কক্সবাংলা ডটকম :: ‘মিলা নেহি কুছ ভি পল ভর মেঁ, এক দৌর ইসি মেঁ বিতা হ্যায়, বাদল বহুত সমেটে হ্যায় হামনে, তব দরিয়া বননা শিখা হ্যায়’ (এক মুহূর্তে কিছুই পাওয়া যায় না, জীবনের একটা বড় সময় কেটে যায় লড়াইয়ে।
অনেক ঝড়-ঝাপটা পেরিয়েই নদী হতে শেখা যায়)— এই লাইনটি কবি সন্দীপ দ্বিবেদীর (Sandeep Dwivedi) বই থেকে নেওয়া, আর সেটাই হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস রেখেছেন মুকুল চৌধুরির (Mukul Choudhary) বাবা দলিপ চৌধুরি (Dalip Choudhary)। তিনি দাবি করেছেন, ‘এই লাইনটা আমাদের বাবা-ছেলের জীবনের গল্প বলে।’
ছোটবেলা থেকেই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন মুকুল। বাবার বাড়ি বিক্রি করা, ভালো ক্রিকেট অ্যাকাডেমি খুঁজে না পাওয়া, ঋণের চাপ— সব মিলিয়ে পথটা একেবারেই সহজ ছিল না। এমন কী তাঁর বাবা জেলেও গিয়েছিলেন। কিন্তু এত কিছুর পরও থামেননি তাঁরা।
চোখের জল থেকে প্রতিশ্রুতি, তার পর ঘুরে দাঁড়ানো
সানরাইজার্স হায়দরাবাদের (SRH) বিরুদ্ধে ম্যাচে মুকুল ছন্দ খুঁজে পাননি। সেই ম্যাচে অধিনায়ক ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant) দলকে জেতান। কিন্তু ম্যাচের পর হোটেলে ফিরে আবেগ সামলাতে পারেননি মুকুল। ভিডিয়ো কলে তাঁর লাল চোখ দেখে বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘কেঁদেছিলি?’— তিনি হেসে মাথা নাড়েন। দলিপ বলেন, ‘ও খুব হতাশ ছিল। বলছিল, এত টাকা দিয়ে দল ওকে নিয়েছে, কিন্তু ও ম্যাচ জেতাতে পারছে না। তখনই আমাকে কথা দেয়, পরের ম্যাচে সবার মুখ উজ্জ্বল করবে। আর ও সেটাই করে দেখিয়েছে।’
বাবার ত্যাগ আর সংগ্রামের গল্প
রাজস্থানের ঝুনঝুনুর (Jhunjhunu) মতো ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা মুকুলের পিছনে বাবার ত্যাগ ছিল অসীম। দলিপ চৌধুরি নিজের বাড়ি বিক্রি করে দেন ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই চাইতাম ছেলে ক্রিকেটার হোক। এত মানুষ পারে, আমার ছেলে কেন পারবে না?’ আর্থিক সমস্যার জন্য তাঁকে ব্যবসায় নামতে হয়, ঋণ নিতে হয়, এমন কী জেলেও যেতে হয়। আত্মীয়রা তাঁকে পাগল বলেছিলেন। কিন্তু তিনি হার মানেননি। বরং সেই কথাগুলোই তাঁকে আরও শক্ত করে দেয়।
IPL-এ নায়ক হয়ে ওঠার গল্প
২০২৫-২৬ ঘরোয়া মরশুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে নজরে আসেন মুকুল। সেই সুবাদেই সুযোগ পান IPL-এ। লখনৌ সুপার জায়ান্টস (LSG) নিলামে তাঁকে ২.৬ কোটিতে কিনে নেয়। এবং সুযোগ পেয়েই নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করেন। কলকাতায় ম্যাচ জয়ী ইনিংসের পর মুকুল বলেন, ‘এই পারফরম্যান্স আমি আমার বাবাকে উৎসর্গ করছি, যিনি আমার জন্মের আগেই ঠিক করেছিলেন আমি ক্রিকেটার হব।’
নিজের আইডল মহেন্দ্র সিং ধোনির (MS Dhoni) কথাও উল্লেখ করেছেন মুকুল। বলেন, ‘আমি সব সময় দেখেছি ধোনি কী ভাবে ম্যাচ শেষ করে। এমন বলেও ছক্কা মারতে পারে, যেটা দেখে বোলারও অবাক হয়।’
বৃহস্পতিবার ইডেন গার্ডেন্সের (Eden Gardens) আলো ঝলমলে মঞ্চে যেন এক স্বপ্নের গল্প লিখলেন মুকুল। কলকাতা নাইট রাইডার্সের (KKR) বিরুদ্ধে মাত্র ২৭ বলে অপরাজিত ৫৪ রান— ৭টি ছক্কা আর ২টি চার, প্রতিটি শটেই ছিল আত্মবিশ্বাস আর জয়ের ঘোষণা। কিন্তু এই ইনিংস শুধু রানসংখ্যা নয়, এটা ছিল বহু বছরের লড়াই, ত্যাগ আর অদম্য বিশ্বাসের প্রতিফলন। প্রতিটি ছক্কা যেন বলছিল তাঁর সংগ্রামের কথা, প্রতিটি চার যেন ছুঁয়ে যাচ্ছিল সেই পথ, যেখানে হাল না ছেড়ে এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। মুকুল শুধু ম্যাচ জেতাননি, তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন— দু’চোখে স্বপ্ন নিয়ে পরিশ্রম করলে, সাফল্য একদিন ঠিক দরজায় কড়া নাড়বেই।















