কক্সবাংলা ডটকম :: পারমাণবিক ইস্যুতে চলমান আলোচনার মধ্যেই ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী।
২৮ ফেব্রুয়ারী সকালে তেহরানসহ ইরানের অন্তত পাঁচটি এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়।
এসব হামলায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ও সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার বাসভবনকে লক্ষ্যবস্তু করে মার্কিন-ইসরায়েলি বাহিনী।
শনিবার তাঁর রাষ্ট্রীয় বাসভবন লক্ষ্য করেও হামলা চালানো হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও খামেনির কার্যালয়ের আশপাশে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারের মার্কিন হামলার অন্যতম লক্ষ্য হলো ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।
খামেনি এখন কোথায় আছেন, সেটা জানা যাচ্ছে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, খামেনি এখন তেহরানে নেই। নিরাপদ স্থানে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
১৯৮৯ সাল থেকে খামেনি সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। দেশটির সামরিক, বিচার বিভাগসহ সরকারের অধিকাংশ ক্ষমতাই তাঁর হাতে। ইরানের আধ্যাত্মিক নেতাও তিনি। তাঁর মতে, ইরানের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো যুক্তরাষ্ট্র। এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ইসরায়েল।
ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বাহিনী সরাসরি খামেনির নিয়ন্ত্রণে। এর একটি হলো দেশটির আধা সামরিক বাহিনী বাসিজ। এই বাহিনীর লাখো সদস্য আছে দেশজুড়ে। ইরানের অভ্যন্তরে কী হয় এবং পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, সেটা এই বাসিজকে দিয়ে নিয়ন্ত্রিত।
আরেকটি বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। এই বাহিনী দেশের বাইরেও বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেয়। অর্থাৎ ইরানে একটি সরকার থাকলেও সামরিক সব ক্ষমতা আসলে খামেনির হাতে। তাই ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাথাব্যথার কারণ তিনি।
খামেনিকে নিয়ে ইসরায়েলের অবস্থান একেবারে স্পষ্ট। এ প্রসঙ্গে গত বছরের জুনে ইরানে হামলার শুরু আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছিলেন, খামেনির মতো একজন স্বৈরশাসক, যিনি কিনা ইসরায়েলের মতো দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁর অস্তিত্ব থাকতে পারেন না।
ঠিক একই মাসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাঁরা খামেনিকে হত্যার পরিকল্পনা থেকে সরে আসছেন না। তাঁর মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে যে সংঘাত চলছে এর ইতি ঘটতে পারে খামেনিকে হত্যার মধ্য দিয়ে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা, খামেনিকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ই কথা বলেছেন ট্রাম্প। চলতি মাসের শুরুর দিকে এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে, তাতে ইরানের শাসকগোষ্ঠীর ভীত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আরেকটি বক্তব্যে ট্রাম্প বলেছিলেন, সবচেয়ে ভালো হবে ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন হলে। ইরানের মানুষেরা এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসতে পারবে। খামেনির পতন হলে কারা ক্ষমতায় আসবে, এই বিষয়ে অবশ্য তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি।
ইরানের শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এর নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে খামেনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁকে ঘিরে নিরাপত্তাও সবচেয়ে বেশি। তবে ট্রাম্পের মতে, খামেনি হলো সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু। তাঁরা চাইলে খামেনিকে সরিয়ে দিতে পারেন।
ট্রাম্প বলেছিলেনও, ‘আমরা জানি, তথাকথিত সেই সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা লুকিয়ে আছেন। তিনি খুবই সহজ টার্গেট। আমরা এখনই তাঁকে হত্যা করতে চাই না। অন্তত এখন তো নয়ই।’
এখন হয়তো সেই অবস্থানে ট্রাম্প আর নেই। কারণ গতকাল তিনি যে ভাষণ দিয়েছেন, তা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ। ইরানে গতকাল হামলা শুরুর পর তিনি বলেন, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) সদস্যরা অস্ত্র ফেলে দিলে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হবে। নয়তো তাদের হাতে আরেকটি বিকল্প আছে; সেটি হলো মৃত্যু।
ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলের ইঙ্গিত দিয়ে সে দেশের জনগণের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের অভিযান শেষ হলে আপনারা সরকার বুঝে নিন। এটা হবে আপনাদের কাজ। কয়েক দশকের মধ্যে এটাই আপনাদের জন্য একমাত্র সুযোগ।’
এ প্রসঙ্গে আল জাজিরার ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক আলি হাশেম বলেন, এবারের হামলার মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে শেষ করে দিতে চায়। তবে এই অভিযানে সেটা সফল হবে কি না, সেটা বলার সময় এখনো আসেনি।
খামেনির অবস্থা কী, জানে না ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কী অবস্থায় আছেন, তা জানেন না দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব কী অবস্থায় আছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কিছু বলার অবস্থানে তিনি নেই।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বাংলাদেশ সময় শনিবার দিনের শেষভাগ থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোয় খামেনির কার্যালয় ও বাসভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর ও ছবি প্রকাশ হতে থাকে।
এরপর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এনবিসি নিউজকে বলেছিলেন, তিনি যতটুকু জানেন, সে অনুযায়ী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বেঁচে আছেন। তবে ইরান হয়তো একজন বা দুজন কমান্ডার হারিয়েছে।
খামেনির অবস্থা নিয়ে নানা গুজবের মধ্যে বিবিসির সাংবাদিক লাইস ডোশেট ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
খামেনি বেঁচে আছেন কি না জানতে চাইলে ইসমাইল বাঘেই বলেন, ‘আমি শুধু আপনাকে বলতে পারি, দেশের বহু জায়গায়, বহু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে।’ তিনি এ সময় দাবি করেন, হামলায় দেড় শতাধিক মেয়েশিশু নিহত ও পঙ্গু হয়েছে।
ইরানিদের বিক্ষোভ শুরুর আহ্বান
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সম্ভবত আর নেই।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারেননি, খামেনি আর বেঁচে নেই। তিনি শুধু বলেছেন, যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ক্রমেই আভাস স্পষ্ট হচ্ছে যে ইরানের ‘স্বৈরশাসক’ আর নেই।
বাংলাদেশ সময় শনিবার দিবাগত রাতে টেলিভিশনে দেওয়া এক বক্তব্যে এ তথ্য দাবি করেন নেতানিয়াহু। তবে ইরানের তরফ থেকে এ ব্যাপারে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট তথ্য আসেনি।
অবশ্য এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছিলেন, খামেনি কী অবস্থায় আছেন, তা স্পষ্ট করে বলার মতো অবস্থায় নেই তিনি।
টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে ‘স্বৈরশাসক’ আর নেই। ইসরায়েল তাঁর বাসভবন ধ্বংস করে দিয়েছে।
এই দাবি করলেও নেতানিয়াহু ইরানের জনগণের প্রতি সরকার পতনে সড়কে নামার আহ্বানও জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে হটানোর এই সুযোগ এক প্রজন্মে একবারই পাওয়া যাবে।
ইরানি জনগণের উদ্দেশ্যে নেতানিয়াহু বলেন, ‘সড়কে নামুন, বিক্ষোভ করুন, কাজ শেষ করুন। এক জোট হওয়ার জন্য এটাই আপনাদের বড় সুযোগ। ঐতিহাসিক কাজ সম্পাদনে এক জোট হোন।
নেতানিয়াহু আরও বলেছেন, ইরানে যে অভিযান শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে ধৈর্যধারণ করতে হবে। যত সময় প্রয়োজন, ততটা নিয়েই এই অভিযান শেষ হবে। এই যুদ্ধ চূড়ান্ত শান্তির পথে নিয়ে যাবে।













