কক্সবাংলা ডটকম(২৬ মার্চ) :: গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলের (রহিত) জন্য বিশেষ কমিটির বৈঠকে সরকারি দল বিএনপির পক্ষ থেকে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে, যা জামায়াত তীব্র বিরোধিতার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বুধবার (২৬ মার্চ) জাতীয় সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিনের বৈঠক করেছে।
সংসদের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে গতকাল পর্যন্ত ১১৫ থেকে ১১৮টি (কম-বেশি) অধ্যাদেশের বিষয়ে বৈঠকে অংশ নেওয়া দলগুলো একমত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বিমত থাকা ১৫ থেকে ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে আগামী রবিবার তৃতীয় দিনের বৈঠকে চূড়ান্ত সমাধান হবে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা।
গতকাল বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিনের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, চিফ হুইপ মো. নুরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ড. মুহাম্মদ ওসমান ফারুক, এ. এম. মাহবুব উদ্দিন খোকন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, মুহাম্মদ নওশাদ জমির, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, মো. মুজিবুর রহমান, মো. রফিকুল ইসলাম খান ও জি এম নজরুল ইসলাম।
সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে এ পর্যন্ত ১২টি অধ্যাদেশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় বিভিন্ন মতামত এলেও বেশির ভাগ অধ্যাদেশ সুপারিশ আকারে সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।
তবে কিছু অধ্যাদেশ কেউ কেউ হুবহু রাখার পক্ষে, আবার কেউ কিছু ক্ষেত্রে সংশোধন-পরিবর্তন আনার পক্ষে মত দিয়েছেন। এর মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ নিয়েও বৈঠকে পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়।
তবে ‘জুলাই সুরক্ষা’-সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ হুবহু রাখার বিষয়ে বিশেষ কমিটির সব সদস্য একমত পোষণ করেন। পাশাপাশি সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩ থেকে ৩৫ করা যায় কি না, বিরোধী দল থেকে এমন প্রস্তাব দেওয়া হলেও কমিটির বেশির ভাগ সদস্য ৩২ বছর করার বিষয়ে মত দেন।
‘জুলাই সুরক্ষা’-সংক্রান্ত চার অধ্যাদেশ হুবহু রাখতে ঐকমত্য
বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা জুলাই সুরক্ষা নিয়ে সবাই একমত হয়েছি। ‘জুলাই সুরক্ষা’-সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ নিয়ে কমিটির সব সদস্য একমত পোষণ করেছেন। এগুলো হুবহু সংসদে উপস্থাপন করা হবে।’’
সালাহউদ্দিন বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কমিটির বৈঠকে ১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিনটি ভাগে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
প্রথমত, কিছু অধ্যাদেশ বর্তমানে যা আছে সেভাবেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিল আকারে এনে পাস করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ বিল উত্থাপন করা হবে। তৃতীয়ত, যেসব বিষয়ে একমত হওয়া যাবে না, সেগুলো এই অধিবেশনে ল্যাপস বা বাতিল হয়ে যাবে; যা প্রয়োজনে পরবর্তী অধিবেশনে নতুন বিল হিসেবে আসবে।’
সালাহউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, সাংবিধানিকতা রক্ষা এবং জনপ্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিটি বিল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শেষ হলেও দুদক আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
আগামী রবিবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাই থাকে না
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান গতকাল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই দিনব্যাপী আলোচনায় আমরা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে জনগণের জন্য কল্যাণকর প্রায় ১১৫টি বিষয়ে একমত হয়েছি।
তবে ১৮ থেকে ২০টি বিষয়ে আমাদের গুরুতর দ্বিমত রয়েছে। বিশেষ করে গণভোট বিল রহিত করার যে প্রস্তাব সরকার এনেছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করেছি। কেননা, গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাই থাকে না।’
রফিকুল ইসলাম খান আরও বলেন, ‘দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগে এতদিন একটি সিস্টেম বা সার্চ কমিটি ছিল। কিন্তু এখনকার প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সেই সার্চ কমিটি বাদ দিয়ে সরকার যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষমতা নিতে চাচ্ছে।
একইভাবে পুলিশ কমিশনার এবং আইজিপি নিয়োগেও পেশাদারত্বের চেয়ে সরকারের পছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা বলেছি, এটি জুলাই চেতনার পরিপন্থি এবং আমরা এতে একমত হইনি।’
সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘টু-থার্ড মেজরিটির দোহাই দিয়ে অতীতের সরকার অনেক কিছু করেছে। কিন্তু সেই অহংকার কোনো জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। জনগণের স্বার্থ পরিপন্থি কোনো বিষয়ে আমরা একমত হব না।’
জুলাই সনদ ও সংবিধানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য
বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ১২০টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছি। পর্যালোচনার ক্ষেত্রে জুলাই সনদ এবং দেশের সংবিধানকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে জুলাই-সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশের বিষয়ে কমিটির সবাই একমত হয়েছেন। অবশিষ্ট অধ্যাদেশগুলো নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ পুনরায় আলোচনা করা হবে।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘‘জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ দলিল। এর ৩ নম্বর পেজের ৬-এর ‘ক’ ধারা অনুযায়ী, সনদের ৮৪টি আর্টিকেলের মধ্যে ১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য।
যারা একে বাইপাস করে ভিন্ন কোনো আদেশ দিতে চায়, তারা সনদের পরিপন্থি কাজ করছে। আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।
এমনকি আমরা জুলাই সনদের বাইরে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিইনি। জুলাই সনদ ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশই বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের প্রস্তাব এসেছে বলেও জানান বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন।
তিনি বলেন, ‘সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী নতুন বিল পাসের আগে পুরোনো অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে, যাতে আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।’
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনেই অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী। পরে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।
১৫ মার্চ সংসদ অধিবেশনে সংসদে উত্থাপিত অধ্যাদেশগুলো বিশেষ কমিটিতে পাঠিয়ে ২ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।














