কক্সবাংলা ডটকম(৮ আগস্ট) :: আজকের আফগানিস্তান একসময় মধ্য এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। প্রায় দুই হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৌদ্ধবিহার, স্তূপ ও ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।
তবে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দীর রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তান থেকে বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এর পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তন, বাণিজ্যপথের রূপান্তর এবং ইসলামের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানের কিছু অঞ্চল মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রভাবাধীন হওয়ার সময় বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটে। সম্রাট অশোকের (শাসনকাল আনুমানিক ২৬৮–২৩২ খ্রিস্টপূর্ব) সময় বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়।
কান্দাহার অঞ্চলে পাওয়া গ্রিক ও আরামাইক ভাষার অশোকীয় শিলালিপি প্রমাণ করে যে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতেই এই অঞ্চলে মৌর্য প্রশাসন ও অশোকের ধর্মীয় নীতির প্রভাব ছিল।
পরবর্তী সময়ে গ্রিক-ব্যাক্ট্রিয়ান ও বিশেষ করে কুষাণ সাম্রাজ্যের আমলে আফগানিস্তান বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের সময় বৌদ্ধধর্ম মধ্য এশিয়া ও চীনের দিকে বিস্তারের ক্ষেত্রে এ অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ভারতীয় উপমহাদেশ, মধ্য এশিয়া ও চীনের সংযোগকারী প্রাচীন সিল্ক রোডের ওপর অবস্থানের কারণে আফগানিস্তান হয়ে ওঠে বৌদ্ধ ভিক্ষু, ব্যবসায়ী ও তীর্থযাত্রীদের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
কান্দাহার, হাদ্দা, বাগ্রাম, জালালাবাদ ও বামিয়ানসহ বিভিন্ন এলাকায় বৌদ্ধ স্থাপত্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বামিয়ান উপত্যকা ছিল একটি বড় বৌদ্ধ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, বামিয়ানে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে গড়ে ওঠা বহু বৌদ্ধ মঠ, গুহা, উপাসনাকক্ষ ও ধর্মীয় স্থাপনার নিদর্শন রয়েছে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতেও সেখানে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের বিকাশ অব্যাহত ছিল।
বামিয়ানের সবচেয়ে বিখ্যাত নিদর্শন ছিল পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা দুটি বিশালাকৃতির বুদ্ধমূর্তি। মূর্তি দুটির উচ্চতা ছিল যথাক্রমে প্রায় ৫৫ মিটার ও ৩৮ মিটার। এগুলো ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে নির্মিত বলে ধারণা করা হয় এবং প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে মধ্য এশিয়ার বৌদ্ধ শিল্পের অনন্য নিদর্শন হিসেবে টিকে ছিল। বামিয়ান উপত্যকার শিল্পে ভারতীয়, গ্রিক, রোমান, ইরানি ও মধ্য এশীয় সাংস্কৃতিক প্রভাবের সমন্বয় দেখা যায়।
তাহলে আফগানিস্তান থেকে বৌদ্ধধর্ম হারিয়ে গেল কেন?
এর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সপ্তম শতাব্দী থেকে এই অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার। আরব মুসলিম শাসনের সম্প্রসারণের পর ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তিত হতে থাকে। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে ইসলাম এ অঞ্চলের প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। তবে এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে ঘটেনি; বহু শতাব্দী ধরে বৌদ্ধ, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি ইসলামের উপস্থিতি ছিল।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তনও বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। বৌদ্ধবিহার ও মঠগুলো সাধারণত রাজা, স্থানীয় শাসক, ব্যবসায়ী ও ধনী ব্যক্তিদের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও ধর্মীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পৃষ্ঠপোষকতা কমতে থাকে। ফলে অনেক বৌদ্ধবিহার ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয় এবং বৌদ্ধ ভিক্ষু ও অনুসারীদের সংখ্যা কমে যায়।
এ ছাড়া সিল্ক রোডের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনও বৌদ্ধ কেন্দ্রগুলোর গুরুত্ব কমিয়ে দেয়। মধ্য এশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভারতের সংযোগকারী পুরোনো বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভর করে যে বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইসলামের বিস্তার, নতুন শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা কমে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্মিলিত প্রভাবে আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্ম ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে। কয়েক শতাব্দী ধরে চলা এই পরিবর্তনের পর মধ্যযুগে এসে আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্ম আর উল্লেখযোগ্য জনধর্ম হিসেবে টিকে থাকেনি। অর্থাৎ, ইতিহাসের বিচারে এটিকে কোনো একক যুদ্ধ, শাসক বা ঘটনার মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের আকস্মিক বিলুপ্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
তবে বৌদ্ধধর্মের অনুসারীরা হারিয়ে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম আফগানিস্তানের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে। বামিয়ান উপত্যকা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। UNESCO-এর মতে, বামিয়ান ছিল সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ কেন্দ্র এবং সেখানে শত শত বৌদ্ধ গুহা, মঠ ও ধর্মীয় নিদর্শনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
এই ঐতিহ্যের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ২০০১ সালের মার্চে। তৎকালীন তালেবান শাসনের নির্দেশে বামিয়ানের দুই বিশাল বুদ্ধমূর্তি ধ্বংস করা হয়। UNESCO এই ধ্বংসকে আফগানিস্তানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ইচ্ছাকৃত ও গুরুতর আঘাত হিসেবে নিন্দা করে। মূর্তিগুলো ধ্বংস হলেও তাদের বিশাল গুহা ও কুলুঙ্গি, আশপাশের বৌদ্ধ গুহা, দেয়ালচিত্র এবং অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এখনও বামিয়ানের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
ফলে আফগানিস্তানে বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসকে শুধু ‘ধ্বংসের ইতিহাস’ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। একসময় এই ভূখণ্ড ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম, মধ্য এশীয় সংস্কৃতি ও সিল্ক রোডের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সেতু ছিল। আজ সেখানে সক্রিয় বৌদ্ধ সম্প্রদায় প্রায় অনুপস্থিত হলেও বামিয়ান, হাদ্দা, বাগ্রাম ও অন্যান্য প্রত্নস্থানে ছড়িয়ে থাকা নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে—আফগানিস্তানের অতীত ইতিহাসে বৌদ্ধধর্মের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।













