বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি : তাপ ও আর্দ্রতার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

🗓 বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৯ বার দেখা হয়েছে

🗓 বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৯ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১১ মার্চ) :: বৈশ্বিক উষ্ণতা দ্রুত বাড়তে থাকায় তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় ক্রমেই ওপরে উঠে আসছে বাংলাদেশ।

নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বাড়তে থাকা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাবে ইতোমধ্যে দেশের কোটি মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের বড় অংশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চল ধীরে ধীরে এমন অবস্থার দিকে যাচ্ছে, যেখানে তাপ ও আর্দ্রতার যৌথ প্রভাবে মানুষের বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ : হেলথ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণতাই এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা দ্য ন্যাচার কনজারভ্যান্সির গবেষকরা। এতে ১৯৫০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাত দশকের জলবায়ু তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষণাটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো, যখন শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে।

২০২৪ সালকে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ওই বছর বিশ্বজুড়ে ৪৩ শতাংশের বেশি তরুণ এবং প্রায় ৮০ শতাংশ বয়স্ক মানুষ এমন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন, যখন তাপ ও আর্দ্রতা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সীমিত করে দিয়েছে।

বছরে আড়াই হাজার ঘণ্টা তীব্র তাপের মুখে

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে বয়স্ক মানুষরা বছরে দুই হাজার ৫০০ ঘণ্টারও বেশি সময় এমন তীব্র তাপ ও আর্দ্রতার মুখোমুখি হন, যখন নিরাপদে বাইরে শারীরিক কাজ করা প্রায় অসম্ভব। অথচ বিংশ শতকের মাঝামাঝিতে তাপপ্রবাহ এবং উচ্চ আর্দ্রতার মুখোমুখি হওয়ার সময় ছিল প্রায় দুই হাজার ১৮০ ঘণ্টা। অর্থাৎ, অতীতের তুলনায় এখন বছরে প্রায় ৩৯০ ঘণ্টা বেশি সময় তীব্র তাপের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

বছরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় বয়স্ক মানুষরা কেবল ধীরগতিতে হাঁটা বা হালকা গৃহস্থালি কাজের বাইরে অন্য কোনো শারীরিক কাজ করতে পারেন না। কারণ, এ সময় সামান্য বেশি পরিশ্রম করলেই তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র আর্দ্রতা এবং ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যা– এই তিনটি উপাদানের সমন্বয় বাংলাদেশকে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির দিক থেকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে তাপজনিত সীমাবদ্ধতা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে বয়স্ক মানুষরা এখন বছরে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৮০০ ঘণ্টা তীব্র তাপের কারণে দৈনন্দিন কাজকর্মে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছেন। ১৯৫০-এর দশকের তুলনায় এটি কয়েকশ ঘণ্টা বেশি।

গবেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে সিঁড়ি ভাঙা, ঘরের কাজ করা বা বাইরে হাঁটার মতো সাধারণ কাজও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের জন্য, যাদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক কম সক্ষম।

গবেষণায় মানবদেহ তাপের প্রতি কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা বোঝার জন্য একটি শারীরবৃত্তীয় মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সম্মিলিত প্রভাব মানুষের শরীরের স্বাভাবিক শীতল থাকার ক্ষমতাকে দ্রুত ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ঝুঁকিতে

গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে বছরের সবচেয়ে গরম সময়গুলোতে তাপমাত্রা নিরাপদ শারীরিক কর্মকাণ্ডকে কঠোরভাবে সীমিত করে দেয়। তরুণদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। ১৯৫০-এর দশকে তরুণদের বছরে গড়ে প্রায় ২৫ ঘণ্টা তীব্র তাপজনিত সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হতো।

কিন্তু গত এক দশকে তা বেড়ে প্রায় ৫০ ঘণ্টায় পৌঁছেছে। তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষরা বছরে গড়ে প্রায় ৯০০ ঘণ্টা এমন তাপের মুখোমুখি হন, যখন নিরাপদে শারীরিক কাজ করা কঠিন। ১৯৫০-এর দশকে এ সময় ছিল প্রায় ৬০০ ঘণ্টা।

কিছু অঞ্চল বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠতে পারে

গবেষণার প্রধান লেখক ও জলবায়ুবিজ্ঞানী লুক পারসন্স বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে না; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিরাপদভাবে পরিচালনার সময়ও কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু জায়গায় ছায়ার মধ্যেও সামান্য শারীরিক কাজ মানুষের শরীরের শীতল থাকার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। গবেষকরা এমন কিছু অঞ্চলও চিহ্নিত করেছেন, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হিসেবে বর্ণনা করা যাবে।

অর্থাৎ, ছায়াযুক্ত ও বাতাস চলাচলকারী জায়গায় বিশ্রাম নিলেও সেখানে বিপজ্জনক তাপজনিত চাপ তৈরি হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বাস করেন, যেখানে বছরের সবচেয়ে গরম সময়ে বয়স্কদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দো-গঙ্গা সমভূমি, যার মধ্যে বাংলাদেশের বড় অংশ এবং ভারতের পূর্বাঞ্চল অন্তর্ভুক্ত; এসব এলাকা তাপজনিত ঝুঁকির ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোর একটি। নিম্নভূমি ভূপ্রকৃতি, উচ্চ আর্দ্রতা এবং অত্যন্ত ঘন জনসংখ্যা এখানে তাপের প্রভাব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কিছু ধনী উপসাগরীয় দেশে তীব্র তাপের সময়কাল বেশি হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় মানুষের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। কারণ, এখানে বিপুল জনসংখ্যা, সীমিত শীতলীকরণ অবকাঠামো এবং দুর্বল জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা রয়েছে। ‘পিপল-আওয়ার’ বা মোট মানুষের ওপর তাপের প্রভাব হিসাব করলে দেখা যায়, ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।

জলবায়ুবিজ্ঞানী লুক পারসন্স বলেন, উন্নত দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কুলিং সেন্টার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং উন্নত জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো থাকায় মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষা পায়। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এসব সুবিধা সীমিত হওয়ায় তাপপ্রবাহ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলছে।

তিনি আরও বলেন, যদি আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না করি, তাহলে তীব্র তাপের কারণে মানুষের বসবাস ও জীবনযাত্রার ওপর সীমাবদ্ধতা আরও বাড়বে এবং তা আরও বিস্তৃত হবে। ঝুঁকি কমাতে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, জনসাধারণের জন্য কুলিং সেন্টার স্থাপন, কর্মঘণ্টার সময়সূচি পরিবর্তন এবং নগর পরিকল্পনায় তাপ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির মূল কারণ অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ণ ও দূষণ। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে নগরায়ণ হচ্ছে দ্রুত। কিন্তু এর মধ্যে কোনো পরিকল্পনার ছাপ নেই। ঢাকা ও দেশের অন্যত্র একই চিত্র।

এই বিভাগ এর আরো খবর

হরমুজ়ে তেলের ট্যাঙ্কার পার

বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর