শুক্রবার ২৭ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিশুর বিছানা ভেজানো কোনও অভ্যাস নয়, চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা : দেরি করলে বাড়ে মানসিক চাপ

🗓 শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৫ বার দেখা হয়েছে

🗓 শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৫ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৭ মার্চ) :: রাতটা কেটে যায় নিঃশব্দে। কেউ জানে না, কেউ শোনে না— কিন্তু একটা ছোট্ট মন ভেঙে যায় ভোর হওয়ার আগেই। কারণ ভেজা বিছানা (Bedwetting)। আবারও। এতবার বকুনি খেয়েও, কথা শুনেও, নিজের অজান্তেই বিপর্যয়।

ঘুমের মধ্যে ছোটদের বিছানা ভেজানোর এই সমস্যাটা অনেক বাড়িতেই আছে, কিন্তু খুব কম বাড়িতেই তা নিয়ে খোলাখুলি কথা হয়। বেশিরভাগ সময় এটাকে “একটা সময়ের ব্যাপার” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কেউ ভাবে অভ্যাস, কেউ ভাবে আলস্য, কেউ আবার ধরে নেয় বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। কেউ আবার অত্যন্ত বকাবকি করে ঠিক করার চেষ্টা করেন বাচ্চাকে।

কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ভাবনাগুলোই আসল সমস্যাকে আড়াল করে দেয়। কারণ বিছানা ভেজানো কোনও আচরণগত সমস্যা নয়, এটি সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য একটি শারীরিক অবস্থা।
ছ’বছরের পরে ‘স্বাভাবিক’ নয়

চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই সমস্যার নাম নকটার্নাল এনুরেসিস (Nocturnal Enuresis)। সাধারণত ছ’বছর বয়সের মধ্যে বেশিরভাগ শিশুই রাতে প্রস্রাব নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। কিন্তু যদি তার পরেও সপ্তাহে দু’বার বা তার বেশি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে সেটিকে আর হালকা ভাবে নেওয়া যায় না।

এই সময় থেকে বিষয়টি চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। শুধু “ঠিক হয়ে যাবে” বলে অপেক্ষা করলে সময়ই নষ্ট হয়।

বিছানা ভেজানো নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা, এটা নাকি মানসিক সমস্যা। বাচ্চার দুষ্টুমি। অনেকে বলেন, ভয় পেয়েছে, অলস, খুব গভীর ঘুমায়—তাই এমন হচ্ছে।

চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানাচ্ছেন, এগুলো সবই মিথ। এই সমস্যার সঙ্গে মানসিক দুর্বলতার কোনও সরাসরি সম্পর্ক নেই।

বেডওয়েটিং দুই ধরনের হতে পারে। এক ক্ষেত্রে শিশুর জন্মের পর থেকেই রাতের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়নি, এটাকে প্রাইমারি বলা হয়। অন্য ক্ষেত্রে, কিছুদিন ঠিক থাকার পর আবার সমস্যা শুরু হয়— যাকে সেকেন্ডারি বলা হয়।

দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আরও গভীরভাবে কারণ খুঁজে দেখা দরকার।

শরীরের অদৃশ্য কারণ

এই সমস্যার পিছনে বেশ কিছু শারীরিক কারণ কাজ করে। অনেক সময় রাতে শরীরে বেশি প্রস্রাব তৈরি হয়। আবার কারও মূত্রথলি ঘুমের মধ্যে সেই প্রস্রাব ধরে রাখতে পারে না।

কিছু ক্ষেত্রে এটি বংশগত, পরিবারে কারও এমন সমস্যা থাকলে শিশুর মধ্যেও দেখা দিতে পারে।

শুধু রাতেই নয়, অনেক শিশুর দিনে বারবার প্রস্রাবের চাপ, হঠাৎ তাড়াহুড়ো, বা মাঝেমধ্যে লিকেজ হয়—যা প্রমাণ করে, এটি আচরণ নয়, শরীরেরই সমস্যা।

অনেক পরিবার এখনও বিশ্বাস করেন, বয়ঃসন্ধির পর এই সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর কোনও ভিত্তি নেই। বরং এই অপেক্ষা সমস্যাকে দীর্ঘায়িত করে। কখন থামবে, কেউ জানে না—এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বছরের পর বছর কেটে যায়।

আর ততদিনে শিশুর মনে তৈরি হয় অস্বস্তি, লজ্জা, ভয়—যা ধীরে ধীরে গভীর মানসিক চাপে বদলে যায়।

কিশোর বয়সে সবচেয়ে বেশি আঘাত

স্বাভাবিকভাবেই, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যার মানসিক প্রভাব আরও তীব্র হয়। দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৫ বছরের কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ভোগে।

ফলে বন্ধুদের সঙ্গে রাত কাটাতে না যাওয়া, ক্যাম্প বা ট্রিপ এড়িয়ে চলা, ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়—সব মিলিয়ে তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। অনেকে চুপচাপ ভেজা কাপড় লুকিয়ে ফেলে, কারও সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু এই গোপন লড়াই তাদের আত্মবিশ্বাসকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়।

সময়মতো চিকিৎসায় মিলতে পারে স্বস্তি

সবচেয়ে আশার কথা, এই সমস্যার চিকিৎসা সম্ভব এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল। সঠিক সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে মূল কারণ জানা যায়। ব্লাডার ডায়েরি, ইউরিন টেস্ট, প্রয়োজনে স্ক্যান— এসবের মাধ্যমে চিকিৎসকরা সমস্যার ধরন বোঝেন।

চিকিৎসা সাধারণত নিরাপদ ওষুধ এবং কিছু সহজ পদ্ধতির মাধ্যমে হয়, যা ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ফল দিতে শুরু করে। অভিজ্ঞতা বলছে, সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে।

এই সমস্যার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসক হলেন শিশু-কিডনি বিশেষজ্ঞ বা পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজিস্ট। বিশেষ বেডওয়েটিং ক্লিনিকে এই চিকিৎসা আরও সুসংগঠিতভাবে করা হয়। তবে এমন পরিষেবা এ দেশে সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক পরিবার ঘুরে বেড়ায় এক চিকিৎসক থেকে অন্য চিকিৎসকের কাছে। ফলে চিকিৎসা শুরুতেই দেরি হয়ে যায়।

দোষারোপ নয়

একটা শিশুর কাছে এই সমস্যা শুধু ভেজা বিছানা নয়, এটা তার লজ্জা, ভয়, আর না বলতে পারা কষ্টের গল্প। যাতে লুকিয়ে থাকে অপরাধবোধ, অভিমান, অসহায়তা। এই সমস্যা শুধু শারীরিক নয়— এটা তার আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, আর শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। তাই তাকে দোষ দেওয়া নয়, বোঝা জরুরি।

সহজ কথায়, ছ’বছরের পরেও যদি সমস্যা থাকে, তাহলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসার দরজা খোলা উচিত। কারণ প্রতিটি শিশুই একটা স্বস্তির রাত আর নির্ভার সকাল পেলে সবচেয়ে খুশি থাকে।

দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক। এটি কোনও চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য নানা মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে লেখা, যা আলাদা করে দ্য ওয়ালের তরফে যাচাই করা হয়নি।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর