সোয়েব সাঈদ, রামু :: রামুতে অদম্য নারী পুরস্কার পেলেন স্কুল শিক্ষক রেজিয়া পারভীন ও গৃহিনী অঞ্জনা বড়ুয়া। আর্ন্তজাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষ্যে ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ শীর্ষক কর্মসূচির এ সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।
মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর সকালে রামু উপজেলা পরিষদের হিমছড়ি সম্মেলন কক্ষে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে এবং রামু উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় আয়োজিত এ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন- রামু উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ফজলে রাব্বানী চৌধুরী।
রামু উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা উম্মে সুরাইয়া আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে রামু প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক সোয়েব সাঈদ, অদম্য নারী পুরস্কার প্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক রেজিয়া পারভীন ও গৃহিনী অঞ্জনা বড়ুয়া সহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে “অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫” প্রাপ্ত পেঁচারদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক রেজিয়া পারভীন তাঁর বক্তব্যে বলেন- ‘আমার জন্ম নিভৃত প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আমাদের এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত কষ্টকর ছিল।
প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে যেতে হতো সোনারপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। তখন গাড়ি বা সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। ২০০৮ সালে আমার বিয়ে হয় এবং ২০০৯ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিই। স্বামী-সংসার, পড়াশোনা ও দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করা খুব কঠিন ছিলো। তবুও আমি শিক্ষার আলোয় জীবনকে রাঙিয়ে তোলার স্বপ্নে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করি।
তখন নারীদের পড়াশোনা বা চাকরি করাটা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও আমি বিশ্বাস রেখে চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার পথ তৈরি করি। জীবনে বিবাহ, সংসার, মাতৃত্ব—অনেক বাঁধা- বিপত্তি এসেছে। তবুও আমি থেমে থাকিনি। এসএসসি থেকে স্নাতকোত্তর, ডিপিএড, এবং বর্তমানে বি.এড পর্যন্ত আমার শিক্ষাযাত্রা অব্যাহত রাখতে পেরেছি।
শিক্ষকতা জীবনের ১১ বছরে আমি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন শিক্ষনপদ্ধতি ও সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এর স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২৫ সালে কক্সবাজার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক, ২০২৪ সালে কক্সবাজার জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক ও উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক এর পুরস্কার পেয়েছি।
এছাড়া ও দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজের অবদান স্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে সিপিপি শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবক পুরস্কার ২০২৩ অর্জন করেছি। আমার প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে সংগ্রাম, ধৈর্য এবং পরিবারের সকলের নিঃস্বার্থ সহযোগিতা ও ভালবাসা। আমি তাদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।”
অনুষ্ঠানে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে উপজেলা পর্যায়ে “অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫” প্রাপ্ত আমি অঞ্জনা বড়ুয়া তাঁর বক্তব্যে বলেন- “আমার জন্ম হয় দরিদ্র কৃষক মানিক বড়ুয়ার পরিবারে ১৯৮৮সালে, রামু উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম পূর্ব রাজারকুলে।আমি আমার বাবা মায়ের ২য় সন্তান। মনোরম পরিবেশে জন্ম হলেও সেই সৌন্দর্য্য উপভোগ করার সময় দেয়নি প্রকৃতি সেই গ্রামের সন্তানদের। ১৯৯৮ সালে প্রকৃতির কাছে হার মানতে বাধ্য হয় পুরো গ্রামবাসী।
ভর দুপুরবেলা, আমি আর আমার কয়েকজন সমবয়সী ছেলে মেয়ে একসাথে খেলা করছিলাম বাড়ির উঠানে ।হঠাৎ করে দেখতে পেলাম উঠানের কিছু অংশে ফাটল ধরেছে।আমরা তখন বুঝতে পারিনি যে সেই ফাটল বন্যার পানির প্রভাবে হয়েছে।ছোখের পলক না ফেলতেই শুনতে পেলাম পাশের বাড়ির মানুষের আর্তনাদ।নদী ভাঙ্গন শুরু হয়ে গিয়েছে ইতঃমধ্যে।
সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিয়েছে জীবন বাঁচাতে। তারপর সকলে নিজের জীবন নিয়ে বেঁচে ফিরলেও কেউ একটি কড়ি নিতেও সময় পাইনি। মাথায় ছিলনা একটুকু ছাঁদ। অন্যের ভিটেয় কয়েকবছর যাপন করলেও আর থেমে থাকা যায়নি সেই মুহূর্তে।
কেননা, আমার বাবার সেই সময়ে ধরা পড়েছে ম্যালেরিয়া এবং টাইফয়েড এর সাথে এক পা প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছে। তার উপর আমার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল নদী ভাঙ্গনের আগে। তাই জীবিকার তাগিদে গার্মেন্টসে চাকরি করি কয়েকবছর। বাবা একটু সুস্থ হয়ে উঠতেই আামার মায়ের ধরা পড়ে ব্লাড ক্যান্সার।
আমার মা সেটার সাথে বেশিদিন লড়াই করে উঠতে পারেনি। মৃত্যু নামক নিয়ামক কেড়ে নেয় আমার মাকে। মায়ের মৃত্যু যেন আমাকে নিঃস্ব করে দেয়।বুকভরা কষ্ট সহ্য করে পরিবারের লোকজনের দীর্ঘশ্বাস দূর করতে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়ি আবার।
আবার চলে যায় চট্টগ্রামে চাকরির উদ্দেশ্যে। আমার ছোট দুই ভাই বোন তাকিয়ে থাকতো রাস্তার দিকে আমি আসার অপেক্ষায়। কয়েকবছর এভাবে চলার পর ছোট একটি জায়গা ক্রয় করে সেইখানে আমরা জীবন অতিবাহিত করি। এরমধ্যেই বাবার অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় আমাকে পাত্রস্থ করা হয়। শশুর বাড়িতে কয়েকমাস ভালোভাবে কাটাতে পারলেও বেশিদিন থাকার সুযোগ হয়নি আমার তাদের অন্তর্দন্দ্বের জন্য।
সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা বাচ্চা নিয়ে রাত ১২ টায় বের করে দেওয়া হয় আমাকে। সেই রাতটা পাশের বাড়ির একজনের বাসায় কাটিয়ে সকাল বেলা চলে আসি বাবার বাড়িতে। কয়েকদিন থাকার পর আবার জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা।
তখন ২০১২ সাল,সারারাত বৃষ্টির পর বন্যার পানিতে ডুবে যায় পুরো এলাকা।টিনের চাউনি ভেঙ্গে আমাদের উদ্ধার করে কয়েকজন প্রতিবেশি।আমার সন্তানকে রাখার মতো একটি নিরাপদ জায়গা ছিলনা।বিহারে আশ্রয় নিই, বন্যার পানি নেমে না যাওয়া অবদি। তার পরেই আবার অবস্থা শীতল হলেও মনে পড়ে সেই দুর্ভাগ্যের কথা,১৯৯৮ সাল কেড়ে নেয় ভিটেমাটি আর ২০১২ সাল নিয়ে গেল কষ্টের সেই ঘরটুকু। এই ভয়াবহতা রামুবাসী কখনো ভুলতে পারবে না।
তবে এই ২০২৫ এ এসে বলতে পারি আমি একজন সফল নারী। আমার দুইটা সোনার টুকরো সন্তান নিয়ে আমি আর আমার স্বামী গড়ে তুলেছি ১২ টি গরু নিয়ে একটি খামার। যেখানে রয়েছে ৬টি গাভী। ১টি গাভী ২৫-২৬ কেজি দুধ দেয়। আমার স্বপ্ন আমি আমার খামার আরও বড় করবো।”













