শুক্রবার ১৩ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খাদ্যশস্য মজুদ নেমেছে ১২ লাখ টনে

🗓 বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫

👁️ ২২৪ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫

👁️ ২২৪ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৯ নভেম্বর) :: চাল, গম ও ধান মিলিয়ে বর্তমানে সরকারের কাছে খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে ১৩ লাখ টনের কিছু বেশি। এর মধ্যে পৌনে ১২ লাখ টনই হচ্ছে চাল। সাড়ে তিন মাস আগেও খাদ্যশস্যের সরকারি মজুদ ২১ লাখ টনের বেশি ছিল।

এ অবস্থায় মজুদ বাড়াতে সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আরো তিন লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে। মূলত বাজারে চালের দাম সহনীয় রাখার পাশাপাশি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় মজুদ নিশ্চিত রাখতে চাইছে সরকার।

অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন বর্তমানে আমনের মৌসুম চলছে এবং বাজারে শিগগিরই নতুন চাল চলে আসবে। এ অবস্থায় চাল আমদানির তেমন প্রয়োজন নেই, বরং স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুসারে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত সরকারের কাছে মোট ১৩ লাখ ১৪ হাজার ১৮৯ টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল। এর মধ্যে ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮৪ টন চাল, ১ লাখ ৩৮ হাজার ১৪০ টন গম ও ৯৮ টন ধান রয়েছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে গত আগস্টে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়েছিল সরকারের কাছে মোট ২১ লাখ ৩১ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার টনই চাল।

এ বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরো পাঁচ লাখ টন চাল এবং চার লাখ টন গম আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করার কথা জানানো হয়েছিল সে সময়। এর দুদিন পরই অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করে চার লাখ টন চাল কিনতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুসারে ক্রয় প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

বর্তমানে সরকারের কাছে থাকা খাদ্যশস্যের মজুদ গত আগস্টের তুলনায় আট লাখ টন কম রয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্যশস্যের মজুদ বাড়াতে আবারো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চাল আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। গতকাল সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে চাল ও গম কেনা-সংক্রান্ত দুটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়।

এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করে তিন লাখ টন চাল কেনার জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ১০২(১)(ক) প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ক্রয় প্রক্রিয়ার সময় কমানোর বিষয়ে নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করেছে কমিটি।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে তিন লাখ টন গম পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬-এর ৬৮(১) ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ৯৯(২) অনুসারে জিটুজি ভিত্তিতে কেনার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

এদিন অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায়ও ৫০ হাজার টন নন-বাসমতী সেদ্ধ চাল কেনা-সংক্রান্ত খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়া হয়। মেসার্স আদিত্য বিরলা গ্লোবাল ট্রেডিং (সিঙ্গাপুর) প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে এ চাল কিনতে ব্যয় হবে ২১৬ কোটি ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫৬০ টাকা। প্রতি টন চালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫৪ দশমিক ১৯ ডলার।

ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে দেশে বছরে চালের চাহিদা ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন। বন্যাসহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে চালের উৎপাদন কমে গেলে বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে চাহিদা মেটানো হয়। গত বছর বন্যার কারণে চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুল্ক কমানোর পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৩ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে সরকারিভাবে এসেছে ৮ লাখ ৩৫ হাজার টন। বেসরকারি আমদানিকারকরা এনেছেন প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টন চাল। একই সময়ে দেশে ৬২ লাখ টন গমও আমদানি হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মেয়াদ পাঁচ মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চার মাস এ কর্মসূচি চলবে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি দুই মাস কর্মসূচি স্থগিত থাকবে। এরপর ফেব্রুয়ারি ও মার্চ দুই মাস পুনরায় কর্মসূচি চলবে। কর্মসূচির মেয়াদ এক মাস বাড়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই চালের চাহিদা বেড়েছে।

তাছাড়া বাজারে চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দামও যাতে সহনীয় থাকে সেজন্য সরকার আগেভাগেই আমদানির অনুমোদন নিয়ে রাখতে চাইছে। যাতে প্রয়োজন হলে দ্রুত আমদানি করা যায়।

খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে আছে। এ অবস্থায় আমদানির মাধ্যমে মজুদ বাড়াতে পারলে সেটি মন্দ নয়। যদিও এ মুহূর্তে আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ মজুদ রয়েছে। তার পরও সেটি আরো বাড়ানো গেলে নিশ্চিত থাকা যায়। পাশাপাশি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির সময় এক মাস বাড়ানোর ফলে আগের চেয়ে দেড় লাখ টন চাল বেশি লাগছে। সে কারণেও আমাদের পর্যাপ্ত মজুদ রাখতে হয়।’

অনুমোদন নেয়া হলেও সব চাল একসঙ্গে কেনা হবে না উল্লেখ করে মো. জামাল হোসেন বলেন, ‘একটি প্যাকেজে ৫০ হাজার টন চাল থাকে। এক-দুটি প্যাকেজ কেনার পর যদি দেখা যায় যে চালের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং বাজারে দামও সহনীয় তাহলে হয়তো অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও সরকার চাল আমদানি করবে না।

এক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে একটি কৌশলগত অবস্থান গ্রহণের বিষয় রয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকেই আমন সংগ্রহ করা শুরু হবে। এতে চালের মজুদ আরো বাড়বে। তাই চালের মজুদ নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই।’

সরকার চলতি ২০২৫-২৬ আমন মৌসুমে মোট সাত লাখ টন ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে ছয় লাখ টন সেদ্ধ চাল, ৫০ হাজার টন আতপ চাল ও ৫০ হাজার টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রতি কেজি সেদ্ধ চালের সংগ্রহ মূল্য ৫০ টাকা, আতপ চাল ৪৯ টাকা এবং ধান ৩৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ বছরের ২০ নভেম্বর থেকে সামনের বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ সংগ্রহ অভিযান চলবে। গতবারের ২০২৪-২৫ আমন মৌসুমে সরকার সাড়ে পাঁচ লাখ টন সেদ্ধ চাল, এক লাখ টন আতপ চাল ও সাড়ে তিন লাখ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘বর্তমানে আমন ধান কাটা হচ্ছে এবং সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে সেটি বাজারে চলে আসবে। ঠিক এ সময়ে চাল আমদানি করার তেমন প্রয়োজন নেই। তবে গম আমাদের আমদানি করতেই হবে, যেহেতু এক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে।

অবশ্য সরকার যদি মনে করে যে বিশ্ববাজারে চালের দাম কম রয়েছে এবং দেশে চালের ঘাটতি তৈরি হবে তাহলে আমদানি করতে পারে। কিন্তু এবার দেশে যে পরিমাণ আমন ধান উৎপাদিত হবে তাতে চালের তেমন সংকট থাকবে না। একটি বিষয় মনে রাখতে হবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হলে তাতে সংশ্লিষ্ট দেশের উৎপাদকরা লাভবান হবেন।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজারে চালের দাম কমতে শুরু করেছে এবং সামনে বাজারে আমনের সরবরাহ বাড়বে। একান্ত প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে চাল আমদানি করা হলে তাতে দেশের বাজারে চালের দাম অবদমিত হবে এবং কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ বাড়ানো হলে সেটি দেশের উৎপাদকদের লাভবান করবে।’

এবারের আমন মৌসুমে সরকার ধান সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সেটির পরিমাণ খুবই কম উল্লেখ করে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘চাল মূলত সংগ্রহ করা হয় চাতাল মালিকদের কাছ থেকে এবং এতে তারাই সুবিধা পান।

তাছাড়া চাল দেয়ার জন্য সরকারের দিক থেকে চাপ থাকায় চাতাল মালিকরা এ সময় বাজারে পর্যাপ্ত চাল সরবরাহ করতে পারেন না। ফলে বাজারদরে সেভাবে প্রভাব পড়ে না। এজন্য কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ বাড়ানো উচিত। তাতে দেশের কৃষকরা উপকৃত হবেন।’

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর