বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধের কারণে পোশাক খাতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা

🗓 বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: যুদ্ধের কারণে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালসহ উপসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটগুলো কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমুদ্রপথে পরিবহন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে দেশে রফতানি আয়ের অন্যতম উৎস পোশাক খাতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে আট মাস ধরেই রফতানি খাত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে, তার মধ্যে নতুন এ পরিস্থিতি অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে মনে করছেন তারা।

দক্ষিণ এশিয়া বিশ্ব পোশাক উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের কারখানাগুলো থেকে ইউরোপের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য নিয়মিত পোশাক সরবরাহ করা হয়। এসব পণ্যের একটি বড় অংশই জরুরি সরবরাহের ক্ষেত্রে আকাশপথে ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে পাঠানো হয়।

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বেশির ভাগ আকাশসীমা বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দুবাই কয়েক দিন কার্যত বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

পরিস্থিতির কারণে কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস ও ইত্তিহাদসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বিমান সংস্থাগুলো বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও কার্গো ফ্লাইট বাতিল করে। আকাশপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় ওই রুটে নির্ভরশীল পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে পণ্য পরিবহনে উপসাগরীয় অঞ্চলের এয়ারলাইনসগুলোর ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। যাত্রীবাহী বাণিজ্যিক ফ্লাইটের কার্গো হোল্ডের পাশাপাশি বিশেষায়িত মালবাহী উড়োজাহাজের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়।

বাংলাদেশের মোট এয়ার কার্গোর অর্ধেকেরও বেশি উপসাগরীয় হাব হয়েই পরিবাহিত হয়। ভারতের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহক। তাদের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ইউরোপ ও অন্যান্য বাজারে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত পোশাকের চালান এখন ঢাকাসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকে পড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আকাশপথের পাশাপাশি সমুদ্রপথেও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় রুটগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ রুটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামী অধিকাংশ কনটেইনার জাহাজ সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল হয়ে যায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক রুটগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।

এরই মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অনেক শিপিং লাইন নতুন বুকিং নিতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে; কেউ কেউ সাময়িকভাবে বুকিং স্থগিত করেছে, আবার কেউ বিকল্প ও দীর্ঘ রুটে ঘুরে চলাচলের কারণে ভাড়া বাড়িয়েছে।

এতে রফতানিকারকদের জন্য কনটেইনার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও পণ্য পৌঁছানোর সময়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা শুধু জ্বালানি বাজারেই নয়, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে দ্রুত সরবরাহনির্ভর ফ্যাশন শিল্পে এর প্রভাব পড়বে আরো বেশি।

বাংলাদেশী পোশাক প্রস্তুতকারক স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রায় ১০ শতাংশ আকাশপথে এবং ৪০-৫০ শতাংশ জাহাজে করে উপসাগরীয় রুটে পরিবহন করা হয়। এ রুট ব্যবহার করলে দূরত্ব তুলনামূলক কম পড়ে।

বাংলাদেশের অন্যতম রফতানি গন্তব্য যেহেতু ইউরোপ তাই এটি আমাদের জন্য অন্যতম প্রধান রুট। এর বাইরে আমরা যে বিকল্প ট্রানজিট সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতাম, তা হলো ভারতের ট্রানজিট সুবিধা। ট্রাকে করে পণ্য ভারতের বিমানবন্দরে পাঠিয়ে সেখান থেকে ট্রানজিট করা হতো।

এটি আমাদের জন্য তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সে সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে গালফ রুটও কার্যত বন্ধ হয়ে পড়েছে। এখন আমাদের কার্যত ভরসা প্যাসিফিক রুট। কিন্তু এ রুটে পরিবহন খরচ বেশি, সময়ও বেশি লাগে। এছাড়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য এয়ার কার্গোতেও যায়। অনেক ক্রেতা নিজেদের খরচে দ্রুত চালান নিয়ে থাকেন। সেখানেও এখন বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে এটি আমাদের জন্য একটি বড় বিপর্যয়।’

দেশের পণ্য রফতানি খাত এরই মধ্যে ধারাবাহিক চাপের মুখে রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

এ সময়ে তৈরি পোশাক (আরএমজি) রফতানি হয়েছে ২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। চলতি মাসে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আট মাসে পণ্য রফতানির অর্থমূল্য ছিল ৩ হাজার ১৯০ কোটি ৫৭ লাখ ৯০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে রফতানি হয় ৩ হাজার ২৯৪ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার ডলারের। এ হিসাবেই রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে বিশ্ববাজারে পণ্য রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি।

কিন্তু এর পরের সাত মাসে টানা নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে দেশের রফতানি খাতে। জানুয়ারিতে (২০২৬) নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ৫০ শতাংশ। ইপিবি কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

এদিকে এরই মধ্যে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ারও ইঙ্গিত দেখা গেছে রফতানি ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তিতে। ১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটর্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র খোলা কমেছে ১০ দশমিক ৬৯ শতাংশ ও নিষ্পত্তি কমেছে ৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

রফতানিকারকরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আগে থেকেই দুশ্চিন্তায় ছিলেন তারা। এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত। পরিস্থিতি শান্ত না হলে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াসহ ভবিষ্যৎ ক্রয়াদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অবধারিতভাবে। সব মিলিয়ে আগামী দিনগুলোতে রফতানির গতিপ্রকৃতি নিয়ে চরম উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের নেতারা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা ঘনীভূত হবে তো বটেই। রেড সির কারণেই এখন সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ হয়েছে।

এর আগেও একবার এ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। তখন কেপটাউন দিয়ে ভারত সাগর হয়ে আটলান্টিক হয়ে ঘুরে যেতে হতো। ওই সময়ে ফ্রেইট চার্জ (পরিবহন খরচ) বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। এখনো সে আশঙ্কা রয়েছে।’

এই বিভাগ এর আরো খবর

হরমুজ়ে তেলের ট্যাঙ্কার পার

বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর