মুকুল কান্তি দাশ,চকরিয়া :: কক্সবাজারের চকরিয়ার সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের পাহারায় ক্ষত-বিক্ষত করা হচ্ছে ফসলি জমি ও ছড়াখাল।
দিন-রাতি উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাং এলাকায় ছড়াখালের তলদেশ, ছড়ার দুই তীর ধসিয়ে এবং বালুকাময় ফসলি জমিতে শক্তিশালী অসংখ্য শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার বসিয়ে অবাধে চলছে বালু উত্তোলনের মহোৎসব। তবুও কুম্ভকর্ণেও ভুমিকায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসন।
এতে শত শত একর ফসলি জমি বিরানভূমিতে পরিণত হওয়া ছাড়াও হারবাং ছড়াখালের দুই তীরও অবশিষ্ট থাকছে না।
এই অবস্থায় মাত্র ৫০ ফুট প্রস্থের ছড়াখালটি বর্তমানে কোথাও কোথাও ২০০ ফুট প্রস্থে রূপান্তর করে ফেলা হয়েছে। এমনকি বালুদস্যু সিন্ডিকেটের থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মানুষের বালুকাময় ফসলি জমিও।
সরজমিন দেখা গেছে, উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকায় ভয়াবহ এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ড চলছে গত একমাস ধরে। শুধুমাত্র ইছাছড়ি এলাকায় হারবাং ছড়ার তলদেশ, দুই তীর ও বালুকাময় ফসলি জমিতে বসানো হয়েছে অন্তত সাত থেকে আটটি শক্তিশালী শ্যালোমেশিন ও ড্রেজার।
দিনরাত সমানে ভূ-গর্ভের বালু তোলায় নিয়োজিত রয়েছে অর্ধ শতাধিক শ্রমিক। এতে মানুষের ফসলি জমি, হারবাং ছড়ার তলদেশ ও দুই তীরকে ক্ষত-বিক্ষত করে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক পরিবেশসচেতন একাধিক ব্যক্তিরা জানান, যারা এই পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন তারা এলাকায় বেশ প্রভাবশালী।
তাদের দলে রয়েছে চিহ্নিত ও দাগি অপরাধীরাও। তাই এদের কর্মকান্ডে বাঁধা দেওয়া তো দূরে থাক, তাদের ক্ষমতার দাপটের কাছে অসহায় মানুষের মুখ খোলারও সাহস নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ফসলি জমির একাধিক মালিক জানান, উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি নামক এলাকায় তাদের সাড়ে তিন একর ফসলি জমি রয়েছে।
যে জমিতে ফসল ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন প্রতিবছর।
কিন্তু অতিসম্প্রতি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী নাজিম উদ্দিন ও তার চার ভাইসহ বালুদস্যু সিন্ডিকেট গায়ের জোরে ফসলি জমিতে সড়ক তৈরি এবং সেখানে শক্তিশালী শ্যালোমেশিন বসিয়ে ভূ-গর্ভের বালু তুলে বিক্রি করছে। তাদের এসব কর্মকান্ডে বাঁধা দিতে গেলে মার খেয়ে চলে আসতে হয়েছে।
তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া যাচ্ছে না।
ভুক্তভোগী এই জমি মালিকের ভাষ্য হচ্ছে, বালুদস্যু নাজিম উদ্দিনের এমন প্রভাব রয়েছে যে এলাকায়, তার পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে টু-শব্দ করারও সাহস নেই কারোরই।
সেখানে তার বিরুদ্ধে কোথাও অভিযোগ করা মানে স-পরিবারে এলাকাছাড়া হওয়া। তাই এমন অবস্থার সম্মুখিন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এলাকার সচেতন লোকজনও ভয়ে মুখ খুলেন না।
উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকার বাসিন্দা এবং বর্তমানে চট্টগ্রামে একটি প্রাইভেট কম্পানিতে চাকরিরত মোহাম্মদ আলম বলেন, ‘আমার বাড়ি ইছাছড়ি এলাকায় হলেও সেখানে বসবাসের উপযোগী নয় বর্তমানে। কারণ বালু তোলার জন্য বসানো শ্যালোমেশিন ও ড্রেজারের বিকট আওয়াজ দিন-রাত সমানে চলছে।
এমনকি উত্তোলিত বালু পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত অসংখ্য ডাম্পার গাড়ির আওয়াজ এবং ধুলোময় পরিবেশের কারণে সেখানে বসবাস করা দূরহ হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় এলাকা ছেড়ে স-পরিবারে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছি।’
উত্তর হারবাংয়ে বালুদস্যু সিন্ডিকেটের মধ্যে যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বহু অপকর্মের হোতা বালুদস্যু নাজিম উদ্দিন এবং তার চার ভাই। এছাড়াও তার এসব পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ডের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা হিসেবে নাম উঠে এসেছে আবদুল খালেক পুতু, জসীম উদ্দিন, খানে আলম, মাহবুব, শহীদ উল্লেখযোগ্য।
মূলত শক্তিশালী এই বালুদস্যু সিন্ডিকেট পুরো উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি, কোরবানিয়া ঘোনা, ভান্ডারির ঢেবা, লালব্রিজ এলাকায় পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে চলেছেন।
কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কোন ধরণের আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী দ্বারা পাহারা বসিয়ে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কর্মকান্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী জমির মালিক, রাজনীতি ও পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের।
পার্বত্য অববাহিকার হারবাং ছড়ার ইছাছড়ি এলাকায় ছড়া খাল, দুই তীর ও ফসলি জমি থেকে অবৈধভাবে বালু তোলার স্থানটি সরকারি একনম্বর খাসখতিয়ানভুক্ত বলে নিশ্চিত করেছেন হারবাং ইউনিয়ন ভূমি-কর্মকর্তা (তহসিলদার) মো. মনসুর আলম।
তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসন থেকে দুইটি বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। তবে তা নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে বিদ্যমান।
তবে উত্তর ইছাছড়ি নামক স্থান থেকে পরিবেশের বারোটা বাজিয়ে যেভাবে বালু তোলা হচ্ছে তা ইজারার আওতাভুক্ত নয়। সরজমিন পরিদর্শনপূর্বক সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করা হবে।’
এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব বলেন, ‘চলমান পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে গত কয়েকদিন ধরে এখানে-ওখানে অভিযান পরিচালনা করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অবৈধভাবে বালু তোলায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকায়ও সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে।’
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘সরজমিন পরিদর্শনের পর পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো.আঃ মান্নান বলেন, ‘উত্তর হারবাংয়ের ইছাছড়ি এলাকায় যে এভাবে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে তা অবগত ছিলাম না। যারা এই কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এজন্য চকরিয়ার ইউএনওকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।














