বিশেষ প্রতিবেদক :: টানা কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে কক্সবাজারের সঙ্গে ঢাকা-চট্রগ্রামের রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ অতীতে ভয়াবহ বন্যার সময়ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল।
এ অবস্থায় রেলপথের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, বিশেষ করে ব্যালাস্ট (পাথর) সংকট এবং সংস্কারকাজের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানায়, শুধু বৃষ্টির পানি নয়, মূল সমস্যা হলো রেললাইনে প্রয়োজনীয় ব্যালাস্টের ঘাটতি। চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথের বিভিন্ন অংশে পর্যাপ্ত পাথর না থাকায় লাইন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও সামান্য পাথর দিয়ে মাটি ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যা নিরাপদ রেল চলাচলের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে লোকোমাস্টাররা ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে অনীহা প্রকাশ করছেন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যালাস্টের প্রধান কাজ হলো ট্রেনের ভার স্লিপারের মাধ্যমে সমানভাবে মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়া, কম্পন ও ধাক্কা শোষণ করা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। এছাড়া এটি রেললাইনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এবং আগাছা জন্মানো রোধ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত ব্যালাস্ট না থাকলে রেললাইন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ষোলশহর-দোহাজারী রেললাইন সংস্কারে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। দুর্বল অবকাঠামোর কারণে চালকরা নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চালাতে পারছেন না, ফলে দীর্ঘদিন ধরেই যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ছিল। সর্বশেষ জলাবদ্ধতার কারণে গত মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
রেলওয়ের তথ্যমতে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর পর ঢাকা-কক্সবাজার দ্রুতগতির ট্রেনের সঙ্গে সমন্বয় করতে ২০২৩ সালের শেষার্ধে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ষোলশহর-দোহাজারী রেলপথ সংস্কার করা হয়। সংস্কারের পর এ লাইনের অনুমোদিত গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। এর আগে একই রুটে প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও এক দফা সংস্কার করা হয়েছিল। তবে দুই দফা সংস্কারের পরও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি কমিয়ে ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্টেশন মাস্টার ও লোকোমাস্টার জানান, দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রাম-ষোলশহর এবং ষোলশহর-দোহাজারী অংশে ট্রেন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছিল না। বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে বর্তমানে ট্রেন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের অভিযোগ, প্রকৌশল বিভাগের ত্রুটি এবং নিম্নমানের সংস্কারকাজের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, রেলওয়েতে প্রতিবছর সংস্কারকাজের নামে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে না। বরং ট্রেনের গতি কমছে এবং ঝুঁকি বাড়ছে। পাথর বসানো ও সংস্কারকাজে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. তানভিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ট্রেন চলাচল সচল রাখার স্বার্থে সংস্কারকাজ করা হয়েছিল। ঠিকাদার যথাযথভাবে কাজ না করায় তাকে জরিমানা করা হয়েছে এবং কাজ বাতিল করা হয়েছে। পরে রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সেখানে পুনরায় সংস্কার ও নতুন ব্যালাস্ট বসানো হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ওই লাইনে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি ব্যালাস্ট রয়েছে, যেখানে মানদণ্ড অনুযায়ী অন্তত ১০ ইঞ্চি থাকা প্রয়োজন। তবে ব্যালাস্টের স্বাভাবিক স্তর ধরে রাখা সবসময় সম্ভব হয় না।
অতীতে বন্যার সময় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও এখন কেন বন্ধ—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই লাইনে চলাচলকারী ট্রেন সর্বোচ্চ ছয় ইঞ্চি পানির মধ্যে চলতে সক্ষম। কিন্তু বর্তমানে কিছু স্থানে পানি জমেছে প্রায় আড়াই ফুট। ফলে পানি কমে ছয় ইঞ্চির নিচে না নামা পর্যন্ত ট্রেন চালানো সম্ভব নয়।
প্রধান প্রকৌশলী আরও জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত ৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমান লাইনের পাশ দিয়ে প্রায় পাঁচ ফুট উঁচুতে নতুন লাইন নির্মাণ করা হবে, যাতে অতিভারী বর্ষণ বা জলাবদ্ধতার কারণে রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন না হয়। ইতোমধ্যে প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বর্তমান সংকটের জন্য তিনি গত চার দশকের মধ্যে সাম্প্রতিক দুই দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণকে দায়ী করেন। তার মতে, নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ায় বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকছে, যার প্রভাব রেল যোগাযোগের ওপরও পড়ছে।














