কক্সবাংলা ডটকম(১ এপ্রিল) :: চারবারের বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন। এক সময় এই দলেই খেলেছেন পাওলো মালদিনি, ফ্রাঙ্কো বারেসি, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো, গিয়ানলুইগি বুফোঁরা।
ইউরোপের দলগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা ছিল আজ্জুরিরা। সেই ইতালিই এখন বিশ্বকাপে জায়গা পেতে হোঁচট খাচ্ছে। তা-ও একবার নয়, টানা তিনবার।
২০১৪ সালের বিশ্বকাপের পরে কেটে গিয়েছে ১২ বছর। ২০১৮, ২০২২-এর পরে ২০২৬-এও বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে ইতালি।
FIFA র্যাঙ্কিংয়ে ৭১তম স্থানে থাকা বসনিয়া-হার্জ়েগোভিনার কাছে হেরে মঙ্গলবার ছিটকে গিয়েছে তারা। কেন বারবার বিশ্বকাপে জায়গা পেতে ব্যর্থ হচ্ছে ইতালি? শুধু কি ভাগ্যের দোষ নাকি নেপথ্যে রয়েছে আরও গভীর সমস্যা?
Here’s how the dramatic shootout unfolded as Italy have missed out on the World Cup for the third straight time. Bosnia secured qualification after winning on penalties.pic.twitter.com/MNcETBn6hg
— BIG IMO🤴🏽🇨🇦 (@ImoPunter) April 1, 2026
কেন হার বসনিয়া-হার্জ়েগোভিনার কাছে?
মঙ্গলবার রাতে ইতালিকে কার্যত দাঁড়াতে দেয়নি বসনিয়া-হার্জ়েগোভিনা। একের পর এক প্ল্যানড অ্যাটাক শানিয়েছে তারা। বসনিয়ার দীর্ঘদেহী ও লম্বা ফুটবলারদের সামনে নাজেহাল হয়েছেন ইতালির ফুটবলাররা।
যে দলের মিডফিল্ডে একটা সময়ে দাপট দেখাতেন জেনারো গাত্তুসো, আন্দ্রে পিরলো, বারজাগলিরা— সেখানেই এখন অজস্র ফাঁক। পরিকাঠামো থেকে ট্যাকটিক্স, রয়েছে অনেক ঘাটতি। দেখে নেওয়া যাক এক ঝলকে।
পরিকাঠামোগত ও ইউথ ডেভেলপমেন্টে ব্যর্থতা
একটা সময়ে ইতালি থেকে উঠে আসতেন একাধিক প্রতিভাবান ও বিশ্বমানের ফুটবলার। এখন Serie A-র ক্লাবগুলো তরুণদের বদলে বয়স্ক অভিজ্ঞ ফুটবলার বা কম বাজেটের বিদেশিদের উপরে ভরসা করছে। ফলে ইতালির অনেক তরুণ ফুটবলার পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলার সুযোগ পাচ্ছে না।
পাশাপাশি, স্টেডিয়াম মালিকানার ক্ষেত্রেও ইতালি অনেকটাই পিছিয়ে— যেখানে প্রিমিয়ার লিগ (ইংল্যান্ড) বা বুন্দেশলিগা (জার্মানি) অনেক এগিয়ে। এর ফলে ক্লাবগুলির আয় কম। তাই আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ইউথ অ্যাকাডেমিতে বিনিয়োগও সীমিত।

ট্যাকটিক্যাল ও টেকনিক্যাল ঘাটতি
মালদিনি থেকে কানাভারো, বোনুচ্চি থেকে কিয়েলিনি— ইতালির ঐতিহ্য ছিল রক্ষণাত্মক ফুটবল। সেটা থেকে সরে এখন আধুনিক ও আক্রমণাত্মক ছন্দের ফুটবলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে ইতালি। এর ফলে নির্দিষ্ট কোনও ট্যাকটিক্স মেনে খেলতে পারছে না তারা।
বিশ্বের তুলনামূলক ছোট দলগুলো যখন ইতালির বিরুদ্ধে পুরো রক্ষণাত্মক খেলে, তখনও ইতালির আক্রমণ নিষ্প্রভ থেকেছে। বিশ্বকাপের গোটা বাছাই পর্ব জুড়েই বজায় থেকেছে এই ধারা।
কোচিং ও অভ্যন্তরীণ সমস্যা
ইতালিয়ান ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব আরও প্রকট হয়েছে বিশ্বকাপে জায়গা পেতে ব্যর্থ হওয়ায়। বর্তমান কোচদের বিরুদ্ধে অভিযোগ— তাঁরা বয়স্ক ফুটবলারদের উপরে অতিরিক্ত নির্ভর করেছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় কেভিন ডি ব্রুইনা বা লুকা মদ্রিচের নাম।
কিন্তু আধুনিক ফুটবলে স্কিলের চেয়েও বেশি প্রয়োজন গতি ও ফিটনেস। সেই ঘাটতি স্পষ্ট ইতালির খেলায়। বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে একাধিক কোচিং দর্শনও বড় ভূমিকা নিয়েছে এতে, এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

প্লেয়ারদের খেলার মানে পতন
ইতালির এই প্রজন্মের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার সান্দ্রো তোনালি খেলেন EPL-এর ক্লাব নিউক্যাসলে, যারা কোনওদিন চ্যাম্পিয়ন্স লিগই জেতেনি। একটা সময়ে পাওলো মালদিনির উত্তরসূরী হিসেবে ধরা হয়েছিল আলেসান্দ্রো বাস্তোনিকে। তাঁকেই কার্যত নাজেহাল করে ছেড়েছেন বসনিয়ার ফুটবলাররা। বাস্তোনির লাল কার্ড দেখার কারণেই ম্যাচে অধিকাংশ সময় ১০ জনে খেলতে হয়েছে ইতালিকে। জাতীয় দলে স্ট্রাইকারের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।
আর্থিক ও গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের প্রথম সারির লিগগুলির তুলনায় আর্থিক দিক থেকে ইতালি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রিমিয়ার লিগের তুলনায় Serie A-র টিভি রাইটস ও কমার্শিয়াল গ্রোথ অনেক কম। ফলে ক্লাবগুলো তাদের সেরা তরুণ ফুটবলারদের ধরে রাখতে পারছে না। বিদেশের ক্লাবে যাচ্ছেন ফুটবলাররা। এর পাশাপাশি বিদেশি খেলোয়াড়দের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইতালিয়ান ফুটবলের নিজস্ব ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সব মিলিয়ে ইতালিয়ান ফুটবল আজ ভুগছে অস্তিত্বের সঙ্কটে। এক সময়ে যে ইতালি নিজস্ব ফুটবল ঘরানার জন্য বিশ্ব ফুটবলে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল, সেটাই এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।













