বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ মাঘ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে বিদায়ী সংবর্ধনা ছাড়াই গভর্নরের বিদায়

🗓 Wednesday, 25 February 2026

👁️ ৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 Wednesday, 25 February 2026

👁️ ৯ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৫ ফেব্রুয়ারী) :: বিশৃঙ্খলার কারণে ১৩তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এ অর্থনীতিবিদের বিদায় সুখকর হয়নি।

বিদায়ী সংবর্ধনা ছাড়াই কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় গতকাল দুপুরে তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বিদায় নেন।

আর গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে অনেকটা ধাক্কা দিতে দিতে কর্মকর্তারা অফিস থেকে বের করে দেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে অসহযোগিতা করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধারাবাহিকতায় ১৬ ফেব্রুয়ারি আকস্মিকভাবে গভর্নরের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ডাকে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল। ওই অনুষ্ঠান থেকে গভর্নরকে ’স্বৈরাচার’ আখ্যা দেয়া হয়।

এ পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফাকে কারণ দর্শানো নোটিস দেয়া হয়। একই সঙ্গে তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছিল।

এ প্রেক্ষাপটে গতকাল সকালে বিভিন্ন দাবি পূরণ এবং তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানো ও বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেন।

দাবি না মানলে বৃহস্পতিবার থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলমবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল ওই সমাবেশের আয়োজন করে। এতে সংস্থাটির বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অংশ নেয়।

প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন।

এ স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি নিয়ে বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেগুলো আমলে নেননি। বরং তিনি দমন-পীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’

শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘গভর্নর ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছামতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে ওনাকে জবাবদিহি করতে হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ডেপুটি হেড অব বিএফআইইউ মফিজুর রহমান খান চৌধুরী বলেন, ‘বিগত সাত-আট মাস ধরে ন্যায্য দাবি উত্থাপন করেছি গভর্নরের কাছে।

কিন্তু তিনি তা মানেননি। আমরা আশা করি, উনি আমাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নেবেন। কোনো অন্যায্য দাবি জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মর্যাদা রক্ষায় যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।’

অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘গভর্নর বিভিন্ন স্বৈরাচারী পদক্ষেপ নিয়েছেন, এসবের তীব্র নিন্দা জানাই।

গতকাল আমাদের তিনজনকে শোকজ নোটিসের জবাব দেয়ার আগেই বদলি করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি সমাধানের জন্য ওনার কাছে গেলেও উনি দেখা করেন না।’

তিনি আর বলেন, ‘আমরা আমাদের শোকজ নোটিস ও বদলি প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবিদাওয়া আজকের মধ্যে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।

যদি তা বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে আগামীকাল থেকে প্রতীকী কলমবিরতিতে যাব। আর রোববার সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

সমাবেশের পর পরই গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর সংবাদ সম্মেলনের ডাক দেন।

ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘কিছু কর্মকর্তা স্বার্থান্বেষী মহলের ইশারায় পরিচালিত হয়ে প্রতিষ্ঠানের মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন করছেন।

কর্মকর্তাদের অবশ্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভিস রুলস মেনে চলতে হবে।

যদি কেউ প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রক্ষায় কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।’

গভর্নর বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য অপরিহার্য।

বিশেষ করে যখন খাতটি কাঠামোগত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিটি পদক্ষেপকে হতে হবে আইনি ও প্রশাসনিক বিধিমালা অনুযায়ী সুসংহত।

মূলত আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং বিপর্যস্ত ব্যাংকগুলোকে পুনরুদ্ধারের কৌশলগত প্রচেষ্টাই বর্তমান প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি, যা আর্থিক মধ্যস্থতার পরবর্তী পদক্ষেপগুলোয় আরো স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।’

সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়া থেকে রক্ষা করা এবং সামগ্রিক বাজার স্থিতিশীল রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি কৌশলগত ও আবশ্যিক দায়িত্ব জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এজন্য ব্যাংকগুলোকে টাকা দেয়া হয়েছে।

এ হস্তক্ষেপ না করা হলে আমানতকারীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পেতেন না, যা জাতীয় অর্থনীতিতে একটি ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করত।

এ আর্থিক সহায়তা কোনো একক ব্যাংকের জন্য নয়, বরং গোটা খাতের ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। এর পরও এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দাঁড়াতে পারেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার অধিকার নেই এসব বিষয়ে কথা বলার। এজন্য তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’

কর্মকর্তারা গভর্নরের পদত্যাগ চান—এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘পদত্যাগ করতে আমার দুই সেকেন্ড সময়ও লাগবে না।

চাকরির জন্য আমি এখানে আসিনি। জাতিকে সেবা দেয়ার জন্য এসেছি। দেশের সংকটকালীন সময়ে জাতীয় কর্তব্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।’

তবে গভর্নরের সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই দুপুরে সংবাদ আসে গভর্নর পদে সরকার মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দিচ্ছে।

এ সংবাদ জেনে আহসান এইচ মনসুর অফিস থেকে বের হয়ে নিচে নেমে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে প্রটোকলে থাকা কিছু কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

গাড়িতে উঠে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার আগে গভর্নর বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করিনি। সরকারও আমার পদ বাতিল করেছে বলে শুনিনি। কিন্তু শুনেছি নতুন কাউকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণে বাসায় চলে যাচ্ছি।’

তিনি অফিস ছাড়ার পর পরই বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ‘মব’ তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে অফিস থেকে বের করে দেন। এ সময় ‘ধর ধর’ বলে তারা স্লোগান দেন। কেউ কেউ গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন।

এ সময় আহসান উল্লার শার্টের কলার চেপে ধরে গাড়িতে তুলে দেয়া হয়। এতে নেতৃত্ব দেন অতিরিক্ত পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম। নির্বাহী পরিচালক সরোয়ার হোসেন, পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, অতিরিক্ত পরিচালক তানভীর আহমেদসহ এ মবে প্রায় ৩০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন।

গভর্নর পদে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট যোগ দেন ড. আহসান এইচ মনসুর। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এ অর্থনীতিবিদ ১৯৮৩ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে (আইএমএফ) যোগ দেন। সংস্থাটিতে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার পালিয়ে যান।

পলাতক থাকা অবস্থায়ই তিনি ১০ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারই একমাত্র গভর্নর যিনি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পালিয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকে সংঘটিত মবক্রেসির তীব্র নিন্দা জানিয়ে গতকাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ মুখর ছিলেন দেশের বিশিষ্টজনসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। এর মধ্যে অ্যাক্টিভিস্ট ফাহাম আবদুস সালাম তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘মনসুর সাহেব একজন হিরো।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে মানুষগুলো এ দেশের ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংকিং সিস্টেমকে ঠ্যাক দিছে এবং রিভাইভ করেছে, তাদের প্রধান তিনি। এ রকম একজন হিরোকে যদি মব করে তার প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিতে হয়, আমি দুঃখিত! আপনারা এখনো লায়েক হন নাই।

আপনারা মানুষকে সম্মান দিতে শিখেন নাই। লোভে পড়ে আপনারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছেন। আ ভেরি ব্যাড ডে ফর বাংলাদেশ!’

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এরই মধ্যে খেলাপি ঋণ, সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক প্রভাবের মতো গভীর সংকটে রয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পেশাগত স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রক অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

নতুন নিয়োগ সেই প্রত্যাশা পূরণ করবে, নাকি সংস্কারের ধারাকে পিছিয়ে দেবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আমরা কি আবার সেই পুরনো অবস্থায় ফিরে যাচ্ছি, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার বদলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থই প্রাধান্য পাবে? সরকারের উচিত দ্রুতই স্পষ্ট করা যে এ সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’

ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ লেখেন, ‘ড. আহসান মনসুরের জন্য অপার শ্রদ্ধা ছিল ও থাকবে। তার এ ধরনের বিদায় কখনই কাম্য ছিল না এবং আমি নিশ্চিত—এটি অন্য মেধাবী ও স্বাধীন চিন্তার আধিকারিকদের বাংলাদেশের জনকল্যাণে যোগ দিতে দ্বিধাগ্রস্ত করবে।’

তিনি লেখেন, ‘গভর্নর মনসুর একদিকে আমার সামষ্টিক অর্থনীতির শিক্ষক অন্যদিকে বিপদসংকুলকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও তার কাছে অনেক শিখেছি।

প্রায় ছয় মাস বৃহৎ ঋণ পুনর্গঠন কাজে সম্পৃক্ত থাকার সময় অনেক কাছ থেকে কাজ করেছি, বিনিময় হার, সুদের হার হ্রাস আর তারল্য সহায়তা নিয়ে অনেক বিতর্ক করেছি। সবসময় তাকে পরমতসহিষ্ণু এবং লক্ষ্যে স্বচ্ছ মনে হয়েছে।

উনি শুধু মুচকি হেসে বলতেন, ‘‌এ ব্যাপারে তোমার অবস্থানকে মানি৷ তবে…’। ভালো থাকুন স্যার। অনেক ভালো। অধস্তনদের ‘‌চেইন অব কমান্ড’ ভঙ্গ করার ফল এ দেশে কখনো ভালো হয়নি, সম্ভবত হবেও না।’

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর