বৃহস্পতিবার ১২ মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ ফাল্গুন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস-কেন ঘটেছিল এমন নৃশংসতা : চূড়ান্ত পরাজয়ের আগে হত্যাকাণ্ড : জেনোসাইড পরিকল্পনারই কৌশলগত অংশ

🗓 রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

👁️ ২২৬ বার দেখা হয়েছে

🗓 রবিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

👁️ ২২৬ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৪ ডিসেম্বর) :: ১৪ ডিসেম্বর আমরা পালন করি শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে। পৃথিবীর ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যার নিদর্শন তো অনেক পাওয়া যাবে, মধ্যযুগে কত মানুষকে যে শূলে চড়ানো হয়েছে তাদের চিন্তাশীলতা লালন, ধারণ ও প্রচারের জন্য, তার ইয়ত্তা নেই। বিশ শতকের ইতিহাসেও কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদদের এমন পরিণতির উদাহরণ বেশ কিছু মিলবে, কিন্তু বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রস্তুত করে ঘরে ঘরে হানা দিয়ে তাঁদের তুলে এনে নির্মম অত্যাচারের পর চোখ বেঁধে বধ্যভূমিতে এনে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা—এমন হত্যাকাণ্ডের নিদর্শন দ্বিতীয় আরেকটি মিলবে না।

সেই সঙ্গে এটাও স্মরণীয়, ২৫ মার্চ ১৯৭১–এ যে গণহত্যা বা জেনোসাইড শুরু করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী, সেখানে যথেচ্ছ হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ছিল বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্য বা টার্গেট করে নিধন, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছিল এবং ৯ মাস অব্যাহত ছিল দেশজুড়ে।

১৪ ডিসেম্বর ছিল সেই নৃশংসতার পরিকল্পিত ও সংগঠিত ভয়ানক পরিণতি, যে দিবসের তুলনা দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবে না। তাই দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুনিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশেরই রয়েছে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’। ভিন্নতর এক উদাহরণ আমরা পাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের ছাত্র সংঘ জার্মান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন দ্বারা সংঘটিত বই পোড়ানো উৎসবে, যখন জাতির শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে রাইখস্ট্যাগের সামনে খ্যাতিমান লেখক-সাহিত্যিক-দার্শনিকদের বইয়ের স্তূপ তৈরি করে তাতে আগুন দেওয়া হয়।

এই পথ বেয়ে আসে হলোকাস্ট, যেখানে অনেক বুদ্ধিজীবীকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়, তবে বেশির ভাগ প্রাণে বাঁচেন দেশত্যাগ করে। ২০ মে ১৯৩৩–এ সংঘটিত বইয়ের অগ্নি-উৎসব স্মরণে বার্লিনের বেবেলপ্লাটজে নির্মিত হয়েছে স্তম্ভ।

বাংলাদেশও শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে মিরপুর কবরস্থানে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর প্রতিষ্ঠা করেছে স্মারক স্থাপনা এবং পরে রায়েরবাজারে বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে হত্যাকাণ্ডের স্থানে নির্মাণ করেছে যথোপযুক্ত স্মৃতিসৌধ। নদী আজ সরে গেছে অনেকটা, তবে ইতিহাস অনুধাবনে সব সময় বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয় অতীতকে।

জাতি বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে, সেই স্মরণের বৃত্ত ক্রমে ছোট হয়ে আসছে, অনেক সময় মামুলি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হচ্ছে, হচ্ছে দিবসকেন্দ্রিক। আমরা জানার চেষ্টা করেছি কী ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল। তবে আজ স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পর আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে, কেন এমন অপার নৃশংসতা ঘটেছিল; কোন কারণ ও পরম্পরায় এমন নিষ্ঠুরতা বাস্তব হয়ে উঠল; যারা ঘাতক, তাদের মানসিকতা কী ছিল; কীভাবে কেবল একজন নিষ্ঠুর হত্যাকারী নয়, একটি গোষ্ঠীর সদস্য মানবদের এমন দানব করে তোলা সম্ভব হলো।

যে আদর্শ এমন নিষ্ঠুরতায় পর্যবসিত হয়, তার স্বরূপ বোঝা ও বিশ্লেষণ খুব জরুরি। ঘাতকের মানস বোঝার চেষ্টায় দুই বিশ্লেষকের উল্লেখ এখানে করা যায়। তাঁদের একজন হান্না আরেন্ড—মার্কিন লেখক ও চিন্তাবিদ, যিনি জার্মানির পলাতক যুদ্ধাপরাধী অ্যাডলফ আইখম্যানের বিচার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন ইসরায়েলে এবং বিস্মিত হয়েছিলেন এটা দেখে ও জেনে যে আইখম্যান আর দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই স্নেহবৎসল পিতা, সজ্জন প্রতিবেশী; কিন্তু আদর্শগতভাবে তিনি মনে করেন, ইহুদিরা জার্মানির শত্রু এবং দেশরক্ষায় তিনি যা করেছেন, প্রয়োজনে আবারও তা–ই করবেন।

আইখম্যান ইন জেরুজালেম গ্রন্থে হান্না আরেন্ড মেলে ধরেন তাঁর বিশ্লেষণ ‘দ্য ব্যানালিটি অব ইভিল’ বা নিষ্ঠুরতার মামুলিপনা ঘিরে। ঘাতকের মানস অনুধাবনে তাঁর চেষ্টায় ছিল গভীরতার মাত্রা, যা জেনোসাইডের কার্যকারণ বুঝতে সহায়ক হয়। সাধারণ আটপৌরে মানবের দ্বারা কীভাবে নিষ্ঠুর দানবীয় কাজ হতে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যে এর প্রতিকার নিহিত। তেমন কাজই করছেন হালের গ্রেগরি স্ট্যানটন, তাঁর জেনোসাইডের দশ ধাপ তাত্ত্বিক কাঠামোর জোগান দিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের আলাদা ও ক্ষতিকর বিবেচনা করা এবং এর অনুষঙ্গ হিসেবে যে ঘৃণার উদ্‌গম, তা ক্রমে ক্রমে রূপান্তরিত হয় শত্রু হননের জেনোসাইডে।

অপরকে কীভাবে হেয় হিসেবে দেখা হয়, সেই পরিচয় রেখে গেছেন বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রধান কুশীলব মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। উত্তর ভারত থেকে পাকিস্তানে আসা রিফিউজি, ফারসি-আরবি নামের সঙ্গে যিনি হিন্দু-মুসলিমনির্বিশেষে ভূস্বামী পদবি ‘রাও’ ব্যবহার করেন, যেমন বাংলাদেশে দেখা মিলবে চৌধুরী পদবির; সেই অর্থে তো ভারতের এককালীন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের সঙ্গে তাঁর ঐতিহ্যগত মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমরা দেখি, ভারতীয় বংশোদ্ভূত রাও ফরমান আলীর ডেস্ক ডায়েরির ডিসেম্বরের পাতায় টোকা ছিল বুদ্ধিজীবীদের নাম এবং স্পষ্টাক্ষরে লেখা, ‘ট্রান্সপোর্ট ফর আলবদর’। কাদামাখা এসব মাইক্রোবাসে করেই তুলে আনা হয়েছিল বুদ্ধিজীবীদের। মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা মহাবিদ্যালয়ে আলবদর হেডকোয়ার্টারে নিয়ে তাঁদের আটক করে নির্মম অত্যাচারের পর ১৪ ডিসেম্বর সুবেহ সাদেকের আলো-আঁধারময় সময়ে বুড়িগঙ্গা তীরের পরিত্যক্ত ইটের ভাটায় চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে হত্যা করা হয়। এই নৃশংসতা যারা ঘটাল, তাদের মানস বিশ্লেষণ খুব জরুরি; জানাবোঝা দরকার, কীভাবে সমাজে সংগঠিতভাবে এমন নিষ্ঠুরতা ঘটতে পারে।

ঘাতকের মানস বিশ্লেষণে ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’ বিবেচনায় রাখা দরকার, তেমনি পাঠ করতে হবে ‘টেন স্টেপস অব জেনোসাইড’। আপাতভাবে সজ্জন আদবকায়দা দুরস্ত মানুষ মনে হবে রাও ফরমান আলীকে। ইংরেজিতে লিখেছেন, তাঁর স্মৃতিভাষ্য, হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড। শুরুতেই বলেছেন, বাল্যকাল থেকে তাঁর শোনা তিন ধরনের বাঙালির কথা—ভুখা বাঙালি, বাবু বাঙালি ও জাদু বাঙালি। বাঙালিরা চির-অভুক্ত, গরিব–গুর্বো, ব্রিটিশের তাঁবেদারি করা বাবু এবং বাঙালি মেয়েরা জানে বশীকরণ মন্ত্র, বাংলায় প্রবেশকারী তাদের জাদুমন্ত্রে মুগ্ধ হয়ে পথভ্রষ্ট হয়। অন্যদিকে ঘাতক হয়ে ওঠা ইসলামি ছাত্র সংঘের তরুণেরা সভা-সমিতিতে উচ্চারণ করেছে ব্রাহ্মণ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা ও ইসলাম রক্ষার শপথ। মহৎ আদর্শকে বিকৃত করে তৈরি করা হয় ঘাতক, যেমন হিটলার করেছিলেন জার্মান জাতির মর্যাদা রক্ষার নামে, একাত্তরে তেমনি নৃশংসতা ঘটে ইসলাম রক্ষার নামে।

ধর্মরক্ষার নামে নির্বিচার মানবহত্যা সম্ভব হয়েছিল আদর্শের বিকৃতি ঘটিয়ে, যার ফলে আমরা দেখি বাংলাজুড়ে কতশত বধ্যভূমির স্মৃতিস্মারক, লাখো মানুষের আত্মাহুতির হাহাকার যেখানে জমাট বেঁধে আছে। জীবনপ্রবাহে তা আমাদের অলক্ষ্যেই থেকে যায় এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের বদলে আমরা ‘ব্যানালিটি অব মেমরি’ বা স্মৃতির মামুলিপনায় নিজেদের হারিয়ে ফেলি। এমন তুলনাহীন নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়ে আমাদের অবশ্যই উত্তর খুঁজতে হবে, কেন এমন ঘটেছিল।

বিশ শতকের ইতিহাসে নিষ্ঠুরতার শেষ নেই, কিন্তু শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের মতো আর তো কোনো দিন কারও নেই। বিশ শতকের ইতিহাসে মুসলিম নিধন অনেক ঘটেছে, তবে একাত্তরে বাংলাদেশে যত মুসলিম নিধন হয়েছে, তেমন আর কোথাও ঘটেনি। বসনিয়ায় নয়, বাংলাদেশেই একাত্তরে জেনোসাইডের শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছে সবচেয়ে বেশি মুসলমান। আর এটা ঘটেছে মুসলমানদের হাতেই। আমাদের জবাব খুঁজতে হবে, কেন এমন ঘটেছিল।

অতীত থেকে যারা শিক্ষা গ্রহণ না করে, অতীত তাদের আবারও গ্রাস করে—এমন কথা বলেছেন ইতিহাসবিদেরা। আমরা অতীতকে যতটা না জানছি, তেমনভাবে বোঝার চেষ্টা করিনি। আজ চারদিকে আবার যে রণহুংকার, ঘৃণার যে বেসাতি, হিংসার যে উত্থান, সংঘাতের যে উসকানি, তা থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে। কেন ঘটেছিল বুদ্ধিজীবী হত্যা, সেটা বোঝা ও পড়া আজ তাই জরুরি। দেশ ও সমাজকে রক্ষার জন্য যে বোঝাপড়া আমাদের জোগাতে পারে বরাভয়, আগামী সহনশীল উদার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজগঠনের পথের দিশা, হালের ভাষায় নতুন বন্দোবস্তের লক্ষ্যে অভিযাত্রা, হিংসার বিপরীতে সম্প্রীতির নির্মাণ।

  • মফিদুল হক: লেখক, গবেষক এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের একজন প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি
  • মফিদুল হক

চূড়ান্ত পরাজয়ের আগে বুদ্ধিজীবী হত্যা

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরীকে দুপুরে খেতে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তাঁর মা আফিয়া বেগম। দরজার কাছে একদল লোক এসে বলল, ‘আমাদের সঙ্গে একটু যেতে হবে।’ তিনি আর ফিরে আসেননি। একই দিনে আড়াই মাসের সন্তান কোলে নিয়ে বসে ছিলেন তরুণ বিজ্ঞানী মো. আমিনউদ্দিন। তিনি বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন। তাঁকে নেওয়া হলো তাঁরই গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে। আমিনউদ্দিনও আর ফেরেননি।

সাংবাদিক নিজামুদ্দীন আহমদকেও এভাবেই তুলে নেওয়া হয়েছিল সন্তানদের সামনে থেকে। রশীদ হায়দার সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমি প্রকাশিত স্মৃতি: ১৯৭১ বইয়ে জানা যায় তাঁদের মতো আরও বহু শহীদ বুদ্ধিজীবীর শেষ সময়ের ঘটনার স্মৃতি। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বজনদের লেখায় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় বেদনাময় স্মৃতির আরেক ইতিহাস।

বুদ্ধিজীবীদের যে বেছে বেছে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পাকিস্তানিরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তা জানা গিয়েছিল বিজয় অর্জনের পরপরই। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় ছিলেন মার্কিন সাংবাদিক পিটার আর কান। তাঁর সে সময়ের দিনপঞ্জি পরে ছাপা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পত্রিকায়। তাতে ১৮ ডিসেম্বর পিটার লিখেছিলেন, ‘আজকের দিনের প্রথম ভাগে মুক্তিরা বিখ্যাত বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গণকবর খুঁজে পান, যাঁদের স্থানীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা জিম্মি করেছিল এবং গত দিনের আগের রাতে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঐতিহ্যগতভাবে এটি একটি রক্তরঞ্জিত সমাজ, যেটি সদ্যই ৯ মাসের রক্তগঙ্গার মধ্য দিয়ে গেছে।’

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহর থেকে বিজয়ের আগমুহূর্ত পর্যন্ত বহু বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে এভাবে আমরা হারিয়েছি। বহুল পরিচিতদের মধ্যে আছেন গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশীদুল হাসান, আবুল খায়ের, আনোয়ার পাশা, সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, আলতাফ মাহমুদ, নিজামুদ্দীন আহমদ, গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ফজলে রাব্বী, আলীম চৌধুরী, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সেলিনা পারভীন প্রমুখ। তাঁদের বাইরেও আছেন অনেকে। বুদ্ধিজীবীদের এই হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে আলবদর বাহিনীসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী একটি গোষ্ঠী।

ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বিজয় যখন আসন্ন, তখন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। তবে মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস ধরেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়।

দেশজুড়ে হত্যাযজ্ঞ

পিরোজপুরে সাঈফ মীজানুর রহমানকে জিপের পেছনে বেঁধে গোটা পিরোজপুর শহর ঘুরিয়েছিল পাকিস্তানি সেনারা। পরে তাঁকে গুলি করে বলেশ্বর নদে ফেলে দেওয়া হয়। ম্যাজিস্ট্রেট ও ট্রেজারি কর্মকর্তা সাঈফ ট্রেজারি থেকে টাকা আর অস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। ছাত্র অবস্থায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফজলুল হক ছাত্র সংসদের সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক।

সিলেটের লাক্কাতুরা চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক ছিলেন সৈয়দ সিরাজুল আব্দাল। তাঁর শরীর থেকে রক্ত টেনে বের করে নেওয়া হয়েছিল। এর সাক্ষী ছিলেন সিলেটের পুরোনো পত্রিকা যুগভেরীর সম্পাদক আমিনূর রশীদ চৌধুরী। সিরাজুল আব্দালের পরিবার ফেরত পেয়েছিল একটি কঙ্কাল। আবদাল পাকিস্তানি সেনাদের কাছে প্রথম রোষে পড়েছিলেন বাংলা বর্ণমালার ছোট্ট একটা বই ছাপার সূত্র ধরে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মীর আবদুল কাইয়্যুমের বাড়িতে কিছু লোক এসে বলেছিল, ‘স্যার, একটু বাইরে আসবেন?’ স্ত্রী মাসতুরা খানমের নিষেধ অমান্য করে তিনি দরজার বাইরে গিয়েছিলেন। আর ফিরে আসেননি।

এভাবে বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনা ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাসজুড়ে। প্রথমা প্রকাশনের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী: স্মৃতি জীবন যুদ্ধ বইয়ে সংকলিত হয়েছে ৩৫৪ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর পরিচিতি ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অবদানের কথা। এই সংকলন থেকে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় যে ঢাকার বাইরেও সমানভাবে চলেছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁসহ আরও কয়েকটি জেলায় প্রাণহারানো বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা অনেক।

দেশব্যাপী পরিচালিত ৯ মাসের গণহত্যায় অগণিত মানুষের প্রাণদানের সীমাহীন ট্র্যাজেডিতে ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছিল বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। এর কোনো সামরিক কার্যকারণ ছিল না, ছিল বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে প্রবল আক্রোশ। যাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদের হত্যা করে দেশটির ভবিষ্যৎকে মেধাশূন্য করে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা।

তাঁরা কতজন

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত চার পর্বে ৫৬০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নাম প্রকাশ করেছে। প্রথম দফায় ১৯১, দ্বিতীয় তালিকায় ১৪৩, তৃতীয় দফায় ১০৮ জন এবং চতুর্থ দফায় ১১৮ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর নামের গেজেট প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে গবেষকেরা বলেন, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি। গত বছরের মার্চে চতুর্থ দফার পর আর কোনো তালিকা প্রকাশিত হয়নি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের মধ্যে কতজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা এখনো পাওয়া যায় না। তালিকায় যাঁদের নাম জানা যায়, তাঁদের অধিকাংশই শহরকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মানুষ।

২০১৩ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মামলায় জবানবন্দিতে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘একাত্তরের আগস্টে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। ডিসেম্বরে আলবদর বাহিনী এই পরিকল্পনা কার্যকর করতে শুরু করে। প্রকাশিত তথ্যমতে, মঈনুদ্দীন এই হত্যাকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্বে এবং আশরাফুজ্জামান এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন।’

এ প্রসঙ্গে বারবার উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান জেনারেল রাও ফরমান আলীর একটি তালিকার কথা। স্বাধীনতার পর বঙ্গভবন থেকে রাও ফরমান আলীর যে ডায়েরি পাওয়া যায়, তাতে নিহত ও জীবিত বুদ্ধিজীবীদের একটি তালিকা ছিল। স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সংগ্রামের নোটবুক’-এর একটি অনলাইন পেজের ছবিতে দেখা যায়, রাও ফরমান আলীর হাতে লেখা বুদ্ধিজীবীদের নামের তালিকায় আছে মুনীর চৌধুরীসহ আরও বহু বুদ্ধিজীবীর নাম।

তাঁদের অবদান

আনোয়ার পাশার রাইফেল রোটি আওরাত উপন্যাস, মুনীর চৌধুরীর কবর নাটক কিংবা আলতাফ মাহমুদের ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুর বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রটির সঙ্গে মিলেমিশে আছে।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী: স্মৃতি জীবন যুদ্ধ বইয়ের ভূমিকায় লেখা হয়েছে, ‘আমাদের বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন মেধাবী। মেধার চেয়েও বড় আরেকটা বিপজ্জনক অস্ত্র তাঁদের ছিল: বিবেক। বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁরা। নিজেরাই হয়ে উঠেছিলেন জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর। তাঁরা অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যমুক্ত আধুনিক প্রগতিশীল দেশ চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন মানুষের অধিকারের প্রতিষ্ঠা।’

সেই যে আমাদের শ্রেষ্ঠ মানুষদের আমরা হারালাম, সেই ক্ষতি আজও পোহাতে হচ্ছে জাতিকে। এ ক্ষতি কোনো দিন পূরণ হবে না।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ছিল জেনোসাইড পরিকল্পনার কৌশলগত অংশ

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ দিকে অবশ্যম্ভাবী পরাজয় বুঝতে পেরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের দোসর আলবদর–আলশামসের সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের ধরে নিয়ে যায় ও নৃশংসভাবে হত্যা করে। সেই সময় রায়েরবাজার, মিরপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য বধ্যভূমি বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘জীবন্ত সাক্ষী’ হয়ে আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে।

জেনোসাইড সংঘটনের সময় বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করে হত্যা করার ঘটনা শুধু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত হয়েছে, তা নয়; বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জেনোসাইড বা সমপর্যায়ের অপরাধযজ্ঞে বুদ্ধিজীবী হত্যার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। তাই টার্গেটেড বুদ্ধিজীবী হত্যা কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং জেনোসাইড পরিকল্পনার একটি কৌশলগত অংশ।

একেক দেশের অপরাধীরা নিজস্ব কৌশল বিবেচনায় সেই দেশের বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করে হত্যা করে থাকে। সাধারণভাবে বুদ্ধিজীবী বলতে আমরা কাদের বুঝি আর কেনই–বা তাঁরা যেকোনো জেনোসাইডে টার্গেট হন, তার প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণাত্মকভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছি এই লেখায়।

জেনোসাইড-অধ্যয়নে ‘বুদ্ধিজীবী’ (ইনটেলেকচুয়াল) বলতে কেবল ‘শিক্ষিত মানুষ’কে বোঝায় না, বরং একটি সমাজের চেতনা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও সংগঠন–কাঠামোকে প্রভাবিত করতে সক্ষম এমন নেতৃত্বশীল ও চিন্তাশীল শ্রেণিকে বোঝানো হয়। সে কারণেই বুদ্ধিজীবী হত্যায় শুধু শিক্ষক বা অধ্যাপকেরাই নন, যেকোনো পেশার এমন ব্যক্তিদের টার্গেট করা হয়, যারা একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শকে অন্যের মধে৵ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

ইতালীয় তাত্ত্বিক ও চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর প্রিজন নোটবুকস–এ বুদ্ধিজীবী ধারণাটিকে ‘ট্র্যাডিশনাল ইনটেলেকচুয়ালস’ দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে এসে ‘অর্গানিক ইনটেলেকচুয়ালস’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘অল মেন আর ইনটেলেকচুয়াল, বাট নট অল মেন হ্যাভ ইন সোসাইটি দ্য ফাংশন অব ইনটেলেকচুয়ালস’ অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তিই চিন্তা করতে পারেন; কিন্তু তাঁরা সবাই সমাজে বুদ্ধিজীবীর সামাজিক ভূমিকা রাখতে পারেন না।

তবে অর্গানিক বুদ্ধিজীবীরা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে উঠে এসে সেই গোষ্ঠীর ইতিহাস ও মতাদর্শকে সংগঠিত করে, রাজনৈতিক ভাষা দেয় এবং প্রতিরোধ ও আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই প্রায় সব জেনোসাইডে এই অর্গানিক বুদ্ধিজীবীরা আলাদাভাবে টার্গেটেড হন।

ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টসের (আইসিজে) ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইভেন্টস ইন ইস্ট পাকিস্তান ১৯৭১’ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাঙালিদের দমনে প্রাথমিক ক্র্যাকডাউন ব্যর্থ হলে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের মনোযোগ নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী/দলের ওপর কেন্দ্রীভূত করে। যাঁদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দলের সদস্য, ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী এবং হিন্দুধর্মাবলম্বীরা (পৃ. ৩১)।’

তবে স্বাধীনতার পক্ষের বুদ্ধিজীবীদের শনাক্ত করার সেনা-অনুমোদিত তালিকা তৈরির প্রমাণ মেলে ঢাকার তৎকালীন অন্যতম প্রধান পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে (মুনতাসীর মামুন, ১৯৯৯)।

শুধু তা–ই নয়, পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক অ্যান্টনি মাসকারেনহাস তাঁর রেপ অব  বাংলাদেশ বইয়ে বলেন যে হত্যাযজ্ঞ ব্যক্তিদের তালিকা সেনাবাহিনীর কাছে প্রস্তুত ছিল। (পৃ. ৯৩)

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে, ১১ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে এভাবে কতজন বুদ্ধিজীবীকে মেরে ফেলা হয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। কেউ কেউ দুই হাজার জন বলে মনে করেন, আবার কেউ কেউ শত শত বলে মনে করেন। তবে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় শহীদ ৫৬০ জন বুদ্ধিজীবীর নাম প্রকাশ করে এবং বলা হয়, চূড়ান্ত তালিকা পরবর্তী সময়ে প্রকাশ করা হবে।

এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংঘটনে তৎকালীন আলশামস ও আলবদর সদস্যরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে অংশ নিয়েছিল, যাদের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগঠনের পক্ষে কথা বলা সব বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করা।

পাকিস্তানি অফিসারদের পরিচালনায় এই অভিযানগুলো রাতের অন্ধকারে চালানো হয়, যখন বন্দুকের মুখে বুদ্ধিজীবীদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল; আর কখনো ফিরে না আসার জন্য। তাঁদের অনেককে ঢাকা কলেজ অব ফিজিক্যাল এডুকেশন ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মেরে ফেলার পর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লাশ মিরপুর ও রায়েরবাজারের কাছে নির্জন ইটভাটায় ট্রাকে করে নিয়ে স্তূপ করে ফেলে আসা হয়, যেখানে পরবর্তী সময়ে দুটি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। যুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে বাংলাদেশের অন্যান্য অংশেও একই রকম নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ জেনোসাইড ছাড়াও ১৯১৫ সালে আর্মেনীয় জেনোসাইডের সময় অটোমান শাসকপক্ষ তৎকালীন আর্মেনিয়ান চিকিৎসক এবং কবি রুপেন চিলিংগিরিয়ানকে গ্রেপ্তার করে জেনোসাইড শুরু করে। কেবল রুপেনই নয়, সেই সময়ে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীকেও গ্রেপ্তার করা হয়। অটোমান শাসক রুপেনকে গ্রেপ্তার করেন কারণ, তাঁকে এমন একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচনা করা হতো, যিনি জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে পারেন, ফলে কর্তৃপক্ষের জন্য তিনি ‘বিপজ্জনক’ ছিলেন (ওয়ানগেনহেইমের রিপোর্ট, ১৯১৫)।

জানা গেছে, ওই সময় প্রায় ১৮০ জন আর্মেনিয়ান বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করে নির্বাসিত করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে মাত্র ৩০ জন জীবিত ফিরে এসেছিলেন।

এ ছাড়া ১৯১০-৩০ সালের মধ্যে জার্মানির নাৎসিরা হাঙ্গেরিতে ইহুদি বুদ্ধিজীবী নাগরিকদের বিপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছিল। হাঙ্গেরির হলোকাস্ট জাদুঘর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই ২০ বছর সময়কালে সবচেয়ে বেশি হত্যা করা হয়েছে আইনজীবী, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের।

এ তথ্য থেকে বোঝা যায় যে ইহুদি বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হলোকাস্টের অংশ হিসেবেই কার্যকর করা হয়েছিল। এরপর আমরা যদি কম্বোডিয়ার জেনোসাইডের দিকে তাকাই, সেখানে দেখতে পাই যে খেমাররুজের চার বছরের শাসনের পর দেশটি তার শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি হারিয়েছে সাংঘাতিকভাবে।

জেনোসাইডের পর ৪৫০ জন চিকিৎসকের মধ্যে মাত্র ৪৫ জন এবং ২০ হাজার শিক্ষকের মধ্যে মাত্র ৭ হাজার জন বেঁচে ছিলেন। খেমাররুজ বৌদ্ধভিক্ষুসহ একাধিক ভাষা জানা লোকদেরও লক্ষ্যবস্তু করেছিল, এমনকি যারা চশমা পরত, তাদেরও ধরে নিয়ে মেরে ফেলা হতো অপেক্ষাকৃত শিক্ষিত হওয়ার সন্দেহে (বেন কিরনান, ২০০৫)।

এভাবে আপনি যে জেনোসাইড নিয়েই পড়বেন বা গবেষণা করবেন, কৌশলগত উপায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যার উদাহরণ পাবেন নিশ্চিতভাবেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাসজুড়েই  এ দেশের প্রতিটি জেলাতেই বুদ্ধিজীবী হত্যা সংঘটিত হয়েছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং তার সহযোগীদের বুদ্ধিজীবী হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল কারণ ছিল বুদ্ধিজীবীদের মধ্য থেকে উদ্ভূত স্বাধীনতার শক্তির উৎসকে  নির্মূল করা, জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা। (নয়নিকা মুখার্জি, ২০০৭)।

এই কারণগুলো ছাড়াও বিভিন্ন কারণে জেনোসাইডের ইতিহাসে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়।

প্রধানত জেনোসাইড পরিকল্পনাকারীরা জানে, শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সব বুদ্ধিজীবীই ‘সমাজের মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করেন।

তাই তাঁদের হত্যা করলে এটা অনেকাংশেই নিশ্চিত করা যায় যে আক্রমণের শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা বা রাজনৈতিকভাবে পুনর্গঠিত হওয়া ও নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এই কৌশল ‘ডিক্যাপিটেশন লিডারশিপ’ নামে পরিচিত, যা সব জেনোসাইডেই দেখা গেছে।

দ্বিতীয় আরেকটি কারণ হলো বুদ্ধিজীবীরা একটি দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জ্ঞানচর্চার অন্যতম ধারক, তাই তাঁদের হত্যা করা মানে হলো জাতিগত স্মৃতি সংরক্ষণ ও পুনর্গঠনের ক্ষমতাকে অনেকাংশে নষ্ট করা, বিশেষ করে জেনোসাইড–পরবর্তী সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অপরাধীদের শাস্তিসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবিদাওয়ার প্রেক্ষাপটও অনেকখানি দুর্বল হয়ে যায় বুদ্ধিজীবীদের অস্তিত্ব ও নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে।

রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ  বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার কারণে বাংলাদেশের জেনোসাইড দীর্ঘ সময় ধরে ছিল একটি ‘ফরগটেন জেনোসাইড’।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক স্কলার গ্যারি জে বাস ১৯৭১ নিয়ে তাঁর যুগান্তকারী বইয়ের শিরোনাম দিয়েছিলেন দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম: নিক্সন, কিসিঞ্জার অ্যান্ড আ ফরগটেন জেনোসাইড

এর কারণ, হলোকাস্ট কিংবা বসনিয়া ও রুয়ান্ডার জেনোসাইডের তুলনায় বাংলাদেশের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং এই জেনোসাইড নিয়ে একাডেমিক মনোযোগের অভাব, যা অনেকখানি সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাসজুড়ে নানা পেশার বুদ্ধিজীবী নিধনের ফলে।

এ ছাড়া বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের মনস্তত্ত্বে ভীতির সঞ্চার করে, যা একটি জাতির ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে যায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, জেনোসাইড মানে নিছক মানুষ হত্যা নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

তাই এই প্রক্রিয়ার অন্যতম কৌশল হলো, দক্ষ পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে তাঁদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও হত্যা করা এবং এর প্রভাব বাংলাদেশ জেনোসাইডসহ অন্য সব জেনোসাইডেই নানাভাবে প্রতীয়মান।

তাই কেন এই নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীকে বারবার টার্গেট করা হয়, তার কারণ বিশ্লেষণ করা ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা নির্ণয় করা ভীষণ জরুরি, যা ভবিষ্যতে একই ধরনের বুদ্ধিজীবী নির্মূলকাঠামো রোধে আগাম সতর্কতা হিসেবে কাজ করবে।

  • উম্মে ওয়ারা সহযোগী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
  • উম্মে ওয়ারা Contributor image

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর