কক্সবাংলা ডটকম(১৩ মার্চ) :: চলতি মার্চের প্রথম ১১ দিনেই প্রবাসীরা প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। দেশের ইতিহাসে স্বল্প সময়ে এত পরিমাণ রেমিট্যান্স আগে কখনো আসেনি।
তার পরও বাজারে ডলারের বিনিময় হার ক্রমাগত বাড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ডলারের দাম প্রায় ১ টাকা বেড়েছে। এক্ষেত্রে ইরানসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে দায়ী করা হচ্ছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এ মুহূর্তে দেশে ডলারের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। তার পরও দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। কারণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স দেশে আসছে। রফতানি আয় কিছুটা কম থাকলেও আমদানির বড় কোনো চাহিদা নেই। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার দাবি জানান তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের প্রথম ১১ দিন তথা ১১ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা ১৯২ কোটি বা ১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার।
সে হিসাবে চলতি মার্চের প্রথম ১১ দিনে ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই দেশে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স আসছে। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১১ মার্চ পর্যন্ত প্রবাসীরা ২৪ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৯ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্সে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও রেমিট্যান্সে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, গত বছরের মে মাস থেকেই ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারনির্ভর। বাজারের চাহিদা ও জোগানই এর দর নির্ধারণে ভূমিকা রাখছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। তবে কেউ যাতে যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি।
আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘প্রবাসীরা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। ব্যাংকগুলোর হাতে চাহিদার চেয়েও বেশি ডলার রয়েছে। বিনিময় হারে যে চাপ দেখা যাচ্ছে, সেটি সাময়িক। দাম বাড়বে, এ আশায় কেউ ডলার ধরে রাখলে ভুল করবেন। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ পরিস্থিতি এখন খুবই ভালো। আশা করছি, দ্রুতই ডলার আবার আগের দরে ফিরে যাবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, গতকাল দেশের আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা পর্যন্ত ওঠে। এর চেয়েও বেশি দরে কিছু ব্যাংক রেমিট্যান্সে ডলার কিনেছে। যদিও গত সপ্তাহের শুরু তথা রোববার প্রতি ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা।
ব্যাংকের পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতেও (কার্ব মার্কেট) ডলারের দর বেড়েছে। কার্ব মার্কেটে গতকাল ডলারের দর ১২৬ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত উঠেছে। রাজধানীর মতিঝিল ও কারওয়ান বাজার এবং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় খবর নিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। যদিও ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের সর্বোচ্চ বিনিময় মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৩০ পয়সা। আর কার্ব মার্কেটে ডলারের দর সর্বোচ্চ ১২৪ টাকায় সীমাবদ্ধ ছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানে যৌথ হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির বহু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিহত হন। জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনায় প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা চালায় ইরান। ইরানি মিসাইল ও ড্রোনের অন্যতম লক্ষ্যে পরিণত হয় আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরব। মধ্যপ্রাচ্যের এ চার দেশই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্স আহরণের বৃহত্তম উৎস হিসেবে পরিচিত।
শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ মনে করেন, বিরাজমান পরিস্থিতিতে দেশে ডলারের বিনিময় হার বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি বলেন, ‘প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। রফতানি খাতেও বড় সংকট এখনো দেখা যায়নি। আবার আমদানিতেও তেমন কোনো প্রবৃদ্ধি কিংবা দায় পরিশোধের চাপ নেই।
তাহলে ডলারের দাম কেন বাড়বে? আমার মনে হয়, কেউ কেউ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সুযোগ নিতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি আমদানিনির্ভর একটি দেশ। ডলারের দরবৃদ্ধির প্রভাব প্রতিটি পণ্যের ওপর পড়বে। মূল্যস্ফীতি আরো উসকে উঠবে।’
প্রসঙ্গত, দেশে ডলারের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয় ২০২২ সালের প্রথম দিকে। ওই বছরের জানুয়ারিতে দেশে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা। এর পর থেকেই ডলারের বাজারে অস্থিরতা চরমে ওঠে। মাত্র এক বছর পর ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১০৩ টাকায় ঠেকে। ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি ডলারের দর ১১০ টাকায় উঠে যায়।
ওই বছরের জুনে এসে বিনিময় হার নির্ধারণে ক্রলিং পেগ নীতি গ্রহণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন এক ধাক্কায় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১১৮ টাকায় ঠেকে। আর গত বছরের ১ জানুয়ারি বিনিময় হার আরো বেড়ে ১২০ টাকায় স্থির হয়। আর বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার দিন তথা গত বছরের ১৪ মে ব্যাংক খাতে প্রতি ডলারের দর ছিল ১২২ টাকা। এর পর থেকে ডলারের দর স্থিতিশীল ছিল।
বাজার স্থিতিশীল রাখার কথা বলে ২০২২ সাল থেকে বাজারে ডলার বিক্রি শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২১-২২ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় ৭৬২ কোটি বা ৭ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ বিক্রি আরো বাড়িয়ে ১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা হয় আরো ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার।
টানা তিন অর্থবছর ধরে ডলার বিক্রির কারণে রিজার্ভে বড় ধরনের পতন হয়। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার গ্রস রিজার্ভ ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সে রিজার্ভ কমে ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে যায়। আর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী (বিপিএম৬) রিজার্ভ নেমে যায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের ঘরে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় উল্লম্ফনের পাশাপাশি রিজার্ভও বাড়তে থাকে। উদ্বৃত্ত থাকায় চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে ডলার কেনা শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন পর্যন্ত বাজার থেকে ৫ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছে। এতে ১১ মার্চ পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভ বেড়ে ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। আর বিপিএম৬ অনুযায়ী, দেশের রিজার্ভ এখন ২৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।














