কক্সবাংলা ডটকম :: বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল বলে কথা, সাহস করে ভবিষ্যদ্বাণী করার সাহস কিংবদন্তি প্রাক্তনেরা সাধারণত দেখান না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুটো টিমের মধ্যে কোনও একটাকে ফেভারিট তকমা দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে চান দায়িত্ব। কিংবা আরও সহজ পন্থা হলো ফুটবলের ভাষায়, ‘স্কোয়্যার পাস।’ অর্থাৎ, কোনও কমিটমেন্টে না গিয়ে পাশের জনকে বল ঠেলে দেওয়া। ডালাসে হাই-ভোল্টেজ সেমিফাইনালের আগেও একই ছবি প্রায় সর্বত্র।
২০১০ সালের স্পেনের বিশ্বজয়ী টিমের সদস্য ও বার্সেলোনার প্রাক্তন ম্যানেজার খাবি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। স্বয়ং খাবি সেমিফাইনাল নিয়ে ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এ লিখছেন, ‘আগামী ১৫ বছর বিশ্ব ফুটবল শাসন করবে লামিনে ইয়ামাল। ও সবার চেয়ে আলাদা, মেসির মতোই। আমি নিশ্চিত, ও নিশ্চয়ই এখন নিজেকে বলছে, এটাই সেই ম্যাচ, সেই মুহূর্ত, যখন বিশ্বের সামনে নিজেকে মেলে ধরার শ্রেষ্ঠ সুযোগ তোমার সামনে। ও স্পেনকে জিতিয়ে দিতেই পারে।’
এতেই শেষ নয়। বার্সায় খুব কাছ থেকে ইয়ামালকে দেখা খাবি যোগ করছেন, ‘যে কোনও ম্যাচের আগে প্লেয়ারের কাঁধের কাছে হাত রেখে আমি বুঝতে পারি, হৃদস্পন্দন। হার্টবিটটা অনুভব করা যায়। সেখানে লামিনের কাঁধে হাত রেখে কিছু বোঝা কঠিন। টেনশন ওর হয় না, ঠাণ্ডা মাথায় চাপ নিতে জানে।’

স্বয়ং ইয়ামাল কী বলছেন? স্পেনের সাংবাদিকদের সামনে তাঁর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, ‘ফ্রান্সকে সাম্প্রতিককালে আমরাই হারিয়েছি। এ বারও তৈরি।’
দু’বছর আগে ইউরো কাপে ফ্রান্সের বিপক্ষেই ইয়ামালের চমকপ্রদ গোল তাঁকে এনে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের সার্চলাইটে। কিন্তু বিশ্বকাপ হলো বিশ্বকাপ। ডালাসে ফ্রান্স ম্যাচ যদি উতরে দিতে পারেন, মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বিশ্ব ফুটবলে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চ তৈরি করে ফেলবেন স্পেনের তারকা। কাজটা সহজ নয় ঠিকই, কিন্তু খাবির মতো ইব্রাবিমোভিচও মনে করছেন, এই সেমিফাইনালে কে ফেভারিট, কার বল পজ়েশন বেশি, এ সবের চেয়ে অনেক বেশি ভাইটাল হতে যাচ্ছে মোমেন্টস বা ‘মুহূর্ত।
’ ইব্রাহিমোভিচের কথায়, ‘মূহূর্তের ব্রিলিয়ান্স ঠিক করে দেবে বিজয়ী, এটাই প্রত্যাশিত। সে জন্যই এমবাপে, ইয়ামাল, দেম্বেলেদের দিকে চোখ থাকবে।’ অর্থাৎ ৯০ মিনিটে কয়েক সেকেন্ডের স্ফুলিঙ্গ। যে ভাবে হুলিয়ান আলবারেসের গোল জিতিয়ে দিয়েছিল আর্জেন্তিনাকে বা জুড বেলিংহ্যাম হয়ে উঠেছিলেন ইংল্যান্ডের পরিত্রাতা।
স্পেনের কাছে দু’বছর আগে ইউরোয় হেরে ছিটকে যাওয়া ভোলেননি এমবাপে, দেম্বেলেরা। গত বছরে নেশন্স কাপে হারকে অবশ্য ততটা গুরুত্ব কেউই দিচ্ছেন না। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ফেভারিট হিসেবে চিহ্নিত, একমাত্র প্যারাগুয়ে ম্যাচ বাদ দিলে গোটা বিশ্বকাপ জুড়ে যে কোনও টিমের ডিফেন্স নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন এমবাপেরা। সেখানে গোটা টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত মাত্র একটা গোল ইয়ামালের। তাঁর উইং প্লে-র প্রশংসায় পঞ্চমুখ কোচ দে লা ফুয়েন্তে, কিন্তু বিগ ম্যাচ একা বের করে দেওয়ার মতো মুহূর্ত এখনও তৈরি হয়নি তাঁর পায়ে।

অন্য দিকে, এমবাপে ৮ গোল করে মেসির সঙ্গে সোনার বুটের দৌড়ে। অসামান্য ফর্মে। ফ্রান্সের ক্যাপ্টেন যদি গোলের সামনে বুলডোজ়ার হন, ‘টুথপিক’ (মজা করে যে নামা ডাকা হচ্ছে দেম্বেলেকে) দেম্বেলে প্রায়ই ভেল্কি দেখিয়েছেন, সঙ্গে মিডফিল্ডটা অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো নিয়ন্ত্রণ করেছেন পনিটেলের মাইকেল ওলিজ়ে। এই বিশ্বকাপে পাঁচটা অ্যাসিস্ট। এমবাপে বিশ্বকাপের আগেও বলেছেন, এই বিশ্বকাপটা কোচ দেশঁকে বিদায়ী উপহার হিসেবে দিতে চায় টিম। সেই লক্ষ্যে সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন ম্যাচটা এই বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। কেন?
স্পেনের ডিফেন্স সংগঠন বিশ্বের অন্যতম সেরা। ২০১০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়, তার পরে ২০১২ সালের ইউরো জয়। খাবি-ইনিয়েস্তাদের গোল্ডেন জেনারেশনের তৈরি করে দেওয়া ভিত ইউরো জিতে আবার নতুন ভাবে ফিরিয়ে এনেছেন রদ্রি-পেদ্রি-রুইস, ইয়ামাল-বায়েনারা। গোলে উনাই সিমোন ৬৫০ মিনিট অপরাজিত থাকার পরে বেলজিয়াম ম্যাচে প্রথম গোল খেয়েছিলেন, ডিফেন্সে পোরো, কুবার্সি, লাপোর্তে আর কুকুরেইয়াদের সামনে ওপেন স্পেস ওলিজ়ে বা রাবিও-র না পাওয়ার সম্ভাবনা।
ডিফেন্সিভ স্ক্রিন নিখুঁত রেখে মিডফিল্ড কন্ট্রোলের যে ফুটবল স্পেন খেলে, সেখানে আসল দায়িত্ব রদ্রির। সঙ্গে পেদ্রি বা রুইস। এই ফুটবলটাই তো ২০১০ সালের বিশ্বকাপে খেলতেন ইনিয়েস্তা। তার উপরে বায়েনা, দানি ওলমো আর ইয়ামাল। স্ট্রাইকার ওইয়ারসাবাল। কিন্তু বল প্লেয়ারের ম্যাজিকটা যদি কারও থেকে প্রত্যাশিত হয়, তিনি ইয়ামাল।
ফ্রান্সে আবার প্রতিভার ছড়াছড়ি। বার্কোলা, চেরকির মতো প্লেয়ারকে পরে নামাতে হচ্ছে, যাঁরা যে কোনও টিমে চোখ বুজে প্রথম এগারোয় ঢুকবেন। এই ম্যাচে মিডফিল্ডে রাবিও-র সঙ্গে চুয়ামেনিকে খেলানো যাবে কি না, প্রশ্ন সেখানে। তাঁর কাফ মাসলে চোট, যদি খেলতে পারেন, দেশঁ-র বহু সমস্যা মিটে যাবে।
ফ্রান্স গত দু’বারের ফাইনালিস্ট, জিতলে জার্মানির মতো টানা তিনবার ফাইনালে খেলবে। অন্য দিকে, স্পেন জিতলে ১৬ বছর পরে ফাইনালে যাবে।
ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির নিরিখে ইতিহাসে ফ্রান্স ও স্পেনের জায়গা চিরকালীন। কিন্তু ফুটবলে ফ্রান্সের প্রথম জয় ১৯৯৮ সালে, তার পরে নতুন শতাব্দীতে ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জিতলেও এই মুহূর্তে তারা বিশ্ব ফুটবল শাসন করছে। যা প্লাতিনি-জিদান-অঁরিদের সময়েও পারেনি। অন্য দিকে, স্পেনের প্রথম বিশ্বজয় ২০১০ সালে, তারাও ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে প্রথম চারে, ইউরো জয়ী।
সে জন্যই এই ম্যাচকে ‘ফাইনাল বিফোর দ্য ফাইনাল’ বলা হচ্ছে। ফুটবল অপেক্ষা করে আছে সেমিফাইনালের বিশেষ বিশেষ মুহূর্তকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। কোনও সন্দেহ নেই, মোমেন্টস বা মুহূর্তেই লুকিয়ে এই ম্যাচের চাবিকাঠি।














