কক্সবাংলা ডটকম(২৪ ফেব্রুয়ারী) :: সম্প্রতি “কুড়িগ্রাম জেলাকে স্বাধীন দেশ ঘোষণা করলাম” এ ধরনের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বক্তব্যটি কুড়িগ্রাম-৪ আসনের জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান কর্তৃক প্রদত্ত বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক আলোচনার সীমায় সীমাবদ্ধ নয় বরং সরাসরি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, সার্বভৌমত্ব এবং আইনের শাসনের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত।
রাষ্ট্রের অখণ্ডতা, সংবিধানের সর্বোচ্চতা এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা এই তিনটি ধারণা আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি। এদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যে কোনো সাংবিধানিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু সেই অধিকার কোনোভাবেই রাষ্ট্রের অখণ্ডতা বা সংবিধানের মৌল কাঠামোকে অতিক্রম করতে পারে না। একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে তার সংবিধানিক শৃঙ্খলার ওপর।
তাই এ ধরনের বক্তব্যকে আবেগ দিয়ে নয়, আইন ও সংবিধানের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।বাংলাদেশ-এর সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭(১) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।। এর অর্থ হলো রাষ্ট্রের সকল আইন, নীতি, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক ঘোষণা সংবিধানের অধীন। কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠান সংবিধানের উপরে অবস্থান নিতে পারে না।
এই বিধান আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রের একটি মৌল নীতি। সংবিধানের সর্বোচ্চতা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রে আইনগত অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। জনপ্রতিনিধি হোন বা সাধারণ নাগরিক সবার বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে থাকতে হবে। যদি কোনো ঘোষণা সংবিধানের মৌল নীতির পরিপন্থী হয়, তবে তা আইনগতভাবে কার্যকর হতে পারে না। কারণ সংবিধান রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও আইনগত পরিচয়ের ভিত্তি নির্ধারণ করে।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪(১) অনুযায়ী বাংলাদেশের ভূখণ্ড অবিচ্ছেদ্য। এই বিধান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতাকে সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদান করে। এর মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে যে দেশের কোনো অংশ আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে না কোনো ব্যক্তিগত ঘোষণা বা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে। রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অখণ্ড থাকা মানে কেবল মানচিত্রে সীমারেখা নয়; এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের আইনি স্বীকৃতি। কোনো জেলা বা অঞ্চলকে স্বাধীন ঘোষণা করা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আইনগতভাবে এমন ঘোষণা কার্যকর নয়। এটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, এবং বিষয়টি যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মূল্যায়নের যোগ্য।
আন্তর্জাতিক আইনেও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা একটি স্বীকৃত নীতি। জাতিসংঘ সনদে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সম্মান করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় territorial integrity একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রসমূহের সীমারেখা ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য রক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণত কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের একতরফা বিচ্ছিন্ন ঘোষণাকে সমর্থন করে না, যদি না তা সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বা জনগণের গণতান্ত্রিক সম্মতির ভিত্তিতে ঘটে। তাই কোনো জেলার স্বাধীনতার ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সাধারণত সেই রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক আইন তখনই প্রাসঙ্গিক হয় যখন কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা আন্তর্জাতিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বর্তমান ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক পরিধির অন্তর্গত। আন্তর্জাতিক আইনেও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা একটি স্বীকৃত নীতি। জাতিসংঘ সনদে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডগত অখণ্ডতাকে সম্মান করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় territorial integrity একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রসমূহের সীমারেখা ও অভ্যন্তরীণ ঐক্য রক্ষা করা হয়। আন্তর্জাতিক আইন সাধারণত কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের একতরফা বিচ্ছিন্ন ঘোষণাকে সমর্থন করে না, যদি না তা সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বা জনগণের গণতান্ত্রিক সম্মতির ভিত্তিতে ঘটে। তাই কোনো জেলার স্বাধীনতার ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডেও স্বাভাবিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো সাধারণত সেই রাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। আন্তর্জাতিক আইন তখনই প্রাসঙ্গিক হয় যখন কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বা ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা আন্তর্জাতিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বর্তমান ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সাংবিধানিক পরিধির অন্তর্গত।
গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় নীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা করতে পারেন। এই স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। তবে আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক আইন উভয় ক্ষেত্রেই স্বীকৃত যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমাহীন নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা এবং অখণ্ডতা রক্ষার স্বার্থে যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যায়। অর্থাৎ স্বাধীনতা মানে দায়বদ্ধতা ছাড়া কথা বলা নয়। একটি বক্তব্য যদি রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে বা প্রভাব সৃষ্টি করার জন্য করা হয়, তবে তা আইনগত পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে। এখানে মূল প্রশ্ন হলো বক্তব্যটির প্রকৃতি কী? এটি কি রাজনৈতিক প্রতীকী বক্তব্য, নাকি বাস্তব বিভাজনের আহ্বান? এই মূল্যায়ন নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া উচিত।
জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন এবং তাদের বক্তব্যের একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রভাব থাকে। সংসদ সদস্যরা কেবল ব্যক্তি নন; তাঁরা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির অংশ। তাই তাঁদের বক্তব্যে দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। সাংবিধানিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাঁদের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্রবিরোধী ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলতে পারে। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে; কিন্তু সেই ভিন্নমত যেন সংবিধানিক সীমারেখার ভেতরে থাকে এটাই রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষার মূল শর্ত।
রাষ্ট্রের অখণ্ডতা প্রশ্নে দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা গণতন্ত্রেরই অংশ। গণতন্ত্র মানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন রাষ্ট্রের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে এটাই সাংবিধানিক ভারসাম্য। যেকোনো বিতর্কিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার বদলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত। যদি কোনো বক্তব্য আইন লঙ্ঘনের আওতায় পড়ে, তবে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত ও বিচারিক পদক্ষেপ নিতে পারে। আইনের শাসন মানে আবেগ নয়, প্রক্রিয়া। বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করবে বক্তব্যটি কেবল রাজনৈতিক মত ছিল, নাকি তা আইনগত সীমা অতিক্রম করেছে। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে। ন্যায়বিচার মানে একদিকে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা, অন্যদিকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ।
বাংলাদেশের ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত জনগণের সম্মিলিত চেষ্টায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল করে তুলেছে। রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় ভূখণ্ডের ঐক্য ছিল মূল ভিত্তি। তাই কোনো অংশকে বিচ্ছিন্ন করার ধারণা ঐতিহাসিকভাবে গভীর তাৎপর্য বহন করে। রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করা কেবল আইনগত দায়িত্ব নয়; এটি ঐতিহাসিক দায়ও।
গণতন্ত্রের শক্তি বিতর্কে নিহিত। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল না করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সংবিধানের প্রতি আনুগত্য। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক উভয়কে সংবিধানের সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। ্রাজনৈতিক বক্তৃতায় কখনো কখনো তীব্রতা থাকে। কিন্তু জনপ্রতিনিধির ভাষা রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা প্রশ্নে সংবেদনশীল ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজন। দায়িত্বশীল বক্তব্য গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। অপরিণামদর্শী বক্তব্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়া উচিত সংবিধানসম্মত উচ্চারণ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা।
গণতন্ত্র মানে মতের সংঘাত, কিন্তু রাষ্ট্রের কাঠামোর ভাঙন নয়। ভিন্নমত গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করে; তবে তা যদি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তবে তা গণতন্ত্রের সীমা অতিক্রম করে। আইনের শাসন নিশ্চিত করে যে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ ধরনের বক্তব্য জনমনে প্রশ্ন ও উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে আলোচনাকে অবশ্যই যুক্তি ও আইনের ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। উত্তেজনা নয়, সংযমই রাষ্ট্রীয় আলোচনার পথ হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক সমাজে বিতর্ক স্বাভাবিক; কিন্তু বিতর্ক যেন সংবিধানের কাঠামোকে অস্বীকার না করে।
সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের কোনো অঞ্চলকে একতরফাভাবে স্বাধীন ঘোষণা করা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন এবং ভূখণ্ড অবিচ্ছেদ্য বলে স্পষ্টভাবে নির্ধারিত। আন্তর্জাতিক আইনও রাষ্ট্রের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার নীতিকে সমর্থন করে। তবে যেকোনো বিতর্কের সমাধান আবেগ নয়, আইন। চূড়ান্ত মূল্যায়ন অবশ্যই সংবিধানিক ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংবিধানের সর্বোচ্চতার স্বীকৃতিতে নিহিত। রাষ্ট্র তখনই সুসংহত থাকে, যখন তার নাগরিক ও জনপ্রতিনিধিরা সংবিধানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেন। সংবিধানই রাষ্ট্রের ভিত্তি; সেই ভিত্তি অটুট রাখাই একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান কর্তব্য।
কালাম আজাদ: ইতিহাস গবেষক, কবি ও সাংবাদিক।













