সোমবার ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭১ এর যুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদের পরীক্ষা

🗓 বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

👁️ ২১৩ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০২৬

👁️ ২১৩ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৬ মার্চ) :: সত্তরের নির্বাচনের পরে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসেছিলেন, ফেরার পথে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন যে, শেখ মুজিবই প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তখন তিনি (ইয়াহিয়া খান) আর থাকবেন না।

বলেই হয়তো খেয়াল হয়েছে যে, ওই ভয়ংকর সম্ভাবনাকে ঠেকানো দরকার। সে জন্য তিনি করাচিতে নেমেই ভুট্টোর শরণাপন্ন হয়েছেন। সমস্বার্থের চাপে দুপক্ষ তখন একপক্ষ হয়ে গেছে।

ভুট্টোও তখন বুঝতে শুরু করেছিলেন যে, খোদা না করুন শেখ মুজিব যদি প্রধানমন্ত্রী হন তাহলে তাকে হয় তার অধীনে মন্ত্রিত্ব নিতে হবে, নয়তো বসতে হবে বিরোধী দলের নেতার অস্বস্তিকর আসনে; যে দুটি সম্ভাবনার কোনোটিই তার কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

জাতীয় পরিষদে অবাঙালি সদস্যদের তুলনায় তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল মাত্র ৫৭টি আসনের। তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে, সুযোগের সুগন্ধ পেলে তার দল থেকে কিছু লোক চলে যাবে না। সেক্ষেত্রে দরকষাকষির ভিত্তিটা দুর্বল হয়ে পড়বে।

ভুট্টো তাই মুজিবকে শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়ে ইয়াহিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। বিপদগ্রস্ত ভুট্টো নানা ধরনের উল্টাপাল্টা আওয়াজ তোলা শুরু করলেন। এমনো বলছিলেন, পাকিস্তানে তিনটি রাজনৈতিক দল রয়েছে, আওয়ামী লীগ, পিপলস পার্টি ও সামরিক বাহিনী; তাদের মধ্যে মীমাংসা না ঘটার আগে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটানো যাবে না। আর মীমাংসা হবে গণপরিষদের বাইরে, ভেতরে নয়।

শেষ পর্যন্ত এমন কথাও তিনি বলেছেন যে, ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে দুই পাকিস্তানে দুই মেজরিটি পার্টির কাছে। এসব কথা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল; কিন্তু এগুলো তিনি বলেছেন, সামরিক বাহিনীর প্রশ্রয়েই।

সেনাকর্তাদের তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, আওয়ামী লীগ একটি বুর্জোয়া দল, এদের পক্ষে কোনো জনবিদ্রোহ করা সম্ভব নয়। সেনাকর্তারা শুনেছেন, কারণ তাদের জন্য আশ্বাসের খুব দরকার ছিল। তবে দুপক্ষের মধ্যে সম্পর্কটা যে ভালোবাসার ছিল না সেটা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবেই জানা গেছে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ভুট্টো যখন প্রেসিডেন্ট ও চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হয়েছেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই ইয়াহিয়া খানকে গৃহবন্দি করে ফেলেছেন এবং সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই ইয়াহিয়া ও তার সহকর্মীদের ব্যর্থতার তদন্তের জন্য একটি কমিশন বসিয়ে দেন।

যুদ্ধ যখন তুঙ্গে তখন ভুট্টো একটি বই লেখেন ‘দ্য গ্রেট ট্র্যাজেডি’ নাম দিয়ে; সে বইয়ে মহাবিজ্ঞের মতো তিনি বলেন যে, তিনি আশা করেন সেনাবাহিনীর লোকেরা আওয়ামী লীগের শহুরে সদস্যদের নিরস্ত্র করার মধ্যেই নিজেদের কর্মক্ষেত্র সীমাবদ্ধ রেখেছে, গ্রামের মানুষকে ঘাঁটায়নি; কেননা ঘাঁটালে সত্যিকারের বিপদ ঘটবে।

তিনি জানতেন না যে, সামরিক বাহিনীর পক্ষে গ্রামের মানুষের ওপর অত্যাচার না করে উপায় ছিল না। কারণ শহর-গ্রাম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব মানুষ তখন হানাদারদের বিরুদ্ধে এক হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। হানাদাররা অবশ্য কোনো তত্ত্বের পরোয়া করেনি, তারা সরাসরি গণহত্যায় নেমে পড়েছিল।

ঢাকায় ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে প্রহসনের সংলাপ যখন চলছিল তখন ভুট্টোর সঙ্গে মুজিবের একবার দেখা হয়। প্রেসিডেন্ট ভবনেই। মুজিব তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এরা কিন্তু আগে আমাকে মারবে, তারপর তোমাকে।’ ভুট্টো নাকি নাটকীয়ভাবে জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি সেনাবাহিনীর হাতে মরব তবু ইতিহাসের হাতে মরব না।’

এ খবর তিনি জানিয়েছেন আমাদের, তার ওই বইয়ের মারফত। তা ইতিহাসের জন্য অপেক্ষা করার দরকার পড়েনি, সেনাবাহিনীর হাতেই তো তিনি প্রাণ দিলেন। সেনাবাহিনী কিন্তু শেখ মুজিবের গায়ে হাত দিতে পারেনি, তাদের উৎকণ্ঠা ছিল তাকে জীবিত অবস্থায় বন্দি করে পাকিস্তানে নিয়ে যেতে পারবে কি না, তা নিয়ে। নিতে পেরেছিল দেখে আশ্বস্ত হয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তান নিজেই তো ততদিনে ভেঙে গেছে।

২৬ মার্চ পাকিস্তানের মৃত্যুবার্ষিকী বৈকি। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ২৬ মার্চ করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করে তিনি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন পাকিস্তানকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য। সেদিন ভুট্টো কি সত্যি সত্যি ভেবেছিলেন যে, গণহত্যা পাকিস্তানকে বাঁচাবে নাকি তিনি সেনাবাহিনীর তৎপরতা দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন? ভেবেছিলেন কি যে ওই রকমের একটি আওয়াজ না দিলে তাকেও ওই ভগ্নস্তূপে নিক্ষেপ করা হবে?

নাকি তিনি ইতিহাসজ্ঞান ও বাস্তববুদ্ধি দুটোই হারিয়ে ফেলেছিলেন ক্ষমতার লোভে? তবে তিনি যে অস্থিরচিত্ত এক জুয়াড়ি ছিলেন তা মোটেই মিথ্যা নয়। অপরিণামদর্শী ও ক্ষমতাভোগী সেনাকর্তাদের অভিসন্ধির বিরুদ্ধে তিনি যদি শেখ মুজিবের সঙ্গে হাত মেলাতেন তবে ইতিহাস কোন গতিপথ বেছে নিত আমরা জানি না, তবে যে গতিপথে এগোচ্ছিল সেটি ধরে হয়তো এগোত না।

ভুট্টো প্রতারণা কিছু কম করেননি। পঁয়ষট্টিতে আইয়ুব খানকে তিনি উসকানি দিয়েছেন যুদ্ধে নামতে, অভিসন্ধি ছিল তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় কি না সেটা দেখা। একাত্তরে ইয়াহিয়া খানকেও একই উসকানি দিয়েছেন, একই অভিসন্ধির তাড়নায়। বলেছিলেন চীন থেকে সাহায্য এনে দেবেন। চীনে গিয়েছিলেনও, কিন্তু যুদ্ধ বাঁধলে চীন তাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি পাননি এবং পাননি যে সে কথাও ইয়াহিয়াকে জানাননি। পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপ্রধান নিয়াজী তো চীন আসবে করতে করতেই শেষ হয়ে গেলেন।

ইয়াহিয়া তখন সর্বশক্তিমান; কিন্তু তিনিও যে স্বাধীন ছিলেন এমন নয়। তার চারপাশে যেসব বাজপাখি ওঁৎ পেতে বসেছিল তাদের সম্মতির বাইরে পদক্ষেপ করবেন এমন ক্ষমতা তার ছিল না। কোনো কোনো জেনারেলের সঙ্গে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভুট্টোর যে ঘনিষ্ঠতা ছিল এ খবরও তার অজানা থাকার কথা নয়। ক্ষমতালিপ্সায় ভুট্টো তখন চরমপন্থি জাতীয়তাবাদী। একপর্যায়ে তো শেখ মুজিবকেই বলেছিলেন যে, ‘তুম উধার আম ইধার’।

ভাবটা অনেকটা ১৯৪৬-৪৭-এ অখণ্ড বাংলার হিন্দু মহাসভাপন্থিদের মতো; ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কায় যারা বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। ক্ষমতাই যদি না থাকল তাহলে তাতে দেশে থাকলেই কী, না থাকলেই বা কী। মহাসভাপন্থিরাও জাতীয়তাবাদীই ছিলেন হিন্দু জাতীয়তাবাদী।

ইয়াহিয়া খান ওদিকে বিদ্রোহী বাঙালিদের ভয় করতেন। যে জন্য গণহত্যার হুকুম দিয়ে তস্করের মতো পালিয়েছিলেন এবং বলে রেখেছিলেন যে, তিনি নিরাপদে করাচি না পৌঁছার আগে যেন হত্যাকাণ্ড শুরু না করা হয়। তারপর ৩ ডিসেম্বর ভারত আক্রমণ করার পর থেকেই তিনি যুদ্ধে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।

তখন তিনি এমনকি নিজের দপ্তরে আসাও পছন্দ করতেন না; দুঃখকে ডুবিয়ে মারবার জায়গা-জমিন খুঁজতেন। একবার তো রটেই গিয়েছিল যে, সেনাপ্রধান আবদুল হামিদ খান ক্ষমতা দখল করে নিয়েছেন। সাবধানতার প্রয়োজনে হামিদ খানকে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাখাটাই পছন্দ করতেন।

শেখ মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বলেছিলেন তাকে শাস্তি না দিয়ে ছাড়বেন না এবং হুংকার দিয়েছিলেন এক ইঞ্চি ভূমিও ছেড়ে দেওয়া হবে না। শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই করতে পারলেন না। হামুদুর রহমান কমিশন তার ব্যাপারে তদন্ত করল, তাকে কোর্ট মার্শাল করা দরকার বলে জানাল, কিন্তু কোর্ট মার্শাল হলো না, সেনাবাহিনীর চাপেই হবে।

তাছাড়া ক্ষমতায় এসে ভুট্টো তখন নানা ধান্দায় ব্যস্ত আছেন, ভারতে-আটক ৯০ হাজার সৈনিক ফেরত আনা, বাংলাদেশ যে ১৯৫ জনকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে বিচারের জন্য ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে তাদের রক্ষা করা, এসব মোকাবিলা করা সহজ ছিল না।

ইয়াহিয়া ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের বিচার করতে গেলে ভুট্টোর নিজের সংশ্লিষ্টতাও বেরিয়ে পড়বে, এমন ভয়ও যে ছিল না তা তো নয়। ইয়াহিয়া খানরা তাই বিচারের হাত থেকে বেঁচে গেলেন, নইলে শেখ মুজিবের পরিবর্তে তারাই রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হতেন। কারণ আঘাত তারাই প্রথমে করেছেন এবং তার প্রতিক্রিয়াতে রাষ্ট্র ভেঙে গেছে।

বোঝা গেছে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ জিনিসটা কেমন কৃত্রিম ও অস্বাভাবিক ছিল এবং তার সশস্ত্র রক্ষকরা কতটা অন্ধ, মূর্খ ও হৃদয়হীন ছিল। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের ঘূর্ণিপাকে পড়ে সাতচল্লিশে কত মানুষ যে চরম দুর্ভোগ সহ্য করেছে তার হিসাব নেই। একাত্তরে তারই প্রকোপে আবার কতজন কী যন্ত্রণা সহ্য করল তারও হিসাব করা সম্ভব হবে না।

পাকিস্তান এক জাতির রাষ্ট্র ছিল না। সে রাষ্ট্রে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচ, মোহাজের–এদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা ছিল, তাদের দলিতমথিত করে এক জাতিতে পরিণত করা ছিল অসম্ভব কর্ম। করতে গেলে যেসব বিপদ ঘটা সম্ভব তার সবকটিই ঘটেছিল একাত্তরে, পূর্ববঙ্গে তো বটেই পশ্চিম পাকিস্তানেও। যুদ্ধশেষে যে বাংলাদেশ আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি সেটাও কিন্তু এক জাতির দেশ নয়। এখানে অন্য জাতিসত্তাও রয়েছে, তা তারা সংখ্যায় যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন। ভোলা অন্যায় হবে যে আমাদের রাষ্ট্র জাতি-রাষ্ট্র নয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র; এ যুগে এক জাতি এক রাষ্ট্র এমন বিন্যাস আর সম্ভবপর নয়।

পূর্ব যে পশ্চিম থেকে আলাদা হবে এটা অনিবার্য ছিল। তার কারণগুলো আমরা জানি। ভৌগোলিক দূরত্ব, এককেন্দ্রিক শাসন, কেন্দ্রের শোষণ, নানা ক্ষেত্রে বৈষম্য, এসব কারণ মোটেই অপ্রত্যক্ষ ছিল না। কিন্তু জাতীয়তার প্রশ্নটিও যে নির্ধারকের ভূমিকাতে ছিল সেটা যেন না ভুলি।

অবিভক্ত বঙ্গে শোষিত বাঙালি মুসলমান নিজের মুসলমান পরিচয়টি প্রধান হিসেবে দেখতে পেয়েছে, কেননা স্থানীয় শোষক হিসেবে যারা দৃশ্যমান ছিল তাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। সেটাই ছিল কৃত্রিম পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ তৈরির ভিত্তি। ওটিকে তৈরি করা বিশেষভাবে দরকার হয়ে পড়েছিল শ্রেণিচেতনাকে দমিয়ে রাখার জন্য।

পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর বাঙালি মুসলমান দেখল যে সে শোষিত হচ্ছে একদল মুসলমানের দ্বারা, যারা অবাঙালি; তখন তার ভেতর যে চেতনাটি বড় হয়ে দেখা দিল সেটা বাঙালি জাতীয়তাবাদের। ওটি সব সময়েই ছিল, বলা যায় সুপ্ত না থেকে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল। জাতীয়তাবাদের এ বিষয় বিবেচনার মধ্যে না নিলে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে না।

আইয়ুবী শাসনামলে বাঙালি অর্থনীতিবিদরা দুই অর্থনীতির বাস্তবতাকে তুলে ধরেছিলেন। পাকিস্তানি শাসকরা তাতে বিব্রত তো অবশ্যই, বিচলিতও বোধ করেছেন। কারণ ওই তত্ত্ব পূর্ববঙ্গ কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে বিষয়ে বাঙালিদের সজাগ করে দেয়। সত্তরের নির্বাচনে ‘পূর্ববঙ্গ শ্মশান কেন’ এই প্রশ্ন তুলে বৈষম্যের যে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়েছিল তা ভোটারদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশে জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নটিই ছিল নির্ধারক।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বোধ জেগে উঠেছিল এবং পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে তার মীমাংসা সম্ভব ছিল না। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য সে কথাটাই জানিয়ে দিচ্ছিল। এটা বললে তাই অসংগত হবে না যে, জাতি প্রশ্নের মীমাংসার প্রয়োজনীয়তাতেই বাংলাদেশকে স্বাধীন হতে হয়েছে। ব্যাপারটা স্মরণ করা জরুরি এই জন্য যে, একে সাধারণত অবজ্ঞা করা হয়। একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া অবান্তর হবে না। দুই অর্থনীতির জোরালো প্রবক্তা ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

তার ওই সময়ের লেখার সংকলন করে একটি বই বের হয়েছে, যেটির তিনি নাম রেখেছেন ‘From Two Economies to Two Nations’। ব্যাপারটা কিন্তু ঠিক ওই রকমের নয়। প্রথমত দুই ইকোনমি দুই নেশনের জন্ম দেয়নি, বাঙালির একটি স্বতন্ত্র নেশন আগেও ছিল, ঐতিহাসিকভাবেই ছিল, যে জ্ঞান ঘা খেয়ে জেগে উঠেছে মাত্র।

দ্বিতীয়ত, একাত্তরে বাঙালিরা নিজেদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে পশ্চিম পাকিস্তানের পাঁচ-পাঁচটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা যে মিলেমিশে এক হয়ে গেছে তা তো নয়। জাতিপ্রশ্নের মীমাংসা করতে ব্যর্থ হলে পাকিস্তান আবারও ভাঙবে, যেমন একই কারণে ভাঙবে ভারতও। হিন্দি ভাষা ও হিন্দুত্ববাদ ভারতীয় ঐক্যের জন্য যথেষ্ট নয়।

জাতীয়তাবাদের দুর্বলতা আছে। হিটলার মুসোলিনি খুব বড় মাপের জাতীয়তাবাদী ছিলেন। আগ্রাসী হলে সে জাতীয়তাবাদ কতটা যে নৃশংস হতে পারে আমাদের দেশে একাত্তরের হানাদাররা তার নতুন জ্বলন্ত প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু তাই বলে জাতিগত পরিচয় যে নিছক কল্পনার ব্যাপার তা নয়। এই পরিচয় গড়ে ওঠে ভাষা, অর্থনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ, সামাজিকভাবে পাশাপাশি বাস করার অভিজ্ঞতা, সবকিছুর বাস্তবিক সংমিশ্রণে। আশ্রয় দেয়, একাত্তরে যেমন দিয়েছিল বাঙালিদের। জাতীয়তাবাদ আবার পারে আহত বন্যপ্রাণীর মতো হিংস্র হতে, ওই সময়ে যেমনটা হয়েছিল হানাদার পাকিস্তানিদের জাতীয়তাবাদ।

লেখক-সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  

 

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর