন করা যাবে না।
৫. ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে।
৬. প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন।
৭. সেন্ট মার্টিনের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ।
৮. কেয়া বনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
৯. সামুদ্রিক কচ্ছপ, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
১০. সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে।
১১. পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক, যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলি লিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহনে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
১২. পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দ্বীপে প্রবালের পরিমাণ কমেছে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ
যে প্রবালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্বচ্ছ জলধারার এই দ্বীপ সেটিই এখন শূন্য হওয়ার পথে। গত চার দশকে এই দ্বীপে প্রবালের পরিমাণ কমেছে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ। অথচ শুধুমাত্র এই প্রবালের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে এই দ্বীপ। প্রবাল কমে যাওয়ায় এই দ্বীপের আয়তনও কমা শুরু হয়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এভাবে চলতে থাকলে ২০৪৫-৫০ সালের মধ্যে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ প্রবালশূন্য হয়ে বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে যাবে।
সূত্র জানায়, গত ৩ বছর ধরে সেন্ট মার্টিনে হোটেল-মোটেল ও আবাসিক স্থাপনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ছোট ছোট স্থাপনা, দোকানপাট উচ্ছেদ করে প্রভাবশালীদের দখলে দেওয়া হয়েছে।
একই স্থানে দেড় শতাধিক অবৈধ হোটেল ও কটেজ গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামলাতেই এই স্থাপনাগুলো গড়ে উঠছে।
ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। প্রবাল পাথরগুলোকে ভেঙে হোটেল নির্মাতাদের কাছে বিক্রি করছেন স্থানীয় মানুষজন। যা সেন্ট মার্টিনের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। অল্প কিছু টাকার জন্য তারা নিজেদের আবাসস্থলকে ফেলছে অসম্ভব বড় ঝুঁকিতে।

সৈকত দখল করে এভাবে গড়ে উঠছে ভবন।
অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ রক্ষার নামে সরকার ও প্রশাসনের কৌশলগত উদাসীনতা, আর প্রভাবশালী মহলের দখলদারি মিলে দ্বীপটির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিপন্ন করে তুলেছে।
এছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে সেন্ট মার্টিনের মতো নাজুক বাস্তুসংস্থানসংবলিত দ্বীপকে বাঁচাতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। দ্বীপটিতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা গড়ে তোলার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সেগুলো উপেক্ষা করেই গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, হোটেল, মোটেল।
জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে সরকার পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করেছিল। প্রায় আট বর্গকিলোমিটার এলাকায় দ্বীপটিতে স্থায়ী প্রায় নয় হাজার বাসিন্দার বিপরীতে দৈনিক ভিড় করছে গড়ে আট হাজারের বেশি পর্যটক। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মানুষের চাপ ঠেকাতে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের ক্ষেত্রে ১৪টি বিধিনিষেধ জারি করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। যদিও প্রতিনিয়তই সেগুলো লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

সৈকত দখল করে এভাবে গড়ে উঠছে ভবন।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনের একের পর এক ‘ঢাকঢোল পেটানো’ অভিযানের নামে লোক দেখানো কার্যক্রম চলছে। দ্বীপের কেয়াবন ধ্বংস করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এমনকি সরকারি সংস্থাগুলোও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণে যুক্ত হয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে সেন্টমার্টিনে। সরকারের পক্ষ থেকে সেন্টমার্টিন রক্ষায় নানা বিধিনিষেধ ও কঠোরভাবে তা প্রয়োগের কথা বলা হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গত ৩ বছরে দেড় শতাধিক অবৈধ হোটেল, কটেজ ও স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে সৈকতের উত্তর অংশে দ্বীপ রক্ষার সারিবদ্ধ বিশাল কেয়াবনের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। সৈকতের বিশাল জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বিলাসবহুল হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইস, সি-হেভেন এবং পুলিশের বিশাল ভবন। এসব স্থাপনা নির্মাণে সৈকত দখলের পাশাপাশি কেয়াবন উজাড় করা হয়েছে। কেয়াবন দ্বীপের প্রাকৃতিক রক্ষাবলয় হিসাবে কাজ করে।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম ও আবু বক্কর অভিযোগ করে বলেন, উচ্ছেদের নামে সৈকত থেকে স্থানীয় গরিবদের ক্ষুদ্র দোকানপাটগুলো তুলে দিয়েছে প্রশাসন। পরে সেসব স্থানে প্রভাবশালী ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বহুতল ভবন নির্মাণ করেছে।

সৈকত দখল করে এভাবে গড়ে উঠছে ভবন।
সরেজমিন দেখা যায়, সেন্টমার্টিনে সরকারি সংস্থাগুলো কে কার চেয়ে বড় স্থাপনা করা যায় যেন সে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সেসব সরকারি সংস্থাগুলো হলো পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ, বিজিবি এবং কোস্টগার্ড। এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও নিজেদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলার নেতারা বলেন, সেন্টমার্টিন রক্ষার নামে প্রশাসন ও প্রভাবশালীরা ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। একদিকে স্থাপনা উচ্ছেদের নামে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে ছোট ছোট ঝুপড়িঘর ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, একই স্থানে বড় বড় ভবন নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। গত ৩ বছরে এখানে দেড় শতাধিক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে। কলিম উল্লাহ আরও উল্লেখ করেন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডও এখানে ভবন নির্মাণে জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেন ভবন নির্মাণের এক প্রকার প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

সৈকত দখল করে এভাবে গড়ে উঠছে ভবন।
অভিযোগের দায় স্বীকার করে ব্যর্থতার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ও সাবেক মন্ত্রী-সচিবদের দুষলেন পরিবেশ অধিদপ্তর।
তারা বলেন, বিগত সরকারের সেন্টমার্টিন রক্ষার জন্য যতগুলো সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা মন্ত্রী-সচিবদের প্রভাবের কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব না হওয়ায় সেন্টমার্টিন আজ ধ্বংসের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে।
জানতে চাইলে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি বেশিদিন হয়নি। অনেক কিছু আমার অজানা ছিল। এখন খোঁজ নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।















