মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চকরিয়া-পেকুয়া ও মাতামুহুরীতে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হচ্ছে, বাড়ছে দূর্ভোগ : ত্রাণ বিতরণে ডিসি

🗓 শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

👁️ ৫৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

👁️ ৫৭ বার দেখা হয়েছে

এম. জিয়াবুল হক, চকরিয়া :: টানা ছয়দিনের অবিরাম ভারী বৃষ্টিপাত ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে।

শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকে বৃষ্টিপাত কমে যাবার কারণে মাতামুহুরী নদীতে ঢলের পানি কিছুটা কমে আসলেও লোকালয়ে জনগণের মাঝে দুর্ভোগ বেড়ে চলছে।

বিশেষ করে দুর্গত এলাকার বেশিরভাগ পরিবারে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া পানিতে তলিয়ে গিয়ে সড়কগুলো ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার ভগ্নদশার কারণে লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

অনেক বাড়িতে এখনো রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অসংখ্য পরিবার শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তবে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত থাকায় ত্রাণ পৌঁছানো এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে, ভারী বৃষ্টিপাত বন্ধ এবং মাতামুহুরী নদীতে পাহাড়ি ঢলের প্রভাব কমে গেলেও চকরিয়া পেকুয়া ও মাতামুহুরীসহ তিন উপজেলার ২৫টি ইউনিয়ন এবং দুটি পৌরসভা এলাকায় এখনো কমপক্ষে দুই লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। উপজেলার অভ্যন্তরীন সড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ শাখার তথ্যনুযায়ী জানা গেছে, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার জন্য ১২০ মেট্রিক ট্রন চাল ও নগদ ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা জরুরি অনুদান দেওয়া হয়েছে।

তারমধ্যে চকরিয়া উপজেলার জন্য ৫০ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ,পেকুয়া উপজেলার জন্য ৪০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ টাকা এবং মাতামুহুরী উপজেলার জন্য ৩০ মেট্রিক টন চাল ও ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতি সরেজমিন দেখতে শনিবার সকালে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ আঃ মান্নান চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এসময় চকরিয়ার ইউএনও শাহীন দেলোয়ার, পেকুয়ার ইউএনও রফিকুল ইসলাম, প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁর সাথে উপস্থিত ছিলেন।
এসময় জেলা প্রশাসক কিছু এলাকা হেঁটে ও নৌকায় চড়ে পানিবন্দী বানবাসী মানুষের খবরাখবর নেন। এসময় তিনি বানবাসী মানুষদের বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ও ওষুধ সামগ্রী বিতরণ করেন।

তবে, বানবাসী এলাকার জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, বন্যায় পানিবন্দী এলাকার মানুষের কাছে এখনও কোন সহযোগিতা পৌছেনি।

এ অবস্থায় সুষ্ঠু এবং সঠিক খবরাখবর নিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করার অনুরোধ জানান বানবাসী মানুষ। প্রশাসন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি দুইদিন ধরে দুর্গত মানুষের মাঝে বিভিন্ন সামাজিক ও সেচ্ছাসেবী সংগঠেনর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে।

স্থানীয় সুত্রে অভিযোগ উঠেছে, চকরিয়া উপকুলে (নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার অধীন এলাকায়) পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন একাধিক স্লুইসগেট রক্ষণাবেক্ষণের নামে একবছর মেয়াদে দায়িত্ব (ইজারা) নিয়ে কতিপয় মহল মৎস্য চাষ করে।

মুলতঃ মৎস্য চাষের কারণে স্লুইসগেট গুলোর জলকপাট বন্ধ থাকায় ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানি নীচের দিকে সহজে নামতে না পারায় চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ে। এতে চরম দূর্ভোগে পড়ে বানবাসী মানুষ।

স্লুইসগেট রক্ষণাবেক্ষণের নামে মৎস্য চাষের সঙ্গে সেখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকায় অনেকটা চাপের মুখে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিক স্লুইসগেট গুলোর জলকপাট খুলে দিতে পারে না।

এমন প্রেক্ষাপটে মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি উপজেলার লোকালয়ে প্রবেশ করে। আবার পানির তোড়ে ভেঙে যায় বেড়িবাঁধ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তিনদিন ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা বন্যার পানি ও মাতামুহুরী নদী থেকে উপচে আসা ঢলের পানি প্রবাহিত হওয়ায় নীচু এলাকার বসতঘরগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নি:স্ব হয়ে গেছে অনেক পরিবার।

চকরিয়া -পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে বেশ কয়েকটি বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে গিয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করেছে বন্যার পানি।

চকরিয়া উপজেলার কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, চিরিঙ্গা, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং পেকুয়া পৌরসভা ও উপজেলার মেহেরনামা, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, টৈটং, শিলখালী ও বারবাকিয়া ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে।

অন্যদিকে, চকরিয়া থেকে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার সাহারবিল, বদরখালী, কোণাখালী, ঢেমুশিয়া, পূর্ব বড় ভেওলা, পশ্চিম বড় ভেওলা এবং বিএমচর ইউনিয়নে এখনও পানিবন্দী হয়ে আছে লক্ষাধিক বানবাসী মানুষ।

স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, বন্যার পানি নামার সাথে সাথে বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি দেখা দিচ্ছে। এজন্য চকরিয়া উপজেলা সরকারি হাসপাতাল থেকে মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তারা বন্যা কবলিত এলাকায় গিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডাঃ জায়নুল আবেদিন বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার অধিকাংশ এলাকা বন্যা কবলিত।

ইতোমধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যার পানি নামার পরপর বন্যা কবলিত মানুষ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে।

এজন্য দুই উপজেলার জন্য ৫৪টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তন্মধ্যে চকরিয়ায় ৩৩টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এই মেডিকেল টিমে একজন উপ-সহকারি ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী, ইউএইসচিপি কাজ করছে।

মাতামুহুরী উপজেলায় ২১টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। এসব টিমও একজন উপ-সহকারি, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী ও ইউএইসসিপিরা কাজ করছে।

ডাঃ জায়নুল আবেদিন বলেন, বন্যায় কবলিত কোন ব্যক্তি যদি গুরুতর জখম বা সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় সেজন্য চকরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে র‌্যাপিড রেসপন্স টিম ঘটনা করা হয়েছে। তাই সাপে কাটা বা গুরুতর জখমিদের দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে আসার আহবান জানান তিনি।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউ্এনও) রফিকুল ইসলাম জানান, বন্যা পরবর্তী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন সরজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। পানিবন্দী মানুষদের শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্চে। এছাড়া জেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত ত্রাণ বানবাসী মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার বলেন, শনিবার সকাল থেকে বৃষ্টি একটু কমে এসেছে। সেই সাথে মাতামুহুরী নদী থেকেও পানি নামতে শুরু করেছে। দুই উপজেলায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

তিনি বলেন, শনিবার সকালে জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো.আব্দুল মান্নান চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বন্যা কবলিতদের সাথে কথা বলেন এবং খোঁজখবর নেন। এছাড়াও শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হয়েছে।

ইউএনও শাহীন দেলোয়ার বলেন, দুই উপজেলার জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ বন্যা কবলিতদের দেয়া হচ্ছে। বন্যা কবলিত বানবাসীদের শুকনো খাবার ও রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশুদ্ধ পানি এবং ওষুধ দেয়া হচ্ছে।

আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরতদের শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বন্যা কবলিত বানবাসী মানুষদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। বন্যার ব্যাপারে জেলা প্রশাসক সরেজমিনে এসে দেখেছেন , তিনি অবহিত হয়েছেন, আমরা চকরিয়া মাতামুহুরী উপজেলার জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ বরাদ্দ চেয়েছি।

এই বিভাগ এর আরো খবর

নিরাপদ সীমার নিচে সারের মজুত

রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর