কক্সবাংলা ডটকম :: পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ এখন কেবল স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জায়গা নয়, বরং ট্রিলিয়ন ডলারের এক উদীয়মান অর্থনীতির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
মহাকাশে ডেটা সেন্টার তৈরি থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা সব মিলিয়ে এ খাতে এখন শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের জোয়ার বইছে।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, মানুষের মাথার ওপর তৈরি হচ্ছে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ এক অবকাঠামো।
মহাকাশের যে অংশটি পৃথিবী থেকে ২ হাজার কিলোমিটার বা তার কম উচ্চতায় অবস্থিত নাসা তাকে ‘লো আর্থ অরবিট’ বা এলইও বা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে।
এক সময় পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণার জায়গা থাকলেও বর্তমানে তা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে ন্যাভিগেশন (জিপিএস), টেলিযোগাযোগ, প্রতিরক্ষা ও ইন্টারনেট সংযোগের মূল ভিত্তি হয়ে উঠছে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ। ফলে এখানে এখন বইছে বিনিয়োগের জোয়ার।
নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর কাছাকাছি হওয়ায় এগুলো দ্রুত সংকেত পাঠাতে, উৎক্ষেপণ খরচ কমাতে ও যোগাযোগে বাড়তি গতি দিতে পারে।
পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথের স্যাটেলাইটের মতো এগুলো স্থির থাকে না, বরং অনেক স্যাটেলাইট মিলে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে এক নেটওয়ার্ক বা ‘গুচ্ছ’ হিসেবে কাজ করে, যা গোটা পৃথিবীকে যোগাযোগ সুবিধা দেয়।
২০২৫ সালে এই খাতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে, এক বছর আগেই যা ছিল আড়াই হাজার কোটি ডলারের ওপরে।
সুইস সাইবার সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইজকি’র প্রধান নির্বাহী কার্লোস মোরেরা বলেছেন, “পৃথিবীর বন্দর, কেবল বা এনার্জি গ্রিডের মতোই কক্ষপথ এখন এক কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে।”
এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইলন মাস্কের দ্রুত বাড়তে থাকা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক।
তার রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স বর্তমানে স্টারলিংকের অধীনে সাড়ে ৯ হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট পরিচালনা করছে।

এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইলন মাস্কের দ্রুত বাড়তে থাকা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক। ছবি: রয়টার্স
কোম্পানিটি এই সংখ্যা আরও কয়েক হাজার বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছে। মাস্ক সৌরশক্তিচালিত ‘অরবিটাল ডেটা সেন্টার’ প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে ভবিষ্যতে প্রায় ১০ লাখ স্যাটেলাইট থাকতে পারে।
তবে স্পেসএক্স এই দৌড়ে একা নয়। এ সপ্তাহেই প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী কোম্পানি এনভিডিয়া কক্ষপথে এআই কম্পিউটিং সুবিধা পৌঁছে দিতে নতুন এক প্ল্যাটফর্ম উন্মোচন করেছে।
এ সিস্টেমটি অরবিটাল ডেটা সেন্টার, জিওস্প্যাশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও স্বচালিত মহাকাশ অভিযান পরিচালনায় সহায়তার জন্য ডিজাইন করেছে মার্কিন চিপ জায়ান্টটি।
স্যান হোসেতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের ‘জিটিসি’ সম্মেলনে এনভিডিয়া প্রধান জেনসেন হুয়াং বলেছেন, “একসময় স্পেস কম্পিউটিং ছিল শেষ প্রান্তর, যা এখন নাগালে এসেছে।”
তিনি বলেছন, এ প্রযুক্তির ফলে বিভিন্ন অরবিটাল ডেটা সেন্টার আবিষ্কারের যন্ত্রে পরিণত হবে ও মহাকাশযানগুলো হয়ে উঠবে সম্পূর্ণ স্বচালিত।
এদিকে, আগে ‘প্রজেক্ট কুইপার’ নামে পরিচিত ‘অ্যামাজন এলইও’ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে তিন হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
বছরের শুরুতে তাদের আরও সাড়ে চার হাজার স্যাটেলাইট পাঠানোর অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন ফেডারেল কমিউনিকেশন্স কমিশন বা এফসিসি।
পাশাপাশি জেফ বেজোসের কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’ ২০২৭ সালের শেষদিকে পাঁচ হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইউরোপে ‘ইউটেলস্যাট’-এর ‘ওয়ানওয়েব’ নেটওয়ার্কের আওতায় বর্তমানে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ছয়শর বেশি স্যাটেলাইট রয়েছে, যা মাস্কের স্যাটেলাইটের তুলনায় কমই।
তবে ফ্রান্স সরকার আশা করছে, একদিন স্টারলিংকের সঙ্গে পাল্লা দেবে তাদের কোম্পানির বিভিন্ন স্যাটেলাইট।
এ লক্ষ্যে ইউটেলস্যাটে ১৫৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে কোম্পানিটির ৩০ শতাংশ শেয়ার কিনেছে ফ্রান্স সরকার। ফলে ফ্রান্স এখন কোম্পানিটির সবচেয়ে বড় মালিক।
অন্যদিকে চীনও পিছিয়ে নেই। তারা ১৪টি নেটওয়ার্কের অধীনে দুই লাখেরও বেশি স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা জমা দিয়েছে।
এ বিশাল পরিমাণ স্যাটেলাইট পাঠানোর পরিকল্পনা মহাকাশের ব্যবহার, শাসন ও বাণিজ্যিকীকরণের চিত্র পুরোপুরি বদলে দেওয়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিনিয়োগের নতুন সময়
‘স্পেস ক্যাপিটাল’-এর তথ্য অনুসারে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত মহাকাশ অর্থনীতিতে ৪০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে।
এ বিনিয়োগের অর্ধেকেরও বেশি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে, যার ঠিক পরেই রয়েছে চীনের অবস্থান।
স্পেস ক্যাপিটালের সিইও চ্যাড এন্ডারসন বলেছেন, এ শিল্পটি এখন “কয়েক দশকের দীর্ঘ অবকাঠামো চক্রের প্রাথমিক পর্যায়ে” রয়েছে।
এ খাতটি বিকাশের প্রাথমিক স্তরে থাকলেও এখন পাবলিক মার্কেটে বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য যথেষ্ট পরিপক্ক হয়ে উঠেছে।
এরইমধ্যে প্রায় এক ডজন মহাকাশ কোম্পানি শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং আগামী বছরে আরও অনেক কোম্পানি সম্ববত যোগ হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রতীক্ষিত স্পেসএক্সের আইপিও।
এন্ডারসন বলেছেন, স্পেসএক্সের এই আইপিও মহাকাশ খাতের জন্য এক ‘নেটস্কেপ মোমেন্ট’ বা যুগান্তকারী ঘটনা হতে পারে, যা বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশাকে নতুন রূপ দেবে ও বাজারে বড় পুঁজি নিয়ে আসবে।
তবে এ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের দ্রুত প্রসারের বিষয়ে ‘ওয়াইজকি’র মোরেরা সতর্ক করে বলেছেন, মহাকাশের এই বিস্তারকে ‘পৃথিবীর ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের মতোই গুরুত্ব ও গাম্ভীর্যের সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে’।
তিনি আরও বলেছেন, মহাকাশ যেন অনিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা বা ঝুঁকির জায়গা না হয়ে বরং মানুষের কল্যাণে, যেমন যোগাযোগ রক্ষা, আবিষ্কার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহৃত হয়।

জেফ বেজোসের কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’ ২০২৭ সালের শেষদিকে পাঁচ হাজারেও বেশি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
নিয়ন্ত্রণ ও ঝুঁকির চ্যালেঞ্জ
বাজারের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে নিম্ন কক্ষপথের অগোছালো শাসনব্যবস্থা এবং এর পরিচালনার বহুমুখী জটিলতা।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ বা মহাকাশ চুক্তি অনুসারে, যে কোনো রাষ্ট্র তাদের আওতাধীন সব ধরনের মহাকাশীয় কর্মকাণ্ডের জন্য দায়বদ্ধ।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের বিভিন্ন মহাকাশ বর্জ্য প্রশমন নির্দেশিকা কেবল স্থায়িত্ব রক্ষার কিছু নীতি প্রদান করে, যা মানা বাধ্যতামূলক নয়।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন বিশ্বজুড়ে স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করে, যা যোগাযোগ নেটওয়ার্কের কাজে বিঘ্ন ঘটা রোধ করে। এ আনুষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি ‘স্পেস সেইফটি কোয়ালিশন’-এর মতো শিল্প গোষ্ঠীগুলো স্বেচ্ছায় সর্বোচ্চ মানের চর্চা বজায় রাখার প্রচার চালায়।
জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ এ কার্যক্রম তদারকি করে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রে এফসিসি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ও তরঙ্গের লাইসেন্স দেয় এবং এফএএ রকেট উৎক্ষেপণ ও পৃথিবীতে ফিরে আসার বিষয়গুলো দেখাশোনা করে।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এসব আইন ও কাঠামো বর্তমান সময়ের চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।
‘সিমন্স অ্যান্ড সিমন্স’-এর টিএমটি আইনজীবী রাজা রিজভি বলেছেন, বর্তমান আইনি কাঠামোর বড় অংশই তৈরি হয়েছিল জিইও বা ভূ স্থির কক্ষপথের তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে।
“এখন আমরা পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের মতো উচ্চ-ঝুঁকি ও জটিল পরিবেশে প্রবেশ করছি। অথচ এই নতুন প্রযুক্তি সামলানোর মতো সুনির্দিষ্ট আইনি হাতিয়ার আমাদের হাতে নেই।”
মহাকাশযান সংক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি ‘কায়হান স্পেস’-এর সিইও সিয়ামাক হেসার বলেছেন, এসব নিয়ম তৈরি হয়েছিল ধীরগতির ও রাষ্ট্রচালিত মহাকাশ কর্মসূচির কথা মাথায় রেখে।
“শিল্পটি যে হারে বড় হচ্ছে এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এসব নিয়মের বিবর্তন প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেছেন, যেহেতু এখন আর সরকার নয় বরং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোম্পানিই মহাকাশের মূল ব্যবহারকারী হয়ে উঠছে ফলে নিয়মকানুন প্রণয়নে এখন ‘নতুন দৃষ্টিভঙ্গি’ দরকার।















