রতন কান্তি দে,উখিয়া :: মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সার্বিক মানবিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও রাষ্ট্রদূতসহ ৮ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল।
এই সফরকে কেন্দ্র করে উখিয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পজুড়ে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
বিমানবন্দরে তাদের স্বাগত জানান স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত অ্যাম্বাসেডর সার্জিও গোর এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত অ্যাম্বাসেডর ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন সহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সিলর এরিক গেলান, বিশেষ দূতের সিনিয়র উপদেষ্টা চার্লস হর্টন ও চেস্টার ক্রোগার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা অফিসের সহকারী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ক্রিস ওসবোর্ন ও ইয়ান ডিক এবং সমন্বয়কারী কর্মকর্তা আহমদ হোসেন।
কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রতিনিধি দলটি সরাসরি উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌছায়।
প্রায় আড়াইটা থেকে উখিয়ার ৪ নম্বর ক্যাম্প, ক্যাম্প এক্সটেনশন, ৮-ডব্লিউ এবং ৬ নম্বর ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন এবং তাদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
পাশাপাশি ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিওর পরিচালিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও পর্যবেক্ষণ করেন তারা।

” এসব বার্তার মাধ্যমে তারা মিয়ানমারে নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করে স্বেচ্ছায় এবং নিরাপদ পরিবেশে প্রত্যাবাসনের দাবি জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সফরকে ঘিরে কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই রোহিঙ্গারা তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরেন এবং আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেন।

রোহিঙ্গা নেতা মো. জুবায়ের বলেন, বছরের পর বছর ধরে তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছেন।
তাদের একমাত্র প্রত্যাশা হলো নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নিয়ে নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, এজন্য রোহিঙ্গারা কৃতজ্ঞ। তবে কোনো মানুষই চিরকাল নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের আশ্রয়ে থাকতে চায় না।
তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে হবে।

ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি উখিয়া সদর দক্ষিণ স্টেশন এলাকায় অবস্থিত নর্থ এন্ড কফি হাউজে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ও চা-চক্রে অংশ নেন।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ধারাবাহিকতা, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা এবং ক্যাম্পের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।

এদিকে সার্জিও গোরের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের ১৪ সদস্যের মার্কিন প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক শেষে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান,অতীতের মত ভবিষ্যতেও রোহিঙ্গা সংকটে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সার্জিও গোর ।
এসময় তিনি বলেছেন, গত কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের সহায়তার পরিমান অনেক কমে এসেছে।
এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর আশার সঞ্চার করেছে।

অপরদিকে বিশেষ দূত রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর ঢাকায় ফিরে এক বার্তায় লিখেন- আমি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির, যেখানে ১০ লক্ষেরও বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে এই শিবিরে সহায়তা প্রদান করে আসছে এবং আমরা বিশ্বের অন্যান্য অংশীদারদেরও তাদের অবদান বাড়ানোর আহ্বান জানাই।”

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মার্কিন এই উচ্চপর্যায়ের সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশ সরকার।
সফরের পুরো সময়জুড়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েনসহ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
বিকেল প্রায় পাঁচ টার দিকে উক্ত প্রতিনিধি দলের গাড়ি বহর উখিয়া সদর ছেড়ে কক্সবাজারের উদ্যােশে রওনা হতে দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম এবং নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আরও জোরদার হবে।















