কক্সবাংলা ডটকম(২৫ সেপ্টেম্বর) :: বাংলাদেশে দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাব নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ‘দ্য রোহিঙ্গা ক্রাইসিস: আ রিনিউড কল ফর আ ডিউরেবল সল্যুশন ফ্রম প্রোট্র্যাক্টেড ডিসপ্লেসমেন্ট, উইথ জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তিনি এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফার মূল বিষয় হলো—রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরি; মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ এবং তাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; বিচার ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং মাদক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রস্তাবগুলোতে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হিসেবে উঠে এসেছে রোহিঙ্গা সংকটের সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান, সীমিত সুযোগ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে মানবপাচার, মাদকপাচার, চোরাচালান এবং সমুদ্রপথে অনিরাপদ যাত্রার মতো ঝুঁকি বাড়ছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, একটি দেশের অমীমাংসিত সংকট ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে পরিণত হতে পারে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফার বড় অংশই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের আগের বিভিন্ন সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক চাপ, মানবিক সহায়তা এবং মিয়ানমারে অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা, রোহিঙ্গাদের অধিকার এবং জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দিয়ে একাধিক প্রস্তাব তুলে ধরে।
জাতিসংঘের ২০২৫-২৬ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানেও রোহিঙ্গাদের দ্রুত, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে শরণার্থী সুরক্ষা, জীবনরক্ষাকারী সহায়তা, আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলাকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু আগের উদ্যোগগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে বাস্তবায়ন পর্যায়ে। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক দমন-পীড়নের পর প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে ১৯৭০ ও ১৯৯০-এর দশকেও বিভিন্ন দফায় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল।
২০১৭ সালের ব্যাপক প্রত্যাবাসনের আলোচনা, দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ এবং একাধিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারেনি। ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ লাখের বেশি হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে এসেছে।
সংকটের দীর্ঘায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাংলাদেশের ওপর মানবিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও কর্মসংস্থান, বাজারব্যবস্থা, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে। ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘ ও অংশীদাররা ৯৩৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চেয়েছিল। ২০২৬ সালের সংশোধিত পরিকল্পনায় সেই চাহিদা কমে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে—যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। এই অর্থ দিয়ে কক্সবাজার, ভাসানচর এবং আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন মেটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, ২০২৬ সালের ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদনের মধ্যে খাদ্যের জন্য ২৪৭.৩ মিলিয়ন, আশ্রয়ের জন্য ১২৮ মিলিয়ন, পানি-স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির জন্য ৬১.২ মিলিয়ন, শিক্ষার জন্য ৫২.৭ মিলিয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবার জন্য ৪৯.৯ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। জাতিসংঘ বলছে, এই অর্থায়ন মূলত জীবনরক্ষাকারী ন্যূনতম সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা সংকটের আরেকটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে। রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অস্থিতিশীল। বিভিন্ন পক্ষের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি বলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ দফার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ কীভাবে তৈরি হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ কতটা কার্যকর হবে।
বিশেষ করে শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত সংস্থা এবং মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে কীভাবে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জবাবদিহির বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক বিচার ও তদন্ত ব্যবস্থাকে অব্যাহত সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতসহ অন্যান্য বিচারিক ও তদন্ত ব্যবস্থার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন। গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের শুধু ত্রাণনির্ভর জনগোষ্ঠী হিসেবে না দেখে প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি হিসেবেও শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৬ হাজার শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের মিয়ানমার কারিকুলামভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে তারা নিজ দেশে ফিরে পুনঃএকত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের কাছে তাই নতুন পাঁচ দফার মূল প্রশ্ন প্রস্তাবের সংখ্যা নয়, বরং এর বাস্তবায়ন কাঠামো। অতীতে প্রত্যাবাসন নিয়ে একাধিক রোডম্যাপ, সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি। এবার আন্তর্জাতিক চাপ, বিচার ও জবাবদিহি, মানবিক অর্থায়ন এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ তৈরির বিষয়গুলো একই কাঠামোর মধ্যে কতটা সমন্বিত করা যায়, সেটিই সংকট সমাধানের বড় পরীক্ষা।
এদিকে জাতিসংঘ ও মানবিক সংস্থাগুলোও বলছে, মিয়ানমারে নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। ২০২৬ সালের মানবিক পরিকল্পনাতেও নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে তারেক রহমানের পাঁচ দফা প্রস্তাবকে ঘিরে এখন আন্তর্জাতিক মহলের সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব তৈরি হয়েছে—একদিকে রোহিঙ্গাদের জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে সংকটের মূল উৎস মিয়ানমারে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও বিচারিক বাস্তবতার পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করা। দীর্ঘ নয় বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু নতুন প্রস্তাব বা প্রতিশ্রুতি নয়, সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর আন্তর্জাতিক সমন্বয়, চাপ ও জবাবদিহির কাঠামোই রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।














