কক্সবাংলা ডটকম(২৮ ফেব্রুয়ারী) :: ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে গত অন্তর্বর্তী সরকার নানা পদক্ষেপের মধ্যে এই বাহিনীর পোশাকও পরিবর্তন করেছিল। আগের পোশাকে পুলিশ জনগণের কাছে বিতর্কিত এই ধারণা থেকে মূলত সরকার এই সিদ্ধান্ত নিলেও বিরোধিতা ছিল প্রবল।
বিশেষ করে পোশাকের রঙ ও মান পছন্দ করা নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। দুজন সাবেক উপদেষ্টা ও একজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা (সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) এবং পুলিশের ভেতরের এক ডজন কর্মকর্তার প্রায় একক সিদ্ধান্তেই পোশাক পরিবর্তনে বাধ্য হয় পুলিশ।
একপর্যায়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে এই পোশাক ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়। নতুন এই পোশাকের পেছনে অন্তত শতকোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ওই সূত্রটি জানায়, এক ডজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা সিন্ডিকেট করে দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশের নানা কেনাকাটার সঙ্গে জড়িত। তারাই মূলত পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে পোশাক তৈরি করছে (কাপড় কেনাসহ)। আগের সরকার পরিবর্তন হলেও শেষ হয়ে যায়নি সিন্ডিকেটের তৎপরতা।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশে আবারও দাবি উঠেছে আগের পোশাকে ফিরে যেতে। এমনকি বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে আগের পোশাকই পুলিশের ঐতিহ্য। এই বিবৃতির পর বিষয়টি নিয়ে সরকারের হাইকমান্ডে আলোচনা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পুলিশ সদর দপ্তরও আলাদাভাবে বিশেষ বৈঠক করেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আগের পোশাকে ফিরে যেতে সরকারের হাইকমান্ড থেকে মৌখিকভাবে নির্দেশনা এসেছে।
বর্তমানে পুলিশ যে ধরনের পোশাক ব্যবহার করছে সেটি দেখলে মনে হচ্ছে বাসা অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি গার্ড। এ নিয়ে পুলিশ কমকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যায় থেকেও অভিযোগ দিয়ে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেকটা জোর করেই রুচিহীন রঙ ও নিম্নমানের কাপড়ে তৈরি পোশাক পুলিশকে ব্যবহার করতে বাধ্য করেছে।
তিনি আরও বলেন, পোশাক পরিবর্তনের জন্য গত সরকারের সাবেক দুজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা ও সাবেক একজন পুলিশ কর্মকর্তা (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন) বেশি হস্তক্ষেপ করেছেন।
তাছাড়া পুলিশের অন্তত এক ডজন কর্মকর্তা পেছন থেকে বেশি কলকাঠি নেড়েছেন। তাদের মধ্য চারজন অবসরে চলে গেছেন। তারাই মূলত ঘুরেফিরে সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকেন। এই সিন্ডিকেট ভাঙতে বিষয়টি আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে অবহিত করব।
পুলিশ সংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশ বাহিনী সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের নভেম্বরে বাহিনীটির পোশাক পরিবর্তন করে। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে লৌহ রঙের নতুন পোশাক প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু নতুন এ পোশাক নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাছাড়া এই পোশাকের সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পোশাকেরও অনেকটাই মিল রয়েছে।
অনেক বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের রক্ষীদের পোশাকের সঙ্গেও পুলিশ বাহিনীর নতুন পোশাকের সাদৃশ্য রয়েছে। এসব বিষয় ইতিমধ্যে নতুন সরকারের দায়িত্বশীলদের নজরে এসেছে। তারাও পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে আবার পুরনো ইউনিফর্মে ফিরে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা নতুন ইউনিফর্ম পরিবর্তনের পক্ষে। কারণ এই পোশাক পুলিশ বাহিনীকে ধারণ করে না।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দমনপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর থেকে সমালোচনার মুখে থাকা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও পোশাক পরিবর্তনের দাবি উঠলে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পোশাক অনুমোদন করে। আমরা কিন্তু এই ধরনের পোশাক চাইনি। আগের পোশাকেই থাকতে চেয়েছি। অনেকটা জোর করেই আমাদের নতুন পোশাক পরতে বাধ্য করা হয়েছে।
অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন পোশাক পরিবর্তনের পক্ষে আমরা। এ বিষয়টি ইতিমধ্যে সরকারের দায়িত্বশীলদের নজরে আনা হয়েছে। আশা করি আগামী মাসের মধ্যে পুলিশ আগের পোশাক ব্যবহার করতে পারবে। নতুন পোশাকের পেছনে প্রায় শতকোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে।
পোশাকে মনবল ফিরবে আশা করলেও গেছে বিফলে :
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠার পর থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও ইউনিফর্ম পরিবর্তনের দাবি ওঠে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন পোশাক বাছাই করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।
পরে সেই কমিটির বাছাই করা রঙের ইউনিফর্ম সরকার অনুমোদন করে। এরই অংশ হিসেবে গত বছরের ১৪ নভেম্বর থেকে সব মহানগর পুলিশ লৌহ রঙের নতুন ইউনিফর্ম পরে দায়িত্ব পালন শুরু করে। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে জেলা পুলিশও নতুন ইউনিফর্ম পরা শুরু করে। তবে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও স্পেশাল প্রটেকশন ব্যাটালিয়নের (এসপিবিএন) আগের ইউনিফর্ম বহাল রাখা হয়।
পোশাক চূড়ান্ত করা হলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। পুলিশ, র্যাব ও আনসারের জন্য নতুন পোশাক সিলেক্ট করা হয়েছে। এজন্য পুলিশের আচার-আচরণও পরিবর্তন করতে হবে। কিন্তু পোশাক ব্যবহার করে আগের মতোই পুলিশ আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নতুন পোশাক পরে পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে সিকিউরিটি গার্ডের মতো লাগছে। কেউ তাদের পুলিশই মনে করছে না।
পোশাকে মানসিকতার পরিবর্তন হয় না :
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের পর বিশেষজ্ঞরা বলেন, পুলিশ সদস্যের নিজেদের কার্যকলাপ যদি পরিবর্তন না করা যায়, তবে পোশাক পরিবর্তন করে খুব বেশি কাজে আসবে না। শুধু সরকারের অর্থ ব্যয় হবে। কারণ আগেও অনেকবার পোশাক পরিবর্তন হয়েছে পুলিশের। কিন্তু পুলিশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যে কারণে পোশাক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের মনোভাবেরও পরিবর্তন জরুরি।
জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুর মোহাম্মাদ বলেন, শুধু পোশাকের রঙ বদলালে হবে না। পুলিশের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তবে জুলাই আন্দোলনে পুলিশকে যেভাবে মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছিল। আমার মতে, আগের পোশাকেই পুলিশের ঐতিহ্য রয়েছে।
পোশাকে কখনো মনমানসিকতা পরিবর্তন হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিলে মনমানসিকতা ভালো হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, পোশাক বদল করে কার্যত কোনো লাভ হবে না। জনবান্ধব এবং পেশাদার পুলিশ গড়ে তুলতে হলে সবার আগে দরকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের গ্যারান্টি। একই সঙ্গে সরকারের বেআইনি আদেশের ক্ষেত্রে তাদের না বলা শিখতে হবে। তাহলেই পোশাকের মর্যাদা বাড়বে। আর না হয় আগের মতোই পুলিশের ব্যবহার থাকবে। অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নিচ্ছি না।
পোশাক কেনাকাটায়ও ব্যাপক দুর্নীতি অভিযোগ :
২০০৪ সালে পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রঙের করা হয়। জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রঙের পোশাক। র্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে।
এসপিবিএনের পোশাকের জামার রঙ করা হয় ধূসর। প্যান্টও ভিন্ন ভিন্ন রঙের করা হয়। ২০০৪, ২০১৬ ও ২০২১ সালে তিনবার পুলিশের কয়েকটি ইউনিটের পোশাকের রঙ পরিবর্তন করা হয়েছিল। সর্বশেষ এপিবিএনের পোশাক পরিবর্তন করা হয়। এই পোশাক কেনাকাটাতেও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। সিন্ডিকেট করে পোশাক তৈরি করার তথ্য আছে পুলিশ সদর দপ্তরে।
বিশ্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক :
পুলিশ সূত্র আরও জানায়, বিশ্ব জুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক দুভাবে নির্ধারণ করা হয়। দেশকালের ওপর ভিত্তি করে সেবা সংস্থাগুলোর পোশাক নির্ধারণ করা হয় বেশিরভাগ সময়। যেমন শীতপ্রধান দেশগুলোর পুলিশের পোশাকের রঙ হয় কালো। সেখানে তাপমাত্রা ধরে রাখার একটা বিষয় পোশাকে যুক্ত থাকে। গরম বা নাতিশীতোষ্ণ দেশগুলোতে পুলিশের পোশাক সাদা, খয়েরি বা হালকা রঙের দেখা যায়, যা কি না তাপ শোষণ কম করে। ভারত বা এ অঞ্চলে বিভিন্ন সেবাসংস্থার পোশাক খাকি হওয়ার আরেকটি কারণ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন।
আগের পোশাকে যেতেই বাহিনীর ভেতরে দাবি :
বাংলাদেশ পুলিশের নতুন ইউনিফর্ম পরিবর্তনের জোরালো দাবি উঠছে বাহিনীটির ভেতর থেকে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাতে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে সরকারের কাছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, দীর্ঘদিনের খাকি পোশাকটি ২০০৩-২০০৪ সালে তৎকালীন সরকারের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় পুলিশ সদস্যদের গায়ের রঙ, দেশের আবহাওয়া, দিন ও রাতের ডিউটিতে সহজে চিহ্নিত করার বিষয় এবং অন্য বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়ানোর দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়।
সংগঠনটির দাবি, অন্তর্বর্তী সরকার নতুন যে পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। জনমত যাচাই বা মাঠপর্যায়ের মতামত না নিয়েই এমন পোশাক চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা অন্য ইউনিফর্মধারী সংস্থার পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। ফলে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে মর্মে মাঠপর্যায় থেকে মতামত এসেছে।














