রবিবার ১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাসসুন্দরী দেবী : ‘প্রথম বাঙালি’ আত্মজীবনীকার

🗓 Saturday, 28 February 2026

👁️ ১৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 Saturday, 28 February 2026

👁️ ১৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৬ ফেব্রুয়ারী) :: মানুষের জীবন যখন সময়ের ঘাত-প্রতিঘাতে ঋদ্ধ হয়, তখন সেই অভিজ্ঞতার নির্যাস যখন শব্দে রূপ পায়, তখনই জন্ম নেয় একটি সার্থক আত্মজীবনী। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। গবেষকদের মতে, পাশ্চাত্যের পনের শতকের রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময়ে ইউরোপে এই ধারার সূত্রপাত ঘটে।

আমাদের এই জনপদে প্রাচীন ও মধ্যযুগে গীতিকবিরা তাদের কাহিনীকাব্যের শুরুতে এক ধরনের আত্মপরিচয় তুলে ধরতেন, যাকে বলা হতো ‘ভণিতা’। এই ভণিতায় কবিরা নিজেদের বংশ পরিচয় ও ব্যক্তিগত সামান্য তথ্য প্রকাশ করতেন।

বাঙালির আধুনিক আত্মজীবনী রচনার ধারাকে এই ভণিতারই এক বিবর্তিত রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। যদিও আধুনিক সাহিত্য সমালোচকরা মধ্যযুগের সেই ভণিতাকে পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী বলতে নারাজ, কারণ তাতে আত্মজীবনীর মতো বিস্তৃত জীবনদর্শন বা সমকালের পূর্ণাঙ্গ চিত্র থাকে না; থাকে কেবল লেখকের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয়।

বাঙালি আধুনিক ধারার আত্মজীবনীর সঙ্গে পরিচিত হয় উনিশ শতকের নবজাগরণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী লেখার সাহস কোনো সুশিক্ষিত পুরুষ দেখাতে পারেননি। এই ঐতিহাসিক সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন উনিশ শতকের এক অবরোধবাসিনী নারী। তার নাম রাসসুন্দরী দেবী (১৮০৯-১৮৯৯)। তার অমর সৃষ্টি ‘আমার জীবন’। সে অর্থে প্রথম বাঙালি আত্মজীবনীকারের মুকুটটি এক মহীয়সী নারীরই প্রাপ্য।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ হিসেবে ‘আমার জীবন’ কেবল একটি বই নয়, সামাজিক দলিল। এতে উনিশ শতকের বাংলার গ্রামীণ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের খুঁটিনাটি চিত্র সজীবভাবে ফুটে উঠেছে। আত্মজীবনী মানে তো নিজের জীবন আর সমকালকে পৃথিবীর সামনে একটি খোলা বইয়ের মতো মেলে ধরা। উনিশ শতকের সেই প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে একজন নারী এই কাজটি করেছিলেন, যা ছিল তৎকালীন বিচারে অকল্পনীয় দুঃসাহসিক। তার দেখানো পথ ধরেই পরবর্তীকালে ১৯০৪ সালে দেওয়ান কার্ত্তিকেয়চন্দ্র রায় লিখেছিলেন তার ‘আত্ম-জীবন চরিত’।

রাসসুন্দরী দেবী যখন তার আত্মজীবনীটি রচনা করেন, তখন তার বয়স ছিল ৫৯ বছর। ১৮০৯ সালে বাংলাদেশের পাবনা জেলার পোতাজিয়া গ্রামে (বর্তমান সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে) এক সাধারণ পরিবারে তিনি জন্ম নেন। তার এই জীবনকৃতির প্রথম ভাগ প্রকাশিত হয় ১৮৬৮ সালে। এর দীর্ঘ ২৯ বছর পর ১৮৯৭ সালে যখন তার বয়স ৮৮ বছর, তখন বইটির দ্বিতীয় ভাগ প্রকাশিত হয়। ১৮৯৭ সালের সেই পরিবর্ধিত সংস্করণের দুই বছর পর ১৮৯৯ সালে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে।

‘আমার জীবন’ গ্রন্থটি দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশে রয়েছে ১৬টি ছোট রচনা, যার মধ্যে তার শৈশব থেকে প্রৌঢ়ত্ব পর্যন্ত জীবনের নানা বাঁকবদলের কাহিনি রয়েছে। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ১৫টি ছোট রচনা। এই প্রতিটি অধ্যায়ই একটি করে উৎসর্গমূলক কবিতা দিয়ে শুরু হয়েছে। রাসসুন্দরী দেবী কেবল গদ্যকার ছিলেন না, তিনি গান ও কবিতাও লিখেছিলেন। কোনোদিন প্রথাগত বিদ্যালয়ের আঙিনায় না গিয়েও তিনি যে ভাষার মাধুর্য ও অভিজ্ঞতার প্রগাঢ়তা সৃষ্টি করেছিলেন, তা বিস্ময়কর।

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পণ্ডিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বইটির প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। তিনি বইটির ‘ঘটনাবলীর বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা’ এবং অভিব্যক্তির ‘সহজ মাধুর্য’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। অন্যদিকে দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, তার গদ্য হলো ‘একটি অতীত যুগের সহজ গদ্য রচনার সংক্ষিপ্তসার’। এই বইটির গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে পরবর্তীকালে এটি হিন্দিতেও অনূদিত হয়েছিল।

‘আমার জীবন’-এর ভূমিকা লিখেছিলেন স্বয়ং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। দীনেশচন্দ্র সেন বইটির ‘গ্রন্থ পরিচয়’ লিখতে গিয়ে এক অসাধারণ সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, “এই জীবনখানি ব্যক্তিগত কথা বলিয়া উপেক্ষা করা চলে না। ইহা প্রাচীন হিন্দু রমণীর একটি খাঁটি নক্সা। যিনি নিজের কথা সরলভাবে কহিয়া থাকেন, তিনি অলক্ষিতভাবে সামাজিক চিত্র অঙ্কন করিয়া যান।”

তিনি আরও মনে করতেন যে, এই বইটি যদি লেখা না হতো, তবে বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অসম্পূর্ণ থেকে যেত। রাসসুন্দরী দেবী একাই গোটা এক প্রজন্মের হিন্দু রমণীদের নীরব কথাকে ভাষা দিয়েছিলেন। বাঙালি নারীর সেই চিরন্তন বৈশিষ্ট্য- ‘বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’, সেই গণ্ডি তিনি নিজে ছিন্ন করেছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুলে দিয়েছিলেন মুক্তির দুয়ার।

রাসসুন্দরী দেবী তার গ্রন্থে ছয়-সাত বছর বয়স থেকে নিজের জীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন। শৈশবে তিনি ছিলেন ভীতু প্রকৃতির। তার এই ভয় দূর করার জন্য তার মা তাকে এক মহামন্ত্র দিয়েছিলেন, ‘ভয় হইলেই দয়ামাধবকে ডাকিও।’ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, এই দয়ামাধবের মন্ত্রটিই তাকে সারাজীবন শোক, তাপ ও ভয়ে সান্ত্বনা দিয়ে গেছে।

রাসসুন্দরীর লেখাপড়া শেখার প্রবল ইচ্ছে ছিল কেবল ‘চৈতন্য ভাগবত’ পড়ার জন্য। কিন্তু ওই সময়ে নারীশিক্ষা ছিল এক নিষিদ্ধ ফল। প্রচলিত বিশ্বাস ছিল যে, মেয়েরা পড়াশোনা করলে পরিবারের অমঙ্গল হবে, তারা অকালে বিধবা হবে। তৎকালীন গ্রামীণ জনপদের শিক্ষার চিত্রটি ছিল অদ্ভুত। রাসসুন্দরীদের বাড়িতেই ছেলেদের স্কুল বসত। একজন মেমসাহেব সেখানে পড়াতে আসতেন। রাসসুন্দরীর কাকা তাকে প্রতিদিন সেই মেমসাহেবের কাছে রেখে আসতেন।

তিনি লিখেছেন, “তখন ছেলেরা ক, খ চৌত্রিশ অক্ষরে মাটিতে লিখিত, পরে এক নড়ি হাতে লইয়া ঐ সকল লেখা উচ্চৈঃস্বরে পড়িত। আমি সকল সময়ই থাকিতাম। আমি মনে মনে ঐ সকল পড়াই শিখিলাম।” এমনকি তিনি গোপনে পারসি ভাষাও কিছুটা শিখেছিলেন। নিজের এই জ্ঞানতৃষ্ণার কথা তিনি গোপন রাখতেন, কারণ জানতেন জানাজানি হলে বিপদ হতে পারে। এই আখ্যানটি থেকে আমরা উনিশ শতকের গ্রামীণ জনপদের নারীবিদ্বেষী সমাজকাঠামোর এক স্পষ্ট চিত্র পাই।

মাত্র চার বছর বয়সে রাসসুন্দরী পিতৃহারা হন। ফলে পিতার কোনো স্মৃতিই তার মনে ছিল না। তার এই স্মৃতিচারণে ফুটে উঠেছে উনিশ শতকের বিধবা নারীদের জীবনসংগ্রাম। এছাড়া ফুটে উঠেছে ওই সময়ে নারীর প্রতি পুরুষতন্ত্রের দৃষ্টির কথা। তিনি ছিলেন সুন্দরী, আর এই সৌন্দর্যই তার জীবনে বয়ে এনেছিল নানা লাঞ্ছনা ও শারীরিক নির্যাতন। বহিরাগতদের হাতেও তাকে মারধর সহ্য করতে হয়েছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে মনে হয়, একশ-দেড়শ বছর পরেও নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান কি খুব বেশি বদলেছে?

মাত্র ১২ বছর বয়সে রাসসুন্দরীর বিয়ে হয়। সেই বাল্যবিবাহের বিবরণ ছিল নির্মম। যে কন্যা বিয়ের মানেই বোঝে না, তাকে কোলে করে পাঠানো হলো স্বামীর বাড়ি। তিনি নিজের মানসিক অবস্থাকে তুলনা করেছেন ‘বলির পাঁঠার’ সঙ্গে। তিনি লিখেছেন, “যখন দুর্গোৎসবে কি শ্যামাপূজায় পাঁঠা বলি দিতে লইয়া যায়, সে সময়ে সেই পাঁঠা যেমন প্রাণের আশা ত্যাগ করিয়া হতজ্ঞান হইয়া মা মা মা বলিয়া ডাকিতে থাকে, আমার মনের ভাবও তখন ঠিক সেই প্রকার হইয়াছিল।”

পাবনার পোতাজিয়া থেকে ফরিদপুরের রামদিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছাতে নৌকাযোগে তিনদিন সময় লাগত। শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছে তার মনে হয়েছিল, তিনি যেন জন্মের মতো একটি ‘সোনার খাঁচায় বা পিঞ্জরে’ বন্দি হলেন। এই পরাধীনতার গ্লানি তাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

রাসসুন্দরী দেবীর পারিবারিক জীবন ছিল কর্মমুখর ও বেদনাবিধুর। আঠারো বছর বয়সে তিনি প্রথম মা হন। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছরে তিনি একে একে ১২টি সন্তানের জন্ম দেন। শেষ সন্তানের জন্মের সময় তার বয়স ছিল ৪১ বছর। এই ২৩ বছর যে কী ধকলের মধ্য দিয়ে গেছে, তা তিনি নিজেই লিখেছেন, “ঐ ২৩ বৎসর আমার যে কি প্রকার অবস্থায় গত হইয়াছে তাহা পরমেশ্বর জানিতেন, অন্য কেহ জানিত না।”

তার ১২ সন্তানের মধ্যে সাতজনই শৈশবে মারা যায়। এটি সেই সময়ের উচ্চ শিশু মৃত্যুহারের এক করুণ উদাহরণ। তার আট পৌত্র, নয় পৌত্রী ও দৌহিত্রদেরও অকাল মৃত্যুর সাক্ষী ছিলেন তিনি। এই অবিরাম জন্ম ও মৃত্যুর মিছিল তার জীবনে বিষাদের ছায়া ফেলেছিল।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাসসুন্দরী দেবী তার আত্মজীবনীতে স্বামী সীতানাথ সরকারের (শিকদার) কথা খুব একটা উল্লেখ করেননি। দীনেশচন্দ্র সেন একে ‘লজ্জাশীলতা’ বললেও এর গভীরে লুকিয়ে ছিল এক না-বলা অভিমান ও পরাধীনতা। স্বামী সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, “বাস্তবিক তিনি বেশ লোক ছিলেন, কিন্তু দেশাচার ত্যাগ করা ভারি কঠিন ব্যাপার।” তিনি নিজেকে স্বামীর ‘অধীনী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই ‘অধীন’ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের নারীর প্রকৃত অবস্থান।

বাড়িতে নয়জন চাকর-বাকর থাকলেও অন্দরমহলের সমস্ত কাজ করতে হতো রাসসুন্দরীকেই। বুক পর্যন্ত লম্বা ঘোমটা টেনে তাকে রান্না করা, সন্তানদের খাওয়ানো, শাশুড়ির সেবা- সবই একা হাতে সামলাতে হতো। এমনকি স্বামীর ঘোড়ার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ও তাকে ঘোমটা দিতে হতো। এই যে অবরোধ, এই যে নিজেকে আড়াল করার সংস্কৃতি, তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়ে দিত যে তিনি কেবল একজন গৃহদাসী ছাড়া আর কিছুই নন।

রাসসুন্দরী দেবী আমাদের দেখিয়ে গেছেন কীভাবে পরাধীনতার নিগড়ে বন্দি থেকেও অন্তরে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখা যায়। একুশ শতকে এসেও যখন আমরা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলি, তখন রাসসুন্দরী দেবীর লড়াই আমাদের প্রেরণা দেয়। তিনি নিজে একা সেই অর্গল ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য মুক্ত আকাশের পথ দেখিয়ে গেছেন।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর