কক্সবাংলা ডটকম(২৮ সেপ্টেম্বর) :: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে নজরদারি জোরদার করেছে সরকার।
জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়ার যৌক্তিকতা রয়েছে এবং কোথায় বাজার পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া হচ্ছে—তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বাজার পর্যালোচনা ও তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ নজরে রয়েছে গবাদিপশুর খাদ্য, সয়াবিন মিল, ভুট্টা, গম, গমের ভুসি, শস্যভিত্তিক খাদ্য ও তরল দুধের বাজার।
২১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশের বাজারে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এসব জ্বালানির দাম ছিল যথাক্রমে ১১৫, ১৩৫, ১৪০ ও ১৪৫ টাকা।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিবহন, সেচ, কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয়ে পড়তে পারে। এর ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন করে মূল্যচাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাবের বাইরে কোনো পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা চিহ্নিত করতেই বাজার পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি), বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাজারের তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য সমন্বয় বাস্তবসম্মত কি না, তা যাচাইয়ে উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করা হবে।
একই সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার, কাঁচামালের মূল্য ও জ্বালানি ব্যয়ের পরিবর্তনের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হবে।
বাজার পরিস্থিতি বুঝতে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজও শুরু করেছে বিটিটিসি। বিশেষ করে দুধের বাজারে উৎপাদন পর্যায় থেকে ভোক্তাপর্যায় পর্যন্ত দামের পার্থক্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
কৃষকের কাছ থেকে কী দামে কাঁচা দুধ সংগ্রহ করা হচ্ছে, পরিবহন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কত ব্যয় হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকে কী দামে প্যাকেটজাত দুধ কিনতে হচ্ছে—এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত মূল্য সংযোজনের কোনো পর্যায় রয়েছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তরল দুধের বাজারে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁচা দুধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত দুধ বিক্রির হিসাবও নজরদারির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গবাদিপশুর খাদ্য, ভুট্টা, সয়াবিন মিল, গম ও গমের ভুসির মতো উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট উপকরণের দাম বাড়ার পেছনে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের প্রভাব কতটা, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এদিকে ডিমসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি নিয়েও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের সঙ্গে আলোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার যৌক্তিক প্রভাব বাজারদরে পড়তে পারে। তবে প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অতিরিক্ত মূল্য আরোপ করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন সরকারি নজরদারির অন্যতম বিষয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু খুচরা বাজারে পণ্যের দাম পর্যবেক্ষণ করলেই মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা—পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে। কোথায় ব্যয় বাড়ছে এবং কোথায় অস্বাভাবিকভাবে মূল্য সংযোজন হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা গেলে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সহজ হবে।
এর মধ্যেই দেশে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে, আগস্টে দেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে পণ্যের দাম কমে গেছে—এমনটি বোঝায় না। বরং আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। ফলে জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতির ওপর কীভাবে পড়ে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পণ্য উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে সেচ, পণ্য পরিবহন ও বিভিন্ন উৎপাদন কার্যক্রমের ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেই ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য সমন্বয় এবং তার বাইরে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি—এই দুই বিষয়কে আলাদাভাবে দেখা প্রয়োজন।
এ কারণে সরকারের চলমান বাজার পর্যালোচনায় উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যয় ও ভোক্তাপর্যায়ের দামের মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের প্রকৃত প্রভাব নিরূপণের পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।














