রবিবার ২৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৯ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালির পর টার্গেটে সুয়েজ খালও

🗓 রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

👁️ ১৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম :: দ্বিতীয় মাসে গড়াল ইরান যুদ্ধ। প্রথমবারের মতো ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে।

এর ফলে এক মাস ধরে চলা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে।

গতকালের এ হামলার ফলে যুদ্ধ আরো বিস্তৃত হয়ে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক বাণিজ্যেও।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ সুয়েজ খাল ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খাল বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট, যার মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়।

হুথিদের হামলার কারণে এ রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি তেলের বাজারও আরো অস্থিতিশীল ও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

মার্কিন ও ইসরায়েলি ‘আগ্রাসন’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা।

গোষ্ঠীটি সতর্ক করে বলেছে, ইরান ও ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর বিরুদ্ধে হামলা বাড়লে তারা আরো সক্রিয় হবে।

তারা নতুন ফ্রন্ট খুললে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, যা সুয়েজ খালের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুথিরা ইয়েমেনের বাইরে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজা যুদ্ধের সময় হামাসকে সমর্থন দিয়ে তারা লোহিত সাগর ও আরব উপদ্বীপে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করেছিল।

এদিকে দক্ষিণ লেবাননের জেজিন শহরে সাংবাদিকদের বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন সংবাদকর্মী নিহত হয়েছেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হিজবুল্লাহ পরিচালিত আল-মানার টিভির রিপোর্টার আলী শোয়েব এবং আল-মায়াদিন টেলিভিশনের দুই সংবাদকর্মী ফাতিমা ও মোহাম্মদ ফেতানি।

এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। তিনি একে একটি ‘সুস্পষ্ট অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, যুদ্ধকালীন সাংবাদিকদের সুরক্ষার যে আন্তর্জাতিক আইন রয়েছে, এ হামলা তার চরম লঙ্ঘন।”

ইরানের রাজধানী তেহরানেও বড় ধরনের বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা চার সপ্তাহের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের মধ্যেই তেহরানে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানাচ্ছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে এক মাসে ইরানে অন্তত ২১৭ শিশুসহ এক হাজার ৪৬৪ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হরিয়েছে।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বলছে, তারা ইরানের বিভিন্ন স্থানে ১২ হাজারেরও বেশি বোমা বর্ষণ করেছে। এর মধ্যে কেবল তেহরানের ওপরই ফেলেছে ৩ হাজার ৬০০টি বোমা।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানাচ্ছে, তারা ইরানজুড়ে নয় হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে পুলিশ স্টেশন, বাসিজ মিলিশিয়া ভবন, পুলিশ সদর দপ্তর, সামরিক ও পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়, সেফ হাউজ, আইআরজিসি সদস্যদের বাসভবন, সম্ভাব্য গোলাবারুদ মজুদস্থল ও চেকপয়েন্ট। এসব লক্ষ্যবস্তুর অনেকগুলোই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত।

ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জানজান শহরে গতকালও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন। তেহরানের ‘ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে’ও হামলার খবর পাওয়া গেছে।

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইসরায়েলি-মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে বিভিন্ন প্রদেশের ৭১ হাজার ৫৪৭টি বসতবাড়ি ও ২০ হাজার ৭৭৯টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

কেবল রাজধানী তেহরানেই ৩১ হাজার ৫৬২টি আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অন্যদিকে সংঘাত এখন নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে রাতভর ইসরায়েলি হামলায় বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের রিয়াদমুখী একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ড্রোন হামলায় সীমিত ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এতে রাডার ব্যবস্থার ক্ষতি হয়েছে।

যুদ্ধের পঞ্চম সপ্তাহে ইরানের একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও।

উপসাগরীয় দেশগুলোয় হামলা চালাতে ব্যবহৃত ড্রোনগুলো উন্নত সংস্করণের এবং এগুলো রাশিয়া ইরানকে সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইরানের নিজস্ব শাহেদ ড্রোনের মজুদ থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া এ ড্রোনের নকশায় উন্নত নেভিগেশন সক্ষমতা যুক্ত করেছে। ইউরোপীয় এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা গণমাধ্যম এপিকে জানান, উন্নত রুশ ড্রোন ইরানে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য এগুলো প্রতিহত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ফোনালাপ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

শান্তি রক্ষায় পাকিস্তানের সহযোগিতামূলক ভূমিকার জন্য শাহবাজ শরিফকে ধন্যবাদ জানিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার মধ্যে বিশ্বাস প্রয়োজন। নয়তো এ যুদ্ধ থামবে না।

এ ফোনালাপের পর এক্সে করা এক পোস্টে শাহবাজ লিখেছেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান তার গঠনমূলক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।

আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে আজ তুরস্ক, মিসর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে একটি বৈঠকেরও আয়োজন করছে পাকিস্তান। তবে কূটনৈতিক অগ্রগতির কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় যুদ্ধ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।

যুদ্ধের প্রভাব এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এর প্রভাব স্পষ্ট। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালনে পৌঁছেছে রেকর্ড ৭ দশমিক ১৭ ডলারে।

নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে। জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

যুদ্ধের সময়সীমা প্রসঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সামরিক অভিযান শেষ করতে চায়। তবে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোর ভূমিকা চেয়েছেন রুবিও।

এর আগে ট্রাম্পও হরমুজ প্রণালি সুরক্ষিত করতে সামরিক বাহিনী পাঠাতে ন্যাটো মিত্রদের অস্বীকৃতির বিষয়ে তার হতাশা পুনর্ব্যক্ত করেন। মিয়ামিতে এক বিনিয়োগ ফোরামে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটো দেশগুলোকে রক্ষা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বছরে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে।

অথচ সংকটের সময়ে সেই মিত্ররাই যথাযথ সহযোগিতা করছে না। তিনি এ অবস্থাকে ‘বিরাট ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সবসময় মিত্রদের পাশে থেকেছে কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই প্রতিদান পাওয়া যাচ্ছে না।

ন্যাটো সনদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে সবাইকে সহায়তা করতে হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার আগে মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ না করায় তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনাগ্রহী।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে ‘সব বিকল্প খোলা’ রাখতে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। হাজার হাজার মেরিন সদস্য ও এলিট এয়ারবোর্ন সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।

ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতায় আরো একটি বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ মোতায়েন করা হচ্ছে।

আগের দুটি সক্রিয় রণতরির সঙ্গে যোগ দেবে এটি। প্রয়োজনে স্থলবাহিনী ব্যবহারের ইঙ্গিতও দিয়েছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, এ শক্তি প্রদর্শনের উদ্দেশ্য ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলেও এতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাপ্রধান ইয়াল জামির অবশ্য সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে এবং একাধিক ফ্রন্টে চলমান যুদ্ধের প্রচণ্ড চাপে তাদের বাহিনী ‘ভেতর থেকে ভেঙে পড়ার’ বা ‘পতনের’ ঝুঁকিতে রয়েছে।

সম্প্রতি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে জামির বলেন, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গভীর অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে সৈন্যদলের তীব্র সংকট।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর