কক্সবাংলা ডটকম(২৮ ফেব্রুয়ারী) :: ঘন ঘন ভূমিকম্প নতুন করে শঙ্কা বাড়াচ্ছে দেশে। গত এক বছরে বাংলাদেশে ১৪৫ বার ছোট-বড় ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে।
২০২৪ সালে দেশে মোট ৫৩টি ভূমিকম্প হলেও মাত্র ১৮টির উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশে।
বাকিগুলোর উৎপত্তিস্থল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মিয়ানমারে। ২০২৫ সালে দেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা অনেক বেশি দেখা গেছে।
এ সময়ে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো বাংলাদেশে প্রায় ৭৬ থেকে ১৩৫টি ছোট-বড় ভূকম্পন রেকর্ড করেছে।
এর মধ্যে গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে উৎপত্তি ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল শক্তিশালী। এ ছাড়া ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
সর্বশেষ শুক্রবার দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূকম্পন অনুভূত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪ মাত্রা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে বাংলাদেশে। ভূমিকম্পের রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।
তবে, এর সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ ছোট মাত্রার ভূমিকম্পগুলো প্রায়শই নথিভুক্ত হয় না।
১৮৯৭ সালের শিলং প্লেটে ৮ দশমিক ৪ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়, যা ঢাকাসহ দেশের বড় অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছিল। এর আগে ১৮৮৫ সালের মধুপুর ফল্টে ৭ মাত্রার বেশি শক্তিশালী একটি ভূমিকম্প হয়।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের (জিএসবি) পরিচালক (ভূতত্ত্ব) সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অনেকে ধারণা করছেন বাংলাদেশে থাকা প্লেট ও ফল্টগুলো থেকে ৭.৫ থেকে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। কিন্তু কোনো গবেষণা ছাড়া এটা সুনিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না।
এটার জন্য দীর্ঘমেয়াদে সংগৃহীত ডেটা ও গবেষণা প্রয়োজন। তবে ঝুঁকি স্টাডি করার জন্য যে অবকাঠামো প্রয়োজন তা আমাদের দেশে নেই। তবে এটা বলা যায়, বাংলাদেশ কিছুটা ঝুঁকিতে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ছোট ছোট ভূমিকম্প বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়, আবার এনার্জিও রিলিজ করে।
এটি হলে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমে। তবে ছোট ছোট ভূমিকম্প যদি মাঝে মাঝেই হয় তাহলে তা বড় ভূমিকম্পের বার্তা দিচ্ছে বলা যায়। এর মানে প্লেটগুলো তার অবস্থান অ্যাডজাস্ট করছে। ফলে হঠাৎ করে বড় ভূমিকম্প হওয়ার আশাঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
ভূমিকম্পের মাত্রা যত বেশি হবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তত বেশি হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই বা বলার সুযোগ নেই যে, ঢাকায় কত মাত্রার ভূমিকম্প হবে।
তবে এ কথা ঠিক যে, যত বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হবে তত বেশি ক্ষতি হবে। যেমন, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার পুরাতন ভবনগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই। বলা হয়ে থাকে, ৬০-৭০ শতাংশ ভবন ভেঙে যাবে। কিন্তু এটা নতুন ঢাকার নয়, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শহরের পুরাতন অংশ।’
সৈয়দ নজরুল ইসলামের মতে, ‘ভূমিকম্প হলে ক্ষতি নিশ্চিত।’ এই ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় ভূকম্পন সহনশীল ভবন তৈরি করা। জনসচেতনতা তৈরি করা, অর্থাৎ ভূমিকম্প হলে করণীয় কী তা তাদের জানানো দরকার।
এ ছাড়া সচেতনতার অংশ হিসেবে বেশি পুরাতন ভবন ভেঙে ভূমিকম্প সহনীয় ভবন তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে।’ এ ছাড়া ভবন নীতিমালা ঠিকঠাক অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সব থেকে বেশি প্রয়োজন গবেষণা এবং সার্বক্ষণিক ডেটা সংরক্ষণ। যেন আমাদের কাছে তথ্য থাকে এবং আমরা তা মানুষকে জানাতে পারি।’
অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো ভূমিকম্পের বিষয়ে পূর্বাভাস দেওয়া যায় না উল্লেখ করে আবহাওয়া বিজ্ঞানী আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি।
যেহেতু এটি পৃথিবীর ইন্টারনাল বিহেভিয়ার এবং ইন্টারনালি লেট মুভমেন্ট এনার্জি রিলিজের মাধ্যমে এক প্লেট থেকে অন্য প্লেটে এনার্জি বিনিময় হয় বা কোনো কারণে যখন শক্তির পরিবর্তন হয়, তখনই ভূমিকম্পের মতো ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর তাভ্যন্তর ভাগ সমভাবে সৃষ্ট নয়। এখানে অভিন্নতার অভাব আছে আর সে কারণেই পৃথিবীর সব জায়গা সমানভাবে গঠিত হয় না। যেমন, জাপানে প্রতিনিয়ত ভূমিকম্প হয়। কিন্তু বাংলাদেশ বা এমন অনেক অঞ্চল আছে যেখানে সেভাবে ভূমিকম্প হয় না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের মতে, ‘পৃথিবীর যত বড় বড় ভূমিকম্প সবই এ সাবডাকশন জোনে সংঘটিত হয়েছে। জাপান, চিলি, আলাস্কায় বড় বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে। সেখানে যে ভূতাত্ত্বিক কাঠামো, একই কাঠামো আমাদের বাংলাদেশে অবস্থিত।’
সাবডাকশন জোনের ভূমিকম্প খুবই ক্ষতিকারক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সাবডাকশন জোন এবং এর আশপাশের অঞ্চলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে। সেই ভূমিকম্পগুলো ভূপৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটিয়েছে, নদী-নালার গতিপথের পরিবর্তন এনেছে। ১৭৬২ সালের আসাম ভূমিকম্পের ফলে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যমুনা নদীর দিকে চলে যায়।
আগে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ দিয়েই এ নদের বেশিরভাগ পানি প্রবাহিত হতো। বড় বড় ভূমিকম্প ভূপৃষ্ঠকে কোথাও উঁচু করে দেয়, আবার কোথাও নিচু করে দেয়। যেমন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে ভূমিকম্পের মাধ্যমে।’
তিনি আরও বলেন, ‘৮০০ থেকে ১ হাজার বছর আগে কুমিল্লার ময়নামতিতে ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্লেটগুলো জমাটবাঁধা শক্তি বের করেছিল। এরপরই নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে এ অবস্থায় এসেছে। তার মানে, ১ হাজার বছর ধরে শক্তি জমা হতে হতে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো শক্তি জমা হয়েছে। এ শক্তিই যেকোনো সময় বের হয়ে আসতে পারে।’
ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি রোধে সরকার যদিও ২০০৮ সালে সিবিএমপির মাধ্যমে প্রস্তুতি নিয়েছে, কিন্তু সেটি যথেষ্ট নয় বা তার ধারাবাহিকতা নেই। সরকারের পক্ষ থেকে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজটি করতে হবে।
ঢাকা থেকে দূরে ভূমিকম্পের উৎস হলেও ঢাকাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তা হলে ঢাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে। যেহেতু আমাদের কোনো পরিকল্পনা নেই সেহেতু ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে আমাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।’
ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ ঢাকাসহ দেশের ৫ শহর: মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের মতে বিশ্বে ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি শহরের তালিকায় আছে ঢাকা। বাংলাদেশে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছোট-বড় মাত্রার এসব ভূমিকম্প সামনের বড় মাত্রার ভূমিকম্পের আভাস দিচ্ছে। আর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ব্যাপক ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরের চেয়ে সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কাছে শুধু ইক্যুইপমেন্টস আছে। কিন্তু শুধু ইকুইপমেন্টস দিয়ে হবে না। কারণ, ভবন মেরামত না করলে ভবন চাপা পড়ে মানুষ মারা যাবেই। এ ছাড়া গ্যাস-বিদ্যুতের অপরিকল্পিত লাইন ঢাকা শহরে ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, সাতক্ষীরা অঞ্চল তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে থাকলেও উত্তর ও পূর্বাঞ্চল উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ।
ঢাকাকে মাঝারি ঝুঁকির মধ্যে ধরা হলেও ঘনবসতি ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভিতরে ছোট ছোট অজ্ঞাত ফল্ট লাইন চিহ্নিত করা জরুরি। রাজধানী ও চট্টগ্রামকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নগরী হিসেবে চিহ্নিত করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।
সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, রাজধানীতে প্রায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবনের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে বলা হয়েছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে অন্তত ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং ১ লাখ ৩৫ হাজার ভবন আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে তৈরি হবে ৭ কোটি টন কংক্রিটের স্তূপ।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তথ্য অনুযায়ী নগরীর ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবনের মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশ বিভিন্ন মাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বড় ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়; তবে সতর্কতা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই। সঠিক পরিকল্পনা, বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন ও সচেতনতার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।














