কক্সবাংলা ডটকম(২৬ জুলাই) :: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যক্তি শ্রেণীর কোটি টাকার বেশি আমানতধারী হিসাব বা মাল্টিমিলিয়নেয়ার অ্যাকাউন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা ব্যক্তিগত হিসাবের সংখ্যা ৩৩ হাজার ৬২৯ থেকে বেড়ে ৪০ হাজার ৬৪৫-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র দেড় বছরে এমন হিসাব বেড়েছে ৭ হাজার ১৬টি, যা প্রবৃদ্ধির হিসাবে প্রায় ২১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যক্তি শ্রেণীর কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাব ছিল ৩৩ হাজার ৬২৯টি। চলতি বছরের মার্চ শেষে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৬৪৫টিতে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হয়।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতে পুনর্বিন্যাস, দুর্বল ব্যাংক থেকে আমানত স্থানান্তর এবং নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান—এসব কারণ কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং অর্থনৈতিক মন্দার প্রেক্ষাপটে এ ধরনের হিসাবের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন খাতে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নতুন কিছু গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাংক খাতেও পড়তে পারে।
এদিকে পুলিশের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ৫৭ শতাংশই ছিলেন নতুন মুখ, যাদের বিরুদ্ধে অতীতে এ ধরনের অপরাধের কোনো রেকর্ড ছিল না। বিশ্লেষকদের মতে, এ তথ্যও নতুন অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর উত্থানের ইঙ্গিত দেয়।
সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা সামনে আসে। ফলে অনেক গ্রাহক দুর্বল ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যাংকে স্থানান্তর করেন। এতে বড় অঙ্কের আমানত হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এনবিআর, দুদকসহ বিভিন্ন সংস্থার নজরদারি বৃদ্ধির কারণে অনেকেই বাসায় নগদ অর্থ না রেখে ব্যাংকে জমা রাখতে আগ্রহী হয়েছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নতুন গোষ্ঠীর হাতে যাওয়াও এ প্রবণতার কারণ হতে পারে।
তবে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিসংখ্যান ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ব্যাংকের বাইরে প্রচলিত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৩ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকায়। ফলে ঘরে থাকা অর্থ ব্যাপকভাবে ব্যাংকে জমা হয়েছে—এমন ধারণা পুরোপুরি সমর্থন পায় না।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কোটি টাকার বেশি আমানতধারী হিসাবগুলোতে মোট জমা ছিল ৮৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে ৯১ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হলে নতুন কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত হন এবং ব্যাংকে বড় অঙ্কের অর্থ জমা রাখেন। ফলে কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধির পেছনে এ কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, একাধিক ব্যাংকের দুর্বলতা প্রকাশ্যে আসার পর আমানতকারীরা নিরাপদ মনে করা ব্যাংকগুলোতে অর্থ স্থানান্তর করেছেন। এর ফলেও বড় অঙ্কের হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অনিয়ম রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোটি টাকার হিসাব বৃদ্ধির পেছনে যদি অবৈধ বা অপ্রদর্শিত অর্থের সংশ্লিষ্টতা থাকে, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য সঠিক হয়ে থাকলে বিষয়টি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও তদন্তের দাবি রাখে। তিনি এ বিষয়ে প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান পরিচালনার আহ্বান জানান।














