বিশেষ প্রতিবেদক :: পর্যটন নির্ভর জেলা কক্সবাজারে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণ ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতারা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অপরাধ দমনে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালালেও জনবল সংকট, প্রভাবশালী অপরাধীদের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এবং দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এরই মধ্যে কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নে গত ৮ জুন সংঘবদ্ধ সশস্ত্র ডাকাতির একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। গভীর রাতে ডাকাত দলের সদস্যরা ঘরের জানালার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করে আলমারি ভেঙে স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুট করে। লুটপাট শেষে যাওয়ার আগে তারা গৃহবধূ ও তাঁর দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত মেয়েকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। ঘটনাটি জেলায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন জানান, এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের জারুলবনিয়া এলাকায় গত শুক্রবার গভীর রাতেও সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুট করে নিয়ে যায়।
বাড়ির মালিক মোহাম্মদ সাকিব, যিনি শিলখালী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সদস্য সচিব, জানান, ডাকাতরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে পেকুয়া থানা থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী পেকুয়া সফর শেষ করার পর বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায় অন্তত ১২টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর অধিকাংশই সংঘটিত হয়েছে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায়। একই সময়ে এসব এলাকায় অন্তত আটটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে।
অন্যদিকে পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত পাঁচ মাসে চকরিয়া উপজেলায় দুটি ডাকাতির ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে এবং পেকুয়ায় কোনো ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি ও পুলিশের পরিসংখ্যানের মধ্যে এই বৈপরীত্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ডিসেম্বর মাসে জেলায় একটি ডাকাতি, চারটি ছিনতাই এবং ছয়টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুটি ডাকাতি, চারটি ছিনতাই ও ১৫টি হত্যাকাণ্ড, ফেব্রুয়ারিতে দুটি ডাকাতি, দুটি ছিনতাই ও ১০টি হত্যাকাণ্ড, মার্চে দুটি ডাকাতি, তিনটি ছিনতাই ও ১২টি হত্যাকাণ্ড এবং এপ্রিলে একটি ছিনতাই ও ১০টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য লিপিবদ্ধ হয়েছে। যদিও এপ্রিলের কার্যবিবরণীতে কোনো ডাকাতির ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি।
সম্প্রতি কক্সবাজার শহরের হাসপাতাল সড়কে আয়োজিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কক্সবাজারে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজার জেলায় খুন, অপহরণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপরাধের লাগাম টেনে ধরা না গেলে জেলার পর্যটন শিল্প, বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামগ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রম নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মাতামুহুরীর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন উর রশিদ বলেন, বিগত সরকারের আমলে গড়ে ওঠা কয়েকজন প্রভাবশালী সন্ত্রাসী এখনও এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন অপরাধী চক্র গড়ে উঠছে এবং তারা এলাকায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার বিষয়টি তুলে ধরা হলেও বড় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, পুলিশ কিছু ছোটখাটো অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনও অধরা। ফলে চুরি, ডাকাতি, খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিন দিন বাড়ছে। বড় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
চকরিয়া থানার ওসি মো. মনির হোসেন বলেন, পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করছে। তবে অনেক আসামি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদর, টেকনাফ, রামু, উখিয়া, কুতুবদিয়াসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় গত পাঁচ মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। এসব ঘটনার পেছনে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, প্রেমঘটিত বিরোধ, অপহরণের পর হত্যা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের মতো কারণগুলো বেশি দেখা গেছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত পরিচয়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে জেলা সদরের পিএমখালীর পরানিয়াপাড়ায় যুবক মুবিনকে কুপিয়ে হত্যা, খুরুশকুলের পাহাড়ি এলাকায় মন্দিরের পুরোহিত নয়ন সাধুর মরদেহ উদ্ধার এবং কলাতলীতে টমটমচালক শওকত আলম হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হলেও একাধিক মামলার মূল আসামিরা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধপ্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চকরিয়া উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই ডাকাতির খবর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যটননির্ভর একটি জেলার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় জনজীবনকেই অস্থির করে তুলছে না, বরং দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মো. অহিদুর রহমান বলেন, প্রতিদিন গড়ে শতাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তবে জেলার ভৌগোলিক বিস্তৃতি, সীমান্তবর্তী এলাকা, পর্যটনকেন্দ্রিক চাপ এবং প্রয়োজনের তুলনায় পুলিশের জনবল কম থাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, অপরাধীদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা বৃদ্ধি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কক্সবাজারের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।














