কক্সবাংলা ডটকম(১৮ জানুয়ারি) :: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত পাল্টা শুল্ক কমাতে দরকষাকষিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, তুলাসহ বেশকিছু পণ্য আমদানি হয়েছে। এলএনজি, উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশসহ আরো নানা পণ্য আমদানির বিষয়ে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। যদিও প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বিদায়ী বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বাড়েনি। উল্টো বছরটিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি আরো বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্য বলছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রথম ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৯৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। বিপরীতে একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ৮১৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি হয়েছে। সে হিসাবে গত বছর অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার। যেখানে ২০২৪ সালের পুরো বছর শেষে এ বাণিজ্য ঘাটতি ৬০৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল। এর আগে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৬০২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেবল পণ্য আমদানি বাড়ালেই হবে না, সেসব পণ্যের হিসাব যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এসব কেনাকাটায় অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি থাকছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম কেনার ক্ষেত্রে চুক্তি হয়েছে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির সঙ্গে। তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানির মাধ্যমে আমদানীকৃত পণ্য যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য হিসেবে পরিসংখ্যানে স্থান পায়, সেটি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
অবশ্য বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যে পরিসংখ্যান দেখানো হচ্ছে সেটা পঞ্জিকাবর্ষের (ক্যালেন্ডার ইয়ার)। আর আমরা যেভাবে ম্যাপিং করি সেটা অর্থবছর (ফাইন্যান্সিয়াল ইয়ার)। আমাদের বিশ্লেষণে দেখছি, আমরা বাণিজ্য আলোচনায় সম্পৃক্ত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি কমছে। ঘাটতি কমিয়ে আমরা বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়াতে চাচ্ছি। আশা করছি, প্রতিযোগী দেশের তুলনায় আমরা যদি প্রেফারেন্সিয়াল মার্কেট অ্যাকসেস পাই, তাহলে আমাদের বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়বে। এর মাধ্যমে উভয় দেশের বাণিজ্যের যে ঘাটতি সেটি কমবে। আর আমরা উভয় দেশই এটি থেকে লাভবান হতে পারব।’
দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের পণ্য আমদানিতে উচ্চ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে, সেসব দেশের ওপর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয়। বিশ্বের ৫৭টি দেশের ওপর বসানো হয় বিভিন্ন হারে বাড়তি পাল্টা শুল্ক। শুরুতে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক ছিল ৩৭ শতাংশ।
এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে দরকষাকষি শেষে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। তবে শুল্ক হ্রাসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরফে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টি সামনে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য আমদানি করে তার চেয়ে অনেক বেশি সে দেশে রফতানি হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত আর যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বাণিজ্য ঘাটতি হিসেবে দেখা হয়। এ ঘাটতি কমিয়ে আনার শর্ত পূরণের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরওয়ারি প্রতিযোগিতামূলক দামে সাত লাখ টন গম আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ প্রক্রিয়ায় পাঁচ বছরে ৩৫ লাখ টন গম আমদানির কথাও জানানো হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গত বছর প্রায় দুই লাখ টন গম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে তুলা, ভুট্টা, সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য।
তবে এসব পণ্য আমদানির পরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি বলে যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর তথ্যে উঠে এসেছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে ৮১৩ কোটি ২৪ লাখ ডলারের পণ্য। সে হিসাবে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৬১৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
এর আগের বছর তথা ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২২৯ কোটি ৫২ লাখ ডলারের পণ্য রফতানি করেছিল। আর ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ৮৩৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি যে হারে বেড়েছে, একই হারে রফতানি বাড়েনি। এ কারণেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি না কমে উল্টো আরো বেড়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক আবারো বেড়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা রয়েছে কিনা জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ন্ত দেখালেও এটা আগামীতে বাড়বে বলে মনে হয় না।
কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমছে। বিপরীতে আমাদের আমদানি বাড়বে। আমদানির জন্য দেশটির সঙ্গে যে চুক্তিগুলো হয়েছে, সেগুলো এখনো বাস্তবায়নে যায়নি। সরকার ছাড়াও বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির জন্য চুক্তি করেছে। চুক্তিভুক্ত পণ্যগুলো এখনো বাংলাদেশে পৌঁছেনি।
এছাড়া পোশাক রফতানিকারকরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে নেয়া উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে এ বাণিজ্য ঘাটতি কমে আসবে। তবে এটি দৃশ্যমান হতে আরো পাঁচ-ছয় মাস সময় লাগতে পারে।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট আমদানি ব্যয়ের বড় একটি অংশই এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস, এলপিজি, পুরনো লোহার টুকরো (রড তৈরির প্রধান কাঁচামাল), ক্লিংকার (সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল), অপরিশোধিত সয়াবিন তেল, সার, অপরিশোধিত চিনি, তুলা (বস্ত্র খাতের কাঁচামাল), গম, পাম তেল, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের দখলে। এসব পণ্য আমদানির সবচেয়ে বড় বাজার হলো চীন।
চীন থেকে বাংলাদেশ শিল্প-কারখানার যন্ত্র, কেমিক্যাল, বস্ত্র খাতের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্র আমদানি করে। আবার পোশাক তৈরির বেশির ভাগ কাঁচামালও আসে এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি থেকে। যদিও আমদানির বিপরীতে চীনে নামমাত্র পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। ফলে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সর্বোচ্চ।
বর্তমানে দেশের মোট পণ্য রফতানির মাত্র ১ শতাংশের কিছুটা বেশি যায় চীনে। প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে গত বছর খাদ্যশস্য, মসলা, তুলা, মোটরযান, চিনিজাতীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানি হয়েছে বেশি। ইন্দোনেশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি এসেছে পাম অয়েল। দেশটি থেকে বিভিন্ন ধরনের মসলা ও টায়ারও আমদানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে ইস্পাতের কাঁচামাল, খনিজ জ্বালানি, তেলবীজ, তুলা ও বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য। আমদানির এ তালিকায় এখন গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো খাদ্যপণ্য যুক্ত হয়েছে। আর কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানি হলেও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় পরিসরে জ্বালানিটি আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে প্রতিবেশী ভারত ও চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার অনেক বেশি। এ কারণে শুল্ক বাড়লেও গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে ইউরোপের বাজারে আমাদের পণ্য রফতানি কমে গেছে।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও রাতারাতি এ বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়া সম্ভব হবে না। আশা করছি, সরকার ও বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেবে। এক্ষেত্রে উভয় দেশই উপকৃত হবে।’














