বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘কনে বাজার’: বিয়ের মঞ্চে কন্যার মূল্য নির্ধারণ

🗓 মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ৮৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

👁️ ৮৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(২৯ সেপ্টেম্বর) :: সন্তানের বিয়ে নিয়ে মা-বাবার চিন্তার শেষ নেই। কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে সেই উদ্বেগ যেন আরও বেশি। সমাজ যতই আধুনিক হোক, অনেক পরিবারেই মেয়ের বয়স ২০ পেরোলেই শুরু হয় ‘সুপাত্র’ খোঁজার তোড়জোড়।

আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, ঘটকের আনাগোনা কিংবা পরিচিতদের মাধ্যমে পাত্রের সন্ধান- সন্তানের জীবনসঙ্গী খোঁজার এই সংস্কৃতি পৃথিবীর বহু সমাজেই বহু পুরনো।

তবে বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী খোঁজার রীতিতে অঞ্চলভেদে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। কোথাও পরিবারই প্রধান ভূমিকা নেয়, কোথাও পাত্র-পাত্রী নিজেরাই সঙ্গী বেছে নেন।

আবার ইউরোপের একটি ছোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে এমন এক ঐতিহ্য রয়েছে, যাকে বাইরে থেকে দেখলে ‘কনে বাজার’ বলে মনে হতে পারে।

বুলগেরিয়ার স্তারা জাগোরা অঞ্চলের কালাইঝি রোমা সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্য বহু বছর ধরে চলে আসছে। ‘ব্রাইড মার্কেট’ বা ‘কনে বাজার’ নামে পরিচিত এই আয়োজন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বহু প্রতিবেদন হয়েছে।

তবে ‘মেয়েদের বাজারে বিক্রি করা হয়’ -এই বর্ণনাটি পুরো ছবিটিকে তুলে ধরে না।

গবেষণায় দেখা যায়, এটি মূলত একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক সমাবেশ, যেখানে তরুণ-তরুণীদের পরিচয় হয়, পরিবারগুলির মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সম্ভাব্য বিয়েকে কেন্দ্র করে আর্থিক দর-কষাকষিও হতে পারে।

শত বছরের পুরনো রীতি

কালাইঝি হলো বুলগেরিয়ার রোমা জনগোষ্ঠীর একটি উপগোষ্ঠী। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের সম্প্রদায়ের আকার প্রায় ১৮ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে থাকা এই জনগোষ্ঠীর কাছে বিয়ে শুধু পারিবারিক সম্পর্ক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

স্তারা জাগোরার কাছে মোগিলা গ্রামের মতো জায়গায় ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সমাবেশ বসে। বিশেষ করে অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের লেন্ট শুরুর প্রথম শনিবার সেন্ট তদোরের উৎসবের সঙ্গে এই আয়োজনের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে এই দিনটি ছিল ৮ মার্চ।

তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বছরে আয়োজনের সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে। পুরনো কিছু প্রতিবেদনে বছরে চার বার পর্যন্ত এমন সমাবেশের কথা বলা হয়েছে। আবার সাম্প্রতিক ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক প্রতিবেদনে সেন্ট তদোরের উৎসবের আয়োজনটিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সাজগোজের আড়ালে পাত্রের সন্ধান

এই দিনে অবিবাহিত তরুণীরা পরিবারের সঙ্গে সমাবেশে আসেন। তারা নিজেদের সেরা পোশাক, গয়না ও প্রসাধনীতে সাজেন। উঁচু হিল, নজরকাড়া পোশাক, মেকআপ এবং গয়না এই আয়োজনের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য দিকে তরুণ পুরুষেরাও সেখানে সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী খোঁজেন। দুই পক্ষের মধ্যে পছন্দ তৈরি হলে পরিবারের সদস্যরা পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ বাইরে থেকে যাকে ‘কনে কেনাবেচা’ মনে হতে পারে। বাস্তবে প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি জটিল। পরিচয়, পছন্দ, পারিবারিক সম্মতি এবং অর্থনৈতিক আলোচনার সমন্বয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত তৈরি হয়।

গবেষণাভিত্তিক সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়েছে যে, ‘কনে কেনা’ বা ‘কনে মার্কেট’ শব্দবন্ধটি আক্ষরিক অর্থে মানুষ কেনাবেচাকে বোঝায় না। বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক রীতি, যেখানে মেয়ের পরিবারকে অর্থ দেওয়ার প্রথা রয়েছে।

কেন অর্থের এত গুরুত্ব?

এই রীতির পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতারও ভূমিকা রয়েছে। কালাইঝি সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রান্তিকতার সঙ্গে লড়াই করছে। ঐতিহ্যগত পেশা হিসেবে ধাতুর কাজের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় বহু পরিবারের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ফলে বিয়ের সময় দুই পরিবারের আর্থিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিয়ের সময় মেয়ের পরিবার যে অর্থ পায়, সেটিকে বাইরে থেকে ‘মেয়ের দাম’ হিসেবে দেখা সহজ। কিন্তু সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যায় এই অর্থের সঙ্গে পারিবারিক ক্ষতিপূরণ, সামাজিক মর্যাদা এবং বংশগত সম্পর্কের মতো ধারণাও জড়িত।

২০২৩ সালের একটি গবেষণাকে উদ্ধৃত করে সাম্প্রতিক একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় মেয়ের পরিবার থেকে বিয়ের পর তার চলে যাওয়াকে আর্থিক ক্ষতি হিসেবে দেখা হয় এবং সেই প্রেক্ষাপটে অর্থ প্রদানের রীতিটি তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে পিছিয়ে মেয়েরা

কালাইঝি সম্প্রদায়ের সামাজিক রীতিনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলির একটি হলো মেয়েদের শিক্ষা। বুলগেরিয়ার রোমা জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক ভাবে শিক্ষার হার দেশটির অন্যান্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম।

বিশ্ব ব্যাঙ্কের গবেষণায় দেখা যায়, রোমা নারীরা শিক্ষায় বিশেষ ভাবে পিছিয়ে ছিল। ২০১১ সালের আঞ্চলিক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, বুলগেরিয়ার রোমা নারীদের গড় শিক্ষাজীবন ছিল প্রায় ছয় বছর, যেখানে অ-রোমা নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১১ বছর।

কুমারীত্ব ও সৌন্দর্যের সামাজিক মূল্য

কনে বাজার নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত আলোচনার জায়গা কুমারীত্ব। বিভিন্ন সংবাদপ্রতিবেদন ও প্রামাণ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ঐতিহ্যগত ভাবে বিয়ের আগে মেয়ের কুমারীত্বকে কালাইঝি সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। এর সঙ্গে পরিবারের সম্মান এবং বিয়ের সময় প্রদেয় অর্থের সম্পর্কও রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

মেয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্যও এই সামাজিক ব্যবস্থায় গুরুত্ব পায়। পোশাক, সাজসজ্জা ও গয়নার মাধ্যমে মেয়েদের আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে সোনার গয়না সামাজিক মর্যাদা এবং পারিবারিক সামর্থ্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার- এই রীতির প্রতিটি পরিবার বা প্রতিটি তরুণ-তরুণীর অভিজ্ঞতা এক নয়। পুরনো প্রতিবেদনে যেমন পরিবারের সিদ্ধান্তের গুরুত্বের কথা বলা হয়েছে, তেমনই কিছু তরুণীর নিজের পছন্দ, মতামত এবং ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে প্রত্যাশার কথাও উঠে এসেছে।

‘বাজার’ হলেও সেখানে টাকা হাতে হাতে বদলায় না

‘কনে বাজার’ শব্দটি শুনলে মনে হতে পারে, সেখানে মেয়েদের প্রকাশ্যে নিলাম হয় এবং টাকা দিয়ে তাদের কিনে নেওয়া হয়। বাস্তব চিত্রটি এতটা সরল নয়।

‘কনে বাজার’ মূলত পরিচয় ও সামাজিক যোগাযোগের জায়গা। কোনো তরুণ-তরুণীর মধ্যে সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি হলে পরবর্তী পর্যায়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ে ও অর্থ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অর্থাৎ ‘বাজারে দাঁড়িয়ে মেয়ের দাম ঘোষণা করে বিক্রি’-এমন চিত্রকে পুরো প্রথার নির্ভুল বর্ণনা বলা যায় না। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে।

বদলাচ্ছে প্রথা?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই- একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও কি একই ভাবে চলছে এই প্রথা?

উত্তরটি এক কথায় দেওয়া কঠিন। একদিকে ঐতিহ্যটি এখনও কালাইঝি পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত এবং সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার এটিকে নিজেদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অংশ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে শিক্ষা, প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নতুন প্রজন্মের জীবনযাত্রার পরিবর্তন পুরনো ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করছে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় তরুণদের মধ্যে ঐতিহ্য ও আধুনিক জীবনের আকাঙ্ক্ষার টানাপড়েনের কথা উঠে এসেছে।

তাই ‘কনে বাজারে মেয়েরা সবাই নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিক্রি হয়ে যান’-এমন সরলীকরণ যেমন সঠিক নয়, তেমনই ‘সবাই এই রীতিতে খুশি’ বলাও তথ্যনির্ভর হবে না। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, পরিবারের চাপ, আর্থিক বাস্তবতা এবং সামাজিক রীতি, সব মিলিয়েই তৈরি হয় এই জটিল ব্যবস্থা।

বুলগেরিয়ার এই ছোট্ট জনগোষ্ঠীর ‘কনে বাজার’ তাই নিছক বিচিত্র কোনো উৎসব নয়। এটি একই সঙ্গে সংস্কৃতি, দারিদ্র্য, পরিবার, বিয়ে, নারীর সামাজিক অবস্থান এবং প্রজন্মগত পরিবর্তনের একটি জটিল গল্প।

এই বিভাগ এর আরো খবর

জ্বালানি ভর্তুকি চায় না আইএমএফ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর