কক্সবাংলা ডটকম :: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার কারণে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিলে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি তেলসহ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যা দেশের জ্বালানি আমদানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধের কারণে বাড়তে পারে জ্বালানির দামও।
বর্তমানে বিপিসির কাছে ১৫ দিনের পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত থাকলেও সরকারের মূল চিন্তা এলএনজি নিয়ে। সব মিলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে। আসছে গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না পেলে দেশজুড়ে গরমে তীব্র লোডশেডিংয়ের শঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও এলএনজি আমদানিকারকদের আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। ফলে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বাড়বে। দেশের বাজারে তখন দাম বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায়, বিমা প্রিমিয়াম বেড়ে গেলে শিপমেন্ট বিলম্বিত হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে বড় ধরনের জ্বালানিসংকট তৈরি হতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিসহ শিল্প খাতে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ ছাড়া আমদানি বিল বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বর্তমানে যুদ্ধঝুঁকির জন্য এই রুট নিয়ে সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যাহত হওয়ার উপক্রম। এর প্রভাবে তেলের বাজার আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের গ্যাসের চাহিদার ৩০ শতাংশের বেশি পূরণ হচ্ছে এলএনজি দিয়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এলএনজির দামও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত দেশে আসা এলএনজির পুরোটাই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
যার বেশির ভাগ আসে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার ও ওমান থেকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি করে। কাতার থেকে এলএনজি আমদানির একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালি। কাজেই এটি বন্ধ হওয়ায় বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, যেহেতু এটি সর্বাত্মক যুুদ্ধ। এজন্য জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়বে। আমাদের এখন জ্বালানির যে মজুত আছে তা দিয়ে কিছুদিন চালানো যাবে। পাইপলাইনে যে জ্বালানি আসছে তা নিয়েও সমস্যা নাই। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না হলে মার্চ মাস পর্যন্ত কোনো সমস্যা হবে না। আপাতত আমাদের মূল চিন্তা এলএনজি নিয়ে।
যে কয়টা কার্গো আসার কথা এর মধ্যে তিনটি কার্গোর বিষয়ে আমরা নিশ্চিত না। বাকিগুলোর বিষয়ে নিশ্চিত, এগুলো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। এগুলো পাওয়া যাবে। এরই মধ্যে সরকার এলএনজি নিয়ে সবার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করছে যাতে করে যুদ্ধকালীল সমস্যা খুব বেশি না হয়।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোর বড় অংশের কাতার থেকে এলএনজি আসে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সোর্সিংটা বন্ধ হয়ে যাবে। আর এলএনজি সমুদ্রপথ ছাড়া অন্য আর কোনোভাবে আমদানি করা যাবে না। যুদ্ধের কারণে এলএনজির দামও বৃদ্ধি পাবে বলে শঙ্কা আছে।
বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকটের জন্য আমদানিকৃত এলএনজির বেশির ভাগই দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া সার কারখানা, শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যিক খাতে এই গ্যাস ববহৃত হয়। এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলে বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, আমরা চীন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর এই চারটি দেশ থেকে পরিশোধিত তেল আমদানি করি। ফলে আপাতত চিন্তা নেই। বিপিসির আগামী ১৫ দিনের বেশি তেলের মজুত সংরক্ষিত আছে। যদি যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত না হয় তাহলে কোনো সমস্যায় পড়ব না। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সারা বিশ্বের সঙ্গে আমাদেরও সমস্যা হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এখন আন্তর্জাতিকভাবে আকাশ ও নৌপথে চলাচল বিঘ্নিত। এজন্য আসছে দিনে জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও তেলভিত্তিক নয়। এতে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি আরও স্পষ্ট হবে। যুদ্ধ শিগগিরই বন্ধ না হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যের ওপর। আগামী দুই-একদিনের মধ্যে বোঝা যাবে এটি দেশের বাজারে জ্বালানির মূল্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেলে শিল্প উৎপাদন ব্যয়, সারের দামও বৃদ্ধি পাবে। যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে হলে শ্রমবাজার এবং রপ্তানি পণ্যের ওপর প্রভাব পড়বে। আমদানি খরচও বাড়বে।
গত দুই মাসে ইরানের ওপর হামলা হতে পারে এই আশঙ্কা থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি ১০ থেকে ১২ ডলার তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। এখন যুদ্ধ শুরুর পর সেটা কোথায় যায় দেখতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়।
এই প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ হলে আন্তর্জাতিকভাবে বাজারে তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বেড়ে যাবে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের জাহাজ ভাড়া বেশি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এরই মধ্যে গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম যেখানে ছিল ৬১ ডলার সেটি বৃদ্ধি পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৬৭ ডলারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক ফলহীন হওয়ার পর থেকেই এই বাজারে অস্থিরতা বাড়ছিল। শনিবার মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক হামলার পর এই দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।













