কক্সবাংলা ডটকম :: আন্তর্জাতিক ফুটবলে একবারও নরওয়েকে হারাতে পারেনি ব্রাজ়িল। চারবারের সাক্ষাতে অপরাজিত ছিল নরওয়ে। রবিবার রাতে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নামার আগে ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে চর্চা চলছিল, সেই ছবি বদলাবে কি না।
তবে কাঁটা হয়ে দাঁড়ালেন আর্লিং হাল্যান্ড। নিউ জার্সিতে জোড়া গোল করে ব্রাজ়িলের স্বপ্নভঙ্গ করলেন তিনি। নরওয়ের বিরুদ্ধে ১-২ গোলে হেরে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ থেকে বিদায় নিল ব্রাজ়িল।
দেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছল নরওয়ে। শেষ বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল নেইমারের। পরিবর্ত হিসেবে নেমে গোল করেও দলকে জেতাতে পারলেন না তিনি। ১৯৯০ সালের পরে এই প্রথম শেষ আটে যাওয়ার আগেই ছিটকে গেল ব্রাজ়িল।
ম্যাচের শুরু থেকে আক্রমণ শানায় দুই দল। তিন মিনিটের মাথায় গোল করেও ফেলেছিল নরওয়ে। কিন্তু অফসাইডের জন্য বাতিল হয় প্যাট্রিক বার্গের গোল। ১০ মিনিটের মাথায় সুবর্ণ সুযোগ মিস করে ব্রাজ়িল। মাথিউস কুনহাকে বক্সে ফাউল করে বসেন নরওয়ের ডিফেন্ডার আজের। প্রথমে পেনাল্টি না দিলেও পরে VAR চেক করে সিদ্ধান্ত বদল করেন রেফারি। কিন্তু পেনাল্টি থেকে ব্রুনো গিমারায়েসের দুর্বল শট বাঁচিয়ে দেন নরওয়ের গোলকিপার নাইল্যান্ড। তার খেসারত পরে দিতে হয় ব্রাজ়িলকে
সেই শুরু। তার পরে একাধিক নিশ্চিত গোল বাঁচিয়ে নরওয়েকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন তিনি। ভিনিসিয়াস, রায়ান, কুনহাদের সব চেষ্টা আটকে যায় নাইল্যান্ডের কাছে। উল্টোদিকে একের পর এক আক্রমণ শানান মার্টিন ওডেগার্ড, নুসারা। প্রথমার্ধ শেষের ঠিক আগে আলিসন একটি নিশ্চিত গোল থেকে বঞ্চিত করেন ওডেগার্ডকে।
দ্বিতীয়ার্ধে হাল্যান্ডের দাপট
গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে সেকেন্ড হাফে এন্দ্রিককে নামান ব্রাজ়িলের কোচ কার্লো আন্সেলোত্তি। ৬৮ মিনিটে মাঠে নামেন নেইমার। তবে সব আলো কেড়ে নেন আর্লিং হাল্যান্ড। প্রথমার্ধে কিছুটা শান্ত ছিলেন তিনি। তবে চেনা ছন্দে ফেরেন দ্বিতীয়ার্ধে।
৭৯ মিনিটের মাথায় লিড নেয় নরওয়ে। বাঁ প্রান্ত থেকে সেলেকাওদের বক্সে ক্রস রাখেন শেলডেরাপ। মার্কার গাব্রিয়েলকে টপকে দুরন্ত হেডে গোল করেন হাল্যান্ড। ক্লাব ফুটবলে ম্যান সিটি বনাম আর্সেনাল ডুয়েলের স্মৃতি ফেরালেন হাল্যান্ড। দেশের জার্সিতেও গাব্রিয়েলকে টেক্কা দিলেন সিটির স্ট্রাইকার হাল্যান্ড।
সেখানেই থামেননি তিনি। ৯০ মিনিটের মাথায় ব্রাজ়িলের কামব্যাকের আশায় জল ঢেলে দেন তিনি। ফের শেলডেরাপের থেকে বল পান হাল্যান্ড। বক্সের বাইরে ঠান্ডা মাথায় বল নিয়ন্ত্রণে আনেন। বুলেটের মতো শটে জাল কাঁপান সেখান থেকে। শরীর ছুঁড়ে দিয়েও বলের নাগাল পাননি সেলেকাওদের গোলকিপার আলিসন। চলতি বিশ্বকাপে সাত নম্বর গোলটি করে ফেললেন হাল্যান্ড।
পেনাল্টি থেকে গোল নেইমারের
১০ মিনিট ইনজুরি টাইম দেন রেফারি। গোল শোধের মরিয়া চেষ্টা চালায় ব্রাজ়িল। কিন্তু গোলের নীচে দুর্ভেদ্য ছিলেন নরওয়ের গোলকিপার নাইল্যান্ড। একের পর এক নজরকাড়া সেভ দেন তিনি। শেষ বাঁশি বাজার এক মিনিট আগে বক্সে ব্রাজ়িলের প্লেয়ারকে ফাউল করেন নরওয়ের ওস্টিগার্ড। স্পটকিক থেকে সান্ত্বনাসূচক গোল করেন নেইমার। ব্রাজ়িলের জার্সিতে ৮০ নম্বর গোলটি করে ফেলেন তিনি।
তবে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। শেষের বাঁশি বাজিয়ে দেন রেফারি। ১-২ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় কার্লো আন্সেলোত্তির ব্রাজ়িল। কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজ়িলের ফুটবলাররা। অন্য দিকে ‘ভাইকিং রো’ সেলিব্রেশনে মাতেন নরওয়ের গোটা টিম ও কোচিং স্টাফরা।

বিশ্বকাপে স্বপ্নভঙ্গ, চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেইমারের
১৬ বছর আগে মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁর। ব্রাজ়িলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছিল এই মাঠেই। রবিবার রাতে যেন সম্পূর্ণ হলো একটা বৃত্ত। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল পথচলা, সেখানেই ইতি টানলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেন ব্রাজ়িলের তারকা ফুটবলার নেইমার। বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের বিরুদ্ধে হেরে ব্রাজ়িল ছিটকে যেতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন নেইমার। ম্যাচ শেষে ঘোষণা করেন অবসরের। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পরে নেইমারের এই ঘোষণায় আরও ভেঙে পড়েছেন ব্রাজ়িল ভক্তরা।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর ঘোষণা নেইমারের
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক চেষ্টা করেছি। নিজের সেরাটা উজাড় করে দিয়েছি। কিন্তু এ বার সব শেষ। এখানেই যাত্রা শুরু করেছিলাম আমি। এখানেই শেষ করলাম।’ ১৬ বছরের কেরিয়ার শেষ হলো হার দিয়ে। ছিটকে যাওয়ার যন্ত্রণা দিয়ে। চোখের জলে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন তিনি।
ফুটবল ইতিহাসে একটা যুগের যেন অবসান ঘটল রবিবার। চোটসমস্যা, ফর্মের ওঠাপড়া, মাঠের বাইরের একাধিক বিতর্ক পেরিয়েও নেইমার স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বকাপে খেলার। সেই সুযোগ দেন কার্লো আন্সেলোত্তি। তবে শেষটা হলো সবচেয়ে বেদনাদায়কভাবে।
শেষ বিশ্বকাপে কেমন খেললেন নেইমার?
৩৪ বছর বয়সি নেইমার তারকা নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেললেন মাত্র ৩৭ মিনিট। চোট নিয়েই বিশ্বকাপে এসেছিলেন তিনি। খেলতে পারেননি গ্রুপপর্বের প্রথম ফুই ম্যাচে। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামেন পরিবর্ত হিসেবে। জাপানের বিরুদ্ধে সুযোগ পাননি। তবে নরওয়ের বিপক্ষে তাঁর উপরে ভরসা রাখেন আন্সলোত্তি।
পরিবর্ত হিসেবে নেমে গোল করেন। সেটিই হয়ে থাকল ব্রাজ়িলের জার্সিতে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক গোল। তবে এই গোল যথেষ্ট ছিল না দলকে জেতানোর জন্য। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজ়িল ছিটকে যায় বিশ্বকাপ থেকে।
ব্রাজ়িলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা
জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের পরিসংখ্যান অসাধারণ। ১৩০ ম্যাচ খেলে ৮০টি গোল করেছেন নেইমার। রয়েছে চারটি হ্যাটট্রিকও। ব্রাজ়িলের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। ২০১০ সালে অভিষেক হয় জাতীয় দলের জার্সিতে। খেলেছেন চারটি বিশ্বকাপ।
সাফল্য বলতে ২০১২ সালের অলিম্পিক্সে রুপো এবং ২০১৬ সালের অলিম্পিক্সে সোনা জিতেছেন। ২০১৩ সালে জিতেছিলেন কনফেডারেশন্স কাপ। তবে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল। ব্রাজ়িল ফুটবলের ইতিহাসে ট্র্যাজিক হিরো এবং সবার অন্যতম প্রিয় ফুটবলার হিসেবে নেইমারের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।














