কক্সবাংলা রিপোর্ট :: কাতারের রাজধানী দোহায় আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দোহা ফোরামের দুই দিনের ২৩তম সম্মেলন আগামী ৬ ডিসেম্বর শুরু হচ্ছে। এই সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সেশন হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু কাতার সরকার দোহা ফোরামের এজেন্ডা থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সেশনটি বাদ দিয়েছে। এ কারণে দোহা ফোরামের এবারের সম্মেলনে রোহিঙ্গা নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ বিষয়ে মুখ খুলছেন না। তবে শোনা যাচ্ছে, পশ্চিমা একটি প্রভাবশালী দেশের পরামর্শে দোহা ফোরামের আলোচ্যসূচি থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু বাদ দেওয়া হয়।
কয়েক মাস ধরে দোহা সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোন কোন বিষয়টি তুলে ধরা হবে, তা নিয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কাতারে অনুষ্ঠিতব্য দোহা ফোরামের সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের যোগদানের কথা থাকলেও এই সফরটি আর হচ্ছে না।
যেহেতু দোহা ফোরামের সম্মেলনের এজেন্ডায় বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই প্রধান উপদেষ্টার এতে অংশগ্রহণের প্রাসঙ্গিকতা আর নেই। সে ক্ষেত্রে দোহা ফোরামের সম্মেলনে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বাংলাদেশের পক্ষে অংশগ্রহণ করবেন।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, কাতার সরকার দোহা ফোরামের সম্মেলন আয়োজন করে। এখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী দেশসহ বিভিন্ন দেশ আলোচনা করে। গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
এতে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা পায়। এরপর কাতারের দোহায় এ বিষয়ে আরেকটি আন্তর্জাতিক সেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এমন কী ঘটল যে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে বাদ দিল কাতার সরকার।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দোহা ফোরামের সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার সব প্রস্তুতি নিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এ সম্মেলনে কাতারে দায়িত্বরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, মায়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর), রোহিঙ্গা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিও এবং বিদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পাশাপাশি কক্সবাজারে বসবাসরত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদেরও এতে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি ছিল।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রতিবছর দোহা ফোরামের সম্মেলনের আয়োজন করে থাকে কাতার সরকার। বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে হাজারের বেশি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা এতে অংশ নেন। এই সম্মেলন উদ্বোধন করেন কাতারের আমির। এতে ভাষণ দেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিশ্বের শীর্ষ নেতারা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে এখন প্রায় ১৩ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে গত এক বছরে নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা। প্রতিদিনই সীমান্ত দিয়ে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা।
কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন নানা অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত এসব রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এখন বাংলাদেশসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দোহা সম্মেলনের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে উপস্থাপন করার একটি সুযোগ ছিল। দোহা ফোরামের সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি প্রাধান্য পেলে এই সংকট সমাধানের পথে নতুন অগ্রগতি হতো।
দোহা ফোরামের সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাদ দেওয়ায় এই সংকটের সমাধানের পথ কিছুটা জটিল হবে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মায়ানমার জান্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সেই থেকে টানা আট বছর ধরে এ সংকট বহন করছে বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ নিবন্ধিতসহ আরও কয়েক লাখ অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন শিবির ও শিবিরের বাইরে অবস্থান করছে।
তবে বৈশ্বিক নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং মায়ানমারের ভেতরে অভ্যুত্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য দাতাদের দেওয়া মানবিক সহায়তাও গত কয়েক বছরে হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে রোহিঙ্গা সংকট আরও তীব্রতর হয়েছে, যার সমাধান এখনো অনিশ্চিত।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। যার মধ্যে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ৫ হাজার ৫২০ জন। পরিবার রয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৭৪টি। আশ্রিতদের মধ্যে ৫২ শতাংশ শিশু, ৪৪ শতাংশ প্রাপ্ত বয়স্ক এবং ৪ শতাংশ বয়স্ক রয়েছে। যার মধ্যে ৪৯ শতাংশ পুরুষ এবং ৫১ শতাংশ নারী। আর প্রতিবছর ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্মগ্রহণ করে।
তথ্যানুযায়ী, ১৯৭৭-৭৮ সালে ২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার মিয়ানমারে ফিরে যায়। এরপর ১৯৯১ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন মিয়ানমারে ফিরে যায়। ২০১২ থেকে ১৬ সাল পর্যন্ত ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। তারপর ২০১৭ সালে ৮ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। আর ২০২৪ সালে ৬৪ হাজার ৭১৮ জন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে স্থানীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে ৫ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু তার বিপরীতে রোহিঙ্গার সংখ্যা দ্বিগুণের কাছাকাছি।













