দীপন বিশ^াস :: ঈদ, স্বাধীনতা দিবস এরপর সাপ্তাহিক ছুটি, এই টানা ছুটিতে পর্যটকে মুখরিত কক্সবাজার সাগর তীর।
হোটেল-মোটেল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৩০মার্চ পর্যন্ত কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনে কোন হোটেল খালি নেই, সব রুম বুকিং হয়ে গেছে।
নোনাজলের ঢেউয়ে সমুদ্রস্নান, ঘোড়ার পিটে চড়া, জেটক্সি চালানো, কক্সবাজারের পর্যটন স্পট মহেশখালীর পাহাড়, আদিনাথ মন্দির ও বৌদ্ধ বিহার দর্শন, রামুর রামকুট, একশ হাত বৌদ্ধ মূর্তি, বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন, উখিয়ার ইনানী, পাটুয়ারটেকের পাথুরে বিচে গা-ভেজানো, হিমছড়ি ঝর্ণা, মেরিন ড্রাইভ সড়কে সাগর আর পাহাড়ের মেলবদ্ধন, দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনসহ বালিয়াড়ি ঘোরাঘুরি, সবখানে চলছে আনন্দ-উল্লাস।
টানা ছুটির সুযোগে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার দেখতে ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরজীবন ছেড়ে নোনাজলের স্পর্শে প্রশান্তি খুঁজতেই এখানে ছুটে এসেছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
তবে এই আনন্দ-উল্লাস করতে গিয়ে পর্যটকদের অসচেনতায় ঘটছে শিশু নিখোঁজ, ঘটছে সমুদ্রস্নানে মৃত্যু। একই সঙ্গে প্লাস্টিকের বোতল, চায়ের কাপ ও পলিথিনে নোংরা হচ্ছে সৈকতের বালিয়াড়ি।
ফেনী থেকে আসা পর্যটক জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমরা ফেনী থেকে প্রায় ৪৫ জনের একটি দল নিয়ে এসেছি।
আমাদের টিমের একটি অংশ লাবনী পয়েন্টে আছে, আর আমরা কয়েকজন সুগন্ধা পয়েন্টে আছি। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে এখন পর্যন্ত সমুদ্রে সময় কাটাচ্ছি-বারবার পানিতে নামছি, আবার উঠছি।
এতে কিছুটা ক্লান্ত লাগছে, তাই মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিচ্ছি। তার মধ্যেও সবাই মিলে দুষ্টুমি, আড্ডা আর আনন্দে সময়টা দারুণ কেটে যাচ্ছে।
আজকের পুরো দিনটাই আমরা সমুদ্র উপভোগ করেই কাটাচ্ছি। সব মিলিয়ে, আমরা সবাই খুবই উপভোগ করছি-সত্যিই খুব ভালো লাগছে।’
নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা রায়হান কাদেরী বলেন, ‘কক্সবাজারে ঘুরতে এসেছি। বালুচরে বসে বালি দিয়ে খেলছি-একটি সুন্দর পিরামিডও বানিয়েছি। বন্ধুবান্ধব মিলে দারুণ আনন্দে সময় কাটাচ্ছি।
ঈদের ছুটি উপভোগ করতেই এখানে আসা, আর সব মিলিয়ে সময়টা খুবই ভালো কাটছে।’
কুমিল্লা থেকে আসা সাইফুর রহিম বলেন, ‘বাংলাদেশের মধ্যে কক্সবাজারই আমাদের কাছে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর জায়গা। আমরা সৈকতই বেশি পছন্দ করি-সাগর আমাদের ভীষণ ভালো লাগে।
ঈদের ছুটিতে এখানে উপচে পড়া পর্যটকের ভিড় দেখে খুবই প্রাণবন্ত লাগে, পরিবেশটা যেন আরও মুখর হয়ে ওঠে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজার আমাদের কাছে সবসময়ই বিশেষ একটি জায়গা। এখানে এলে সত্যিই খুব ভালো লাগে-কক্সবাজার ছাড়া যেন অন্য কোথাও মনই বসে না।’
সৈকতের সৌন্দর্যের পাশাপাশি চোখে পড়ে ভিন্ন চিত্রও। বালিয়াড়িজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্লাস্টিকের বোতল, চায়ের কাপ, চিপসের প্যাকেট ও পলিথিন। পর্যটকদের অসচেতনতার পাশাপাশি হকারদের দিকেও অভিযোগ উঠছে। এসব বর্জ্যের একটি অংশ মিশে যাচ্ছে সাগরের পানিতেও।
পর্যটক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে প্রত্যেকে নিজের মতো করে চলাচল করছে। কেউ খাবারের প্যাকেট বা বোতল ফেলে দিচ্ছে, যার ফলে পর্যটন এলাকা নোংরা হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এটি রোধ করার জন্য আমাদের মানসিকতা বদলানো প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ‘এ সমস্যা সমাধানে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সমুদ্রসৈকত শুধু একজনের নয়-এটি সবার। তাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।’
পর্যটক রহিদুল কবির বলেন, ‘সমুদ্রসৈকত আমাদের জাতীয় সম্পদ। কিন্তু হকার ও অনেক পর্যটকের অসচেতন আচরণে যেখানে-সেখানে পলিথিন, বোতলসহ বিভিন্ন আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য হুমকি এবং সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করছে।’
তিনি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে কেউ সহজে ময়লা ফেলতে না পারে। এতে পরিবেশ রক্ষা পাবে এবং সবার জন্যই উপকার হবে।’
পর্যটক সৈয়দুল করিম বলেন, ‘কিছু হকারের আচরণ ভালো হলেও অনেকের ব্যবহার সন্তোষজনক নয়।
একইভাবে, কিছু ক্যামেরাম্যান পর্যটকদের সঙ্গে সুন্দরভাবে আচরণ করেন, আবার কেউ কেউ খারাপ আচরণ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সৈকতের নোংরা পরিবেশের মূল কারণ আমরা নিজেদের অসচেতনতা। আমরা যদি সচেতন না হই, পরিবেশ ঠিক থাকবে না।
এছাড়া, এখানে মাছ বিক্রি করার কারণে যে দুর্গন্ধ তৈরি হয়, সেটির জন্য প্রশাসনের আরও নজরদারি প্রয়োজন।’
এদিকে সতর্কতা উপেক্ষা করে অনেকেই নেমে পড়ছেন উত্তাল সাগরে। যেখানে লাল পতাকা দিয়ে সমুদ্রস্নান নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানেও ঝুঁকি নিয়ে নামছেন পর্যটকরা। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।
বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিতে হিমশিম খাচ্ছে লাইফগার্ড কর্মীরা।
সী সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান জানান, এই ঈদের মৌসুমে কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতে ২৭ জন লাইফগার্ড কাজ করছেন।
অল্পসংখ্যক সত্ত্বেও তারা লাইফগার্ড জাহাজ ও অন্যান্য সরঞ্জামের মাধ্যমে প্রচুর পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন পয়েন্টে লাল ও হলুদ পতাকা লাগানো হয়েছে এবং এসবের বাইরে সাগরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত বৃহস্পতিবার একজন পর্যটক মৃত্যুবরণ করেছেন।
এছাড়া ২২ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ১৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং ১০ জন হারানো শিশুকে পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
ওসমান উল্লেখ করেন, ৭ লক্ষ ৫০ হাজারের বেশি পর্যটককে লাইফগার্ডরা নিরাপদ রাখার পাশাপাশি ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে সচেতন করেছে।
দুর্ঘটনার মূল কারণ পর্যটকদের অসচেতনতা। তাই লাইফগার্ডরা মাইকিং ও হুইসেল ব্যবহার করে সতর্ক করেন, যাতে প্রত্যেকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব বুঝতে পারে।
অন্যদিকে, অভিভাবকদের অসতর্কতায় সৈকতে হারিয়ে যাচ্ছে শিশুরাও। গত ৭ দিনে প্রায় অর্ধশত হারানো শিশুকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে বিচকর্মী, লাইফগার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।
এলাকার অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন, সবকিছু মিলিয়ে কক্সবাজার একটি মনোমুখদ্ধকর স্থান। বলতে গেলে দেশের পর্যটন রাজধানী বলা চলে।
কক্সবাজারকে নিয়ে সরকারের করা মাস্টার প্ল্যান যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে দেশের বাজেটের একটি বিশাল অংশ এখান থেকেই যোগান দেওয়া সম্ভব।













