জাবেদ আবেদীন শাহীন :: দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে সকাল থেকে যেন অন্যরকম এক উত্তেজনা রূপ নিলো এক প্রাণবন্ত ক্রীড়া উৎসবে। সার্ফিং শুধু একটি খেলা নয়, এটি অর্থনীতির একটি অংশ এবং পর্যটন শিল্পের বড় বিজ্ঞাপন। লাবনী পয়েন্টের নীল জলরাশিতে সার্ফবোর্ড হাতে সারিবদ্ধ শতশত কিশোর কিশোরী,তরুণ তরুণীদের সমন্বয়ে শুরু হলো অষ্টম জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতা।
সমুদ্রকুলে ঢেউয়ের পর ঢেউ যেমন তীরে এসে আছড়ে পড়ে,তেমনি এই প্রতিযোগিতাও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন জোয়ার আনবে একটি সম্ভাবনাময়,উদ্যমী ও বিশ্বমুখী ভবিষ্যতের বার্তা নিয়ে দুপুরে জমকালো এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শুক্রবার ৩ এপ্রিল প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান এর সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী পর্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান কাজল, বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ কে এম মুজাহিদ উদ্দিন, সিনিয়র সহ সভাপতি খন্দকার সাইফুল ইসলাম, স্পন্সর প্রতিষ্ঠান কিউটের কর্ণধার কাজী রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল এবং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার শুধু ক্রিকেট বা ফুটবলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা সার্ফিংসহ সব ধরনের খেলাধুলার উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে সার্ফিংকে সমান গুরুত্ব দিতে চাই। এই টুর্নামেন্টকে যেন সারা বছর সচল রাখা যায়, সেজন্য আমি আয়োজকদের যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানাই।
তিনি আরও বলেন, এই টুর্নামেন্ট শুধু মৌসুমি না হয়ে সারা বছরব্যাপী আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে। তাতে করে খেলোয়াড়রা নিয়মিত চর্চার সুযোগ পাবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারবে।
প্রতিমন্ত্রী সার্ফারদের জন্য সুখবর দিয়ে আরও বলেন, ইতোমধ্যে আমরা অনেক খেলোয়াড়কে সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় এনেছি এবং আর্থিকভাবে দুর্বল ফেডারেশনগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি। আমাদের সার্ফাররা যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তাদেরও বেতন কাঠামোর আওতায় আনার সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এক তরুণ সার্ফার মাহিম বলেন, আমার জন্ম সৈকতে খুব কাছে এলাকা বাহারছড়াতে। আমরা ছোটবেলা থেকেই ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম পেলে আমরা আরও ভালো করতে পারব এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

নারী সার্ফার সাদিয়া আক্তার বলেন, মেয়েদের জন্য এই খেলায় সুযোগ এখনো সীমিত। তবে সরকার ও ফেডারেশন যদি সহযোগিতা বাড়ায়, তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারব।
আরেকজন অভিজ্ঞ সার্ফার রাশেদ জানান, সার্ফিং শুধু খেলা নয়, এটি পর্যটনের সঙ্গেও জড়িত। এই প্রতিযোগিতা যত বাড়বে,কক্সবাজারে পর্যটকও তত বাড়বে।
বাংলাদেশে সার্ফিংয়ের ইতিহাসের পাতা উল্টালে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি হলেন স্থানীয় তরুণ জাফর আলম। ১৯৯৫ সালে এক অস্ট্রেলিয়ান পর্যটকের কাছ থেকে একটি সার্ফবোর্ড কিনে তিনি প্রথম কক্সবাজারের নীল জলরাশিতে ঢেউয়ের সাথে মিতালি শুরু করেন। এর দীর্ঘ সময়ে পর ২০০৫ সালে বাংলাদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো সার্ফিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়, যা তরুণ সার্ফারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে এই সাফিং ছড়িয়ে পড়তে থাকে সৈকতের বালিয়াড়ি জুড়ে। সে সময় বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশন আন্তর্জাতিক সার্ফিং সংস্থার সদস্যপদও লাভ করে,যা বাংলাদেশের সার্ফিংকে বিশ্বমঞ্চে পরিচয় করিয়ে দেয়।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত সার্ফিংয়ের জন্য বিশ্বের অন্যতম আদর্শ স্থান হিসেবে বিবেচিত। সার্ফারদের মতে,শীতকালে সময়ে সমুদ্র তুলনামূলক শান্ত থাকে এবং ঢেউগুলো ছোট হয়। এটি নতুনদের সার্ফিং শেখার জন্য উপযুক্ত সময়। এ সময় ১০ ফুট বা তারও বেশি উঁচু ঢেউ তৈরি হয়, যা অভিজ্ঞ ও পেশাদার সার্ফারদের জন্য পরম আদর্শ। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বিশ্ব সার্ফিং অঙ্গনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে বলে মানে করে সার্ফাররা।
এবারের প্রতিযোগিতায় তিনটি ক্যাটাগরিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শতাধিক সার্ফার অংশ নিচ্ছেন। সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর সার্ফারদের এই সাহসিকতাপূর্ণ লড়াই দেখতে সৈকতে ভিড় জমিয়েছেন শত শত পর্যটক ও ক্রীড়ামোদী দর্শক।আয়োজকরা আশা করছেন, এই প্রতিযোগিতা দেশের সার্ফিং খেলাকে আরও জনপ্রিয় করে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। অনুষ্ঠান শেষে বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী, যা দেশের সার্ফিং অবকাঠামো উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।















