বুধবার ১৭ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ | ২রা পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈশ্বিক শুল্কনীতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে অবৈধ ঘোষণা

🗓 Saturday, 21 February 2026

👁️ ১৪ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২১ ফেব্রুয়ারী :: মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা এবং সম্ভাব্য শুল্কচাপ এড়ানোর কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে চুক্তিটিকে উপস্থাপন করেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার। নির্বাচনের একেবারে আগ মুহূর্তে এ ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও নীতিগতভাবে সংবেদনশীল কোনো বাণিজ্য সমঝোতা করা অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার-বহির্ভূত। তারা চুক্তির সিদ্ধান্তটি নতুন সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। যদিও বিষয়টি আমলে নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার।

গতকাল মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করায় আবারো প্রশ্ন উঠছে—নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি, বহুমাত্রিক শর্তযুক্ত চুক্তিতে সই করা কি অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল?

গতকাল এক রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা সর্বজনীন শুল্ক বা গ্লোবাল ট্যারিফ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। নয়জন বিচারপতির বেঞ্চের ছয়জন এটি বাতিলের পক্ষে রায় দিয়েছেন।

আর ট্রাম্পের ট্যারিফের পক্ষে মত দিয়েছেন তিনজন বিচারপতি। সুপ্রিম কোর্টের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই। তবে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের কাছে রায়টি পুনরায় বিবেচনা করার অনুরোধ করতে পারে। যদিও এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা এবং রায় পাল্টে যাওয়ার নজির নেই বললেই চলে।

এ রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন পথে হাঁটার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২ ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ১০ শতাংশ ট্যারিফ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করবেন। এটি তিনদিন পর থেকে কার্যকর হবে। যেসব দেশ এরই মধ্যে চুক্তি করে ফেলেছে তাদের বিষয়ে ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি।

তিনি বলেন, ‘এসব চুক্তির অনেকগুলো বহাল থাকবে, কিছু হয়তো বহাল থাকবে না। সেগুলো অন্য ট্যারিফ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।’ তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, আইন অনুযায়ী সেকশন ১২২-এর অধীনে এ ধরনের সর্বজনীন শুল্ক অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

এটি সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্যই কার্যকর রাখা যায়, এরপর বাড়াতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন দরকার। ফলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যে ক্ষমতার সীমা টানা হয়েছে, ট্রাম্পের নতুন শুল্কও সময়সীমানির্ভর হয়ে পড়ছে। নীতিগত অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের আদালত যখন ট্রাম্পের ট্যারিফকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, তখন সরকার চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলে মনে করেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তড়িঘড়ি করে চুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার বড় ভুল করেছে। এ ধরনের চুক্তি তাদের এখতিয়ারের মধ্যেই ছিল না।

ক্ষমতা ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তেই চুক্তি করতে হবে—এমন কোনো বাস্তব চাপও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রেও বিষয়টি নিয়ে মামলা চলছিল। নিম্ন আদালত আগেও এটির বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। ফলে উচ্চ আদালতের রায়ে ট্রাম্পের ট্যারিফ বাতিল হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। উপরন্তু ট্রাম্প নিজেই শুল্কনীতি বারবার সংশোধন করছিলেন।’

আনু মুহাম্মদ আরো বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার সহজেই বলতে পারত নির্বাচিত সরকার এসে বিষয়টি দেখবে। এটা বলার মধ্য দিয়ে তারা চুক্তি সই এড়িয়ে যেতে পারত। কিন্তু সরকার যে পদ্ধতিতে সবকিছু আড়াল করে এগিয়েছে, তাতে মনে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের চেয়ে তাদের তাগিদ বা আগ্রহই বেশি ছিল। মনে হয়েছে এতে তাদের বিশেষ স্বার্থ ছিল, এটা ছাড়া তড়িঘড়ি করে চুক্তির ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না। এমন কোনো পরিস্থিতি ছিল না যে ৯ তারিখে না করলে বড় বিপদ হয়ে যাবে।’

মার্কিন সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়কে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আদালত বলেছে, কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে বৈশ্বিক পরিসরে শুল্ক আরোপ করতে পারেন না।

প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত লিখে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে অসাধারণ ক্ষমতার দাবি করেছেন তার পক্ষে স্পষ্ট কংগ্রেসীয় অনুমোদন দেখাতে হবে। ১৯৭৭ সালে পাস হওয়া ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ার অ্যাক্ট (আইইইপিএ) এ ধরনের শুল্ক আরোপের অনুমতি দেয় না।

রায়ে বলা হয়, কংগ্রেস যখন শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়, তখন তা সুস্পষ্ট সীমাবদ্ধতা ও শর্তসহ দেয়। এখানে তা করা হয়নি। জন রবার্টস রায়ে উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে যুদ্ধাবস্থায় নেই। জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাস্তব হুমকি ও আইনি সীমারেখা থাকতে হবে এবং সেই যুক্তিতে বৈশ্বিকভাবে একযোগে শুল্ক আরোপকে তিনি সমর্থনযোগ্য মনে করেননি।

রায়ে প্রধান বিচারপতি রবার্টসের সঙ্গে একমত হয়েছেন বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট ও নিল গরসাচসহ আদালতের তিন উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কেগান, কেটানজি ব্রাউন জ্যাকসন। বিপক্ষে মত দিয়েছেন ক্লারেন্স থমাস, স্যামুয়েল আলিটো ও ব্রেট কাভানাহ। তবে আদালত এখন পর্যন্ত আদায় করা বিপুল অংকের শুল্কের অর্থ কীভাবে ফেরত দেয়া হবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশনের তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে ১ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা ৩ লাখের বেশি আমদানিকারকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ অর্থ ফেরত দেয়ার প্রশ্নটি নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিসংশ্লিষ্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর একটি ছিল এটি। ট্রাম্প প্রশাসন তথাকথিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের পাশাপাশি চীন, মেক্সিকো ও কানাডার আমদানির ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল। কিছু ক্ষেত্রে শুল্কের হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এবং চীনের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে তা ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, জরুরি পরিস্থিতিতে আইইইপিএ প্রেসিডেন্টকে আমদানি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়। সে ক্ষমতার মধ্যেই শুল্ক আরোপ অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু মামলার বাদী আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, আইনে কোথাও ‘ট্যারিফ’ বা ‘ডিউটি’ শব্দ নেই, ফলে এ আইনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপের সুযোগ নেই।

আদালত এ যুক্তির সঙ্গে একমত হয়ে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমাহীন নয় এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আদালতের আগের কয়েকটি রায়ের দৃষ্টান্তও আলোচনায় এসেছে।

যেমন ২০২৩ সালে বাইডেন প্রশাসনের শিক্ষা ঋণ মওকুফ পরিকল্পনা এবং তার আগে কভিড-১৯ মহামারীর সময় টিকাদান বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত আদালত একই যুক্তিতে বাতিল করেছিলেন, কারণ কংগ্রেস স্পষ্টভাবে সে ক্ষমতা দেয়নি।

আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের শুল্ক আরোপের আরো কিছু ক্ষমতা রয়েছে, তবে সেগুলো সীমিত। একটি আইনের অধীনে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক ১৫০ দিনের জন্য আরোপ করা যায়। জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তিতে শুল্ক বাড়ানোর ক্ষমতাও রয়েছে, তবে সে ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিভাগকে তদন্ত করতে হয় এবং নির্দিষ্ট শিল্পকে লক্ষ্য করতে হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত জরুরি শুল্ক এসব শর্ত মানেনি। এ মামলার আগে যেসব নিম্ন আদালত বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে, সবগুলোই ট্রাম্পের শুল্ককে অবৈধ বলে রায় দিয়েছিল।

হোয়াইট হাউজ সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, গতকাল রায়ের পর ট্রাম্পকে বেশ ক্ষুব্ধ দেখা গেছে। হোয়াইট হাউজে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নরদের সঙ্গে বৈঠকের সময় এক সহকারী তাকে রায়ের কথা জানান। এ সময় ট্রাম্প গভর্নরদের উদ্দেশে বলেন, ‘আদালত নিয়ে কিছু একটা করতে হবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, রায়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্যও বড়। ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ছিল তার পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। শুল্ককে তিনি দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতেন। কখনো বাড়াতেন, কখনো কমাতেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তে সে কৌশল বড় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে।

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় বাংলাদেশকে কিছুটা স্বস্তির সুযোগ দিতে পারে বলে মনে করেন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তবে মনে রাখা উচিত যে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মান চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া এবং তার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর দিকে নজর রাখতে হবে।’ তড়িঘড়ি করে চুক্তিতে সই করা অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল ছিল কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘অবশ্যই এটি মারাত্মক ভুল। যারা এর জন্য দায়ী তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত।’

দীর্ঘ নয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দরকষাকষির পর গত ৯ ফেব্রুয়ারি এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের জন্য শুল্ক সুবিধার পূর্বশর্ত হিসেবে বেশকিছু ধারা যুক্ত করেছে মার্কিন পক্ষ। দেশটির কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানি থেকে শুরু করে সংবেদনশীল প্রযুক্তির সরবরাহ চেইনে ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়সংক্রান্তসহ নানা খাতে বেশকিছু শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে।

চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে তা কমিয়ে আনতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করবে বলে উল্লেখ করা রয়েছে চুক্তিতে।

রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত উড়োজাহাজ, এর যন্ত্রাংশ ও সেবা ক্রয় বাড়ানোর শর্তও চুক্তিতে জুড়ে দেয়া রয়েছে। বিমান এরই মধ্যে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং এর অতিরিক্ত কেনারও সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চুক্তিতে।

চতুর্থ ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিক বা জাতীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় নিজ সীমান্তে কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নেয় বা বাণিজ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে, বাংলাদেশকেও সে ব্যবস্থার সমর্থনে পরিপূরক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করলেও এর বিপরীতে একাধিক বাধ্যবাধকতাও আরোপ করা হয়েছে।

রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‍্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চুক্তির বয়ান বাংলাদেশের জন্য এতটাই প্রতিকূল ছিল যে দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার তিন-চারদিন আগে কোনো সরকারের পক্ষে এটি করা একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ ছিল।

সৌজন্যতার খাতিরে হলেও স্বাক্ষর দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়া যেত। সবাই জানত যে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট শিগগিরই পারস্পরিক শুল্কের বৈধতার বিষয়ে রায় দেবে। চূড়ান্ত স্বাক্ষর কৌশলগতভাবে কয়েক সপ্তাহ পিছিয়ে না দেয়ার কোনো কারণ ছিল না।’

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রভাব বোঝার জন্য বাংলাদেশের সময় নেয়া প্রয়োজন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষর করার মানেই এটি কার্যকর হওয়া নয়। তা সত্ত্বেও দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয়ে সম্মত হওয়ার ভিন্ন প্রভাব থাকতে পারে, এমনকি যদি পারস্পরিক শুল্ক প্রত্যাহারও করা হয়। বাংলাদেশ এ বিষয়ে আর কোনো ভুল করার বিলাসিতা করতে পারে না।’

ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা আদালতের রায়কে কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিজয় হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, শুল্ক আরোপের মতো করধর্মী সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট একতরফা নিতে পারেন না। বিপরীতে রিপাবলিকানদের একটি অংশ বলছে, চীনের মতো দেশের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুল্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কার্যকর একটি কৌশলগত অস্ত্র, যা আদালতের রায়ে সীমিত হয়ে গেল।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এ সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে আরো পূর্বানুমানযোগ্য করবে। একই সঙ্গে প্রশাসন এখন বিকল্প আইনি পথ ব্যবহার করে শুল্কনীতি চালু রাখার চেষ্টা করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। সিএনএন বলছে, সুপ্রিম কোর্টকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো সুযোগ নেই।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টই সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত আদালত। ফলে এখানকার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আর কোনো উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী একই আদালতে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যেতে পারে, যদিও তা খুবই বিরল।

যদি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায় ট্রাম্প প্রশাসনের যেকোনো আপিল বা পর্যালোচনার অনুরোধের বিপরীতে টিকে থাকে, তবে বাংলাদেশী রফতানির ওপর ৩৭ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কের ঝুঁকি আর থাকবে না বলে মনে করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ।

তিনি বলেন, ‘আদালতের রায় বহাল থাকলে পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঝুঁকি ছাড়াই বাংলাদেশ এ চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ পেতে পারে—যে শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশী পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠত। ন্যূনতমভাবে বাংলাদেশ চুক্তির কিছু ধারা নিয়ে জোরালোভাবে পুনরালোচনা করতে পারে এবং তা করা উচিত। বিশেষ করে যেসব ধারা বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূলে নয়—যেমন নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিসংক্রান্ত শর্ত বা প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ক্ষেত্রে মার্কিন পর্যালোচনা/ছাড়পত্রের বিষয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘যেহেতু এটি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তাই স্বাক্ষরের তাড়াহুড়ো নিশ্চিতভাবেই ভ্রু কুঁচকানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বাক্ষর করার আগে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি, যারা চুক্তির ধারাগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হবে।

এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে চুক্তির যৌক্তিকতা, সুবিধা, ঝুঁকি সম্পর্কে কোনো জনযোগাযোগও ছিল না। কয়েকদিনের মধ্যে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার কথা থাকায় এ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি তাদের ওপর ছেড়ে দেয়া যেত।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে উদ্বেগজনক কিছু বিষয় রয়েছে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ চুক্তির আওতায় কোনো বাংলাদেশী কোম্পানির রফতানীকৃত পণ্যের দাম যদি মার্কিন বাজারে প্রচলিত দামের তুলনায় কম পড়ে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ এতে দেশটি নিজের বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে দাবি করতে পারে।

এছাড়া চুক্তিতে মার্কিন স্বার্থকে অতিরিক্ত প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালা উপেক্ষিত হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও খাতসংশ্লিষ্টরা চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট বিটুইন ইউএস অ্যান্ড বাংলাদেশ: ইমপ্লিকেশনস ফর বাংলাদেশ ইকোনমি’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় চুক্তিটি পুনরায় পর্যালোচনার দাবি জানান এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটি অবশ্যই সংসদে পর্যালোচনার পর অনুসমর্থন করতে হবে।

অযথা আলোচনা নয়, যথাযথ আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই এগোতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে জিরো ট্যারিফ দেয়নি এবং দেয়ার কথাও বলেনি। বরং নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে, নির্ধারিত কিছু পণ্যে সীমিত পরিমাণ পর্যন্ত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ শূন্য হতে পারে এমন ইঙ্গিত রয়েছে। এখানে অনেক টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন আছে।’

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর