কক্সবাংলা ডটকম :: নকআউট পর্বের আগে বড় ধাক্কা খেল জার্মানি (Germany)। বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) গ্রুপ ‘E’-এর শেষ ম্যাচে ইকুয়েডরের (Ecuador) বিরুদ্ধে শুরুতে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে হার মানতে হল চার বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।
অন্যদিকে এই দুরন্ত জয়ের সুবাদে সেরা তৃতীয় দল হিসেবে শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করল ইকুয়েডর। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠল তারা। ম্যাচের নায়ক গনজ়ালো প্লাতা (Gonzalo Plata), যার ৭৭ মিনিটের গোলেই নিশ্চিত হয় ঐতিহাসিক জয়।
সানের রেকর্ড গড়া গোলেও লাভ হল না
ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফিনান্সিয়াল ফিল্ডে ম্যাচের শুরুটা জার্মানির জন্য হয়েছিল একেবারে স্বপ্নের মতো। খেলা শুরুর মাত্র ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের মাথায় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন লেরয় সানে (Leroy Sane)। ফ্লোরিয়ান ভির্টজ়ের (Florian Wirtz) পাস থেকে দুর্দান্ত ফিনিশে বল জালে জড়ান তিনি।
এই গোল শুধু জার্মানিকে এগিয়ে দেয়নি, সানের জন্যও ছিল বিশেষ। বিশ্বকাপ বা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের মতো বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এটি ছিল তাঁর প্রথম গোল। পাশাপাশি তিনি বিশ্বকাপে জার্মানির হয়ে দ্বিতীয় দ্রুততম গোলদাতার রেকর্ডও গড়েন।
তবে গোল খাওয়ার পর একটুও দমে যায়নি ইকুয়েডর। সমর্থকদের প্রবল উৎসাহে তারা দ্রুত ম্যাচে ফিরে আসে। ৯ মিনিটে নিলসন অ্যাঙ্গুলো (Nilson Angulo) দূরপাল্লার দুর্দান্ত শটে ম্যানুয়েল ন্যুয়েরকে (Manuel Neuer) পরাস্ত করে সমতা ফেরান। মূলত জার্মান ডিফেন্সের ভুলেরও সুযোগ নেয় ইকুয়েডর। এর পর দুই দলই কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও প্রথমার্ধে আর গোল হয়নি। ১-১ ফল নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় ম্যাচের ছবি
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে জার্মানি একটি পেনাল্টি পেয়েছিল। কিন্তু ভিডিয়ো প্রযুক্তির সাহায্যে দেখা যায় আক্রমণ তৈরির আগে ফাউল হয়েছিল। ফলে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়। এতে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ইকুয়েডর। মাঝমাঠে জন ইয়েবোয়া (John Yeboah) বারবার জার্মান ফুটবলারদের চাপে ফেলছিলেন।
অন্যদিকে জার্মানির আক্রমণে ধার খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না। সময় যত এগোচ্ছিল, ততই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছিল ইকুয়েডর। ম্যাচের ৭৭ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে বল পৌঁছে যায় গনজ়ালো প্লাতার কাছে। প্রথম সুযোগ হাতছাড়া করলেও কয়েক মুহূর্ত পর আর ভুল করেননি তিনি। অসাধারণ দক্ষতায় বল জালে জড়িয়ে জার্মান সমর্থকদের স্তব্ধ করে দেন। তাঁর গোলেই ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ইকুয়েডর।
ইকুয়েডরের উল্লাস, চিন্তায় জার্মানি
গোল করার পর ইকুয়েডর আর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করেনি। জার্মানি সমতায় ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক আক্রমণ শানালেও ইকুয়েডরের রক্ষণভাগ দুর্দান্ত দৃঢ়তা দেখায়। ম্যানুয়েল ন্যুয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে ব্যবধান বাড়তে দেননি, কিন্তু জার্মান আক্রমণভাগও শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা পায়নি।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়াম জুড়ে শুরু হয় ইকুয়েডর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। হলুদ জার্সি পরা হাজার হাজার সমর্থক আনন্দে মেতে ওঠেন। সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত দেখা যায় ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসের (Sebastian Beccacece) মধ্যে। ম্যাচ শেষ হতেই তিনি গ্যালারিতে উঠে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেন।
বিশ্বকাপের আগে টানা ১৯ ম্যাচ অপরাজিত থাকার পরও টুর্নামেন্টে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন বেকাসেসে। কিন্তু জার্মানির মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে তিনি এবং তাঁর দলের ফুটবলাররা সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন। জার্মানি হেরে গেলেও গ্রুপের শীর্ষে থেকেই শেষ ৩২-এ উঠেছে। তবে নকআউটের আগে এই হার তাদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা। অন্যদিকে ইকুয়েডর এই জয়কে পুঁজি করেই নতুন স্বপ্ন নিয়ে নকআউট পর্বে পা রাখল।
প্রথম বার বিশ্বকাপের নকআউটে আইভরি কোস্ট, হেরেও মন জিতল কুরাসাও
বহু বছরের অপেক্ষা, একের পর এক ব্যর্থতা আর ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন— সব কিছুর অবসান ঘটল অবশেষে। আইভরি কোস্ট (Ivory Coast) বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) মঞ্চে নিজেদের ইতিহাস নতুন করে লিখল। কুরাসাওয়ের (Curacao) বিরুদ্ধে ২-০ গোলের জয়ে প্রথম বারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করেছে আফ্রিকার দেশটি। আর সেই ঐতিহাসিক রাতে নায়কের ভূমিকায় ছিলেন নিকোলাস পেপে (Nicolas Pepe), যাঁর জোড়া গোলেই উল্লাসে ফেটে পড়ে আইভরিয়ান শিবির।
২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪— টানা তিনটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে পারেনি আইভরি কোস্ট। তবে এ বার সেই আক্ষেপ ঘুচেছে। গ্রুপ ‘E’-তে জার্মানির পিছনে দ্বিতীয় স্থানে থেকে শেষ ৩২-এ উঠেছে তারা। পরের রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ হবে গ্রুপ ‘I’ গ্রুপের রানার্সআপ দল।
শুরুতেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেয় আইভরি কোস্ট
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছিল। তবে কুরাসাওয়ের একটি ভুলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সাত মিনিটের মাথায় প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের ভুলের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বল দখল করেন তরুণ ইয়ান দিয়োমান্দে। দুরন্ত গতিতে বাইলাইনের দিকে ছুটে গিয়ে তিনি নিখুঁত ভাবে বল বাড়িয়ে দেন নিকোলাস পেপের কাছে। আর সেই সুযোগ লুফে নিতে একটুও ভুল করেননি পেপে। কাছ থেকে জোরালো শটে বল জালে জড়িয়ে আইভরি কোস্টকে এগিয়ে দেন তিনি। শুরুতেই পাওয়া এই গোল যেন আইভরিয়ানদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়, আর চাপে পড়ে যায় কুরাসাও।
তবে গোল হজম করেও ভেঙে পড়েনি কুরাসাও। বরং কয়েক বার সমতায় ফেরার সুযোগও তৈরি করেছিল তারা। প্রথমার্ধে লিয়ান্দ্রো বাকুনার শট অল্পের জন্য বাইরে চলে যায়। বিরতির পর শেরেল ফ্লোরানুসও গোলের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু ভাগ্য তাদের সঙ্গ দেয়নি।
পেপের জোড়া গোলে নিশ্চিত হয় ইতিহাস
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আইভরি কোস্ট কিছুটা ধাক্কা খায়। দলের প্রথম ম্যাচে গোল করা আমাদ দিয়ালো আর মাঠে নামতে পারেননি। তবু খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখে এমার্স ফায়ের দল। ৬৪তম মিনিটে আসে ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। মাঝমাঠ থেকে ইব্রাহিম সাঙ্গারের নিখুঁত পাস পেয়ে কুরাসাওয়ের ডিফেন্স ভেঙে সামনে এগিয়ে যান পেপে। এর পর ঠান্ডা মাথায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। সেই গোলেই নিশ্চিত হয়ে যায় আইভরি কোস্টের জয় এবং নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন।
বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে একটিও গোল করতে পারেননি পেপে। এমন কী সাম্প্রতিক আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের দলেও জায়গা হয়নি তার। তাই এই বিশ্বকাপে এসে তিনিই যে দলের সবচেয়ে বড় নায়ক হয়ে উঠবেন, তা খুব কম মানুষই ভেবেছিলেন। কুরাসাওয়ের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে তিনি সেই জবাবই দিলেন।
হারলেও সম্মান নিয়ে ফিরছে কুরাসাও
স্কোরলাইন তাদের বিপক্ষে গেলেও কুরাসাও এই বিশ্বকাপ থেকে অনেক ইতিবাচক স্মৃতি নিয়ে ফিরছে। টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ছোট দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে খেলে তারা সবার নজর কেড়েছে। জার্মানির বিরুদ্ধে বড় হারের পর ঘুরে দাঁড়িয়ে ইকুয়েডরের সঙ্গে ড্র করেছে, আর শেষ ম্যাচ পর্যন্ত নকআউটে ওঠার লড়াইয়ে থেকেছে।
অন্যদিকে আইভরি কোস্টের জন্য এই জয় শুধু তিন পয়েন্ট নয়, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসানও। বহুবার ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে তারা। আর নিকোলাস পেপে যদি এই ছন্দ ধরে রাখতে পারেন, তা হলে তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা আরও অনেক দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে।














