কক্সবাংলা ডটকম(২৭ আগস্ট) :: যুক্তরাষ্ট্রে নতুন জীবন, জীবিকা কিংবা উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমানো অন্তত আটজন বাংলাদেশি গত ১৬ মাসে মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক ও পেনসিলভানিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় কেউ কর্মস্থলে হামলার শিকার হয়েছেন, কেউ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন, আবার কেউ হয়েছেন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার। একই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও সহিংসতার ঘটনাতেও বাংলাদেশিদের প্রাণহানি ঘটেছে।
নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদন, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য এবং বাংলাদেশি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এসব প্রাণহানির ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার সবকটিই বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ হামলা—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং পারিবারিক বিরোধ, সশস্ত্র হামলা, কর্মস্থলে সহিংসতা, ডাকাতি ও অন্যান্য অপরাধের পৃথক ঘটনায় প্রাণ গেছে বাংলাদেশিদের। তবে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এই ধারাবাহিক মৃত্যুর শুরু ২০২৫ সালের মে মাসে ফ্লোরিডায়। ওই মাসে মাউন্ট ডোরায় ৪৪ বছর বয়সী মনিকা ইসলামের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশি তদন্তে পারিবারিক ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি সামনে আসে। এ ঘটনায় তার ভাশুর শাহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ফ্লোরিডার প্রসিকিউটররা শাহিদুলের বিরুদ্ধে প্রথম-ডিগ্রি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ আনেন এবং তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার কথা জানান।
এরপর নিউইয়র্কে ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা। ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই ম্যানহাটনের ৩৪৫ পার্ক অ্যাভিনিউয়ের একটি ভবনে বন্দুকধারীর হামলায় নিহত হন নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম। ৩৬ বছর বয়সী দিদারুল মূলত মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বাসিন্দা ছিলেন এবং প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে এনওয়াইপিডিতে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সময় তিনি পুলিশের নিয়মিত দায়িত্বে ছিলেন না; ভবনটিতে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন। বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হওয়ার সময় তিনি দুই সন্তানের বাবা ছিলেন এবং তার স্ত্রী আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে এনওয়াইপিডি ও নিউইয়র্কের কর্মকর্তারা তাকে ‘হিরো’ হিসেবে স্মরণ করেন।
২০২৬ সালের মার্চে নিউইয়র্কেই প্রাণ হারান ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নিশাত জান্নাত। কুইন্সের উডসাইড এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি আবর্জনাবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। নিশাত সিটি কলেজ অব নিউইয়র্কের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং পাশাপাশি একটি পার্কিং গ্যারেজে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। রাতের বেলায় কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনা আবারও নিউইয়র্কে বাংলাদেশি তরুণদের কর্মজীবন ও নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে আনে।
এর কয়েক দিন পর নিউইয়র্কের লাউডনভিলে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের বাবা-ছেলেসহ তিন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৬০ বছর বয়সী মো. হেরামন, তার ৩০ বছর বয়সী ছেলে নাজমুল রোবেল এবং রোবেলের বন্ধু ২৭ বছর বয়সী ফাহিম আলীম। দুর্ঘটনায় অন্য গাড়িতে থাকা একজন মার্কিন নারীও নিহত হন। পরিবারটির স্বজনেরা জানান, নতুন কেনা বাড়ি দেখাতে আত্মীয়দের নিয়ে বের হওয়ার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
ফ্লোরিডায় ২০২৬ সালের এপ্রিলের ঘটনা ছিল আরও নির্মম। ফোর্ট মায়ার্সের একটি কনভিনিয়েন্স স্টোরে কর্মরত বাংলাদেশি নারী নিলুফা ইয়াসমিন ওরফে নিলুফা এসমিনকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বিভিন্ন মার্কিন ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার বয়স ৪২ থেকে ৫১ বছরের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে; তিনি লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা এবং দুই কন্যার মা ছিলেন। হামলার আগে এক ব্যক্তি তার গাড়ির কাচ হাতুড়ি দিয়ে ভাঙছিল। তিনি বিষয়টি জানতে বাইরে বের হলে তাকে মাথায় একাধিকবার আঘাত করা হয়। পরে পুলিশ রলবার্ট জোয়াচিন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। মামলায় প্রসিকিউটররা পরবর্তীতে পূর্বপরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার কথা জানান।
ফ্লোরিডাতেই একই মাসে ঘটে বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড, যা যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করে। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ১৬ এপ্রিল ২০২৬ নিখোঁজ হন। পরে লিমনের মরদেহ উদ্ধার এবং বৃষ্টির মরদেহ শনাক্ত করা হয়। দুজনই উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত ছিলেন। তদন্তে তাদের সাবেক রুমমেট হিশাম আবুগারবিয়াহর বিরুদ্ধে দুজনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। তার বিরুদ্ধে দুইটি ফার্স্ট-ডিগ্রি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার মামলা হয়েছে।
লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতিমালা বিষয়ে এবং বৃষ্টি কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন। লিমনের মরদেহ ২৫ এপ্রিল উদ্ধার করা হয়; বৃষ্টির মরদেহ পরে ফ্লোরিডার একটি জলাভূমি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশ সরকারও এ হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানায়। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিয়ামির কনস্যুলেট যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। পরে ইউএসএফ দুই শিক্ষার্থীকে মরণোত্তর ডক্টরেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় প্রাণ হারান ৪৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি মো. মাহফুজুল হক। তিনি খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করতেন। কিংসেসিং এলাকায় ডেলিভারি দেওয়ার সময় তাকে খুব কাছ থেকে মাথার পেছনে গুলি করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে তার গাড়ি ও ডোরড্যাশের খাবার বহনের ব্যাগ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বা লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করেন এবং তিন মুখোশধারী সন্দেহভাজনের কথা জানান। তখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। মাহফুজুল স্ত্রী ও ১৪ বছর বয়সী এক সন্তান রেখে গেছেন।
আর সর্বশেষ আগস্টে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে একটি রেস্তোরাঁয় গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশি প্রবাসী ইউসুফ রাজু। একই ঘটনায় রাসেল নামে আরেক বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পুলিশ জানিয়েছে, ৪৪ বছর বয়সী রাজুর মাথায় এবং ৩৯ বছর বয়সী রাসেলের পায়ে গুলি লাগে। ঘটনাটি ঘটে ব্রুকলিনের রকাওয়ে অ্যাভিনিউয়ের একটি রেস্তোরাঁয়। পুলিশ বলছে, হামলাকারী রেস্তোরাঁর বিল পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল; তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ ও হামলাকারীদের পরিচয় নিয়ে তদন্ত চলছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর আরও কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনার ধরন এক নয়—কোথাও অপরাধ, কোথাও দুর্ঘটনা, আবার কোথাও কর্মস্থলে সহিংসতা। ফলে শুধু হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে প্রবাসী কমিউনিটির জন্য কর্মস্থল, রাতের যাতায়াত, ডেলিভারি পেশা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে রেস্তোরাঁ, গ্যাস স্টেশন, ডেলিভারি, পরিবহন, খুচরা ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সেবামূলক পেশায় যুক্ত। অনেকেই অতিরিক্ত সময় কাজ করেন এবং রাত-বিরাতে কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরেন। ফলে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পুলিশের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বা সংঘবদ্ধ সহিংসতার কোনো সামগ্রিক প্রবণতা তৈরি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং পৃথক পৃথক অপরাধ ও দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন এসব বাংলাদেশি। তারপরও প্রিয়জনকে উন্নত জীবন, উচ্চশিক্ষা কিংবা অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার আশায় হাজার মাইল দূরে পাঠানো পরিবারগুলোর কাছে প্রতিটি মৃত্যু হয়ে উঠছে একেকটি অপূরণীয় শোক।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমেরিকান ড্রিম’ পূরণের আশায় যাওয়া এসব মানুষের অনেকের স্বপ্ন ছিল পরিবারকে স্বচ্ছল করা, উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফেরা কিংবা নতুন প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ তৈরি করা। কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় তাদের কারও সেই স্বপ্ন আর পূর্ণ হয়নি। একের পর এক এমন মৃত্যুর ঘটনা তাই শুধু কয়েকটি পরিবারের শোকের গল্প নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ এবং প্রবাসজীবনের ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে ভাবার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।














