কক্সবাংলা ডটকম(৫ আগস্ট) :: ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসানের দুই বছর পূর্ণ হলেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ছয় মাস পার হলেও মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব ঘাটতি এবং কর্মসংস্থানের সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর একটি দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করা সহজ নয়।
স্বৈরশাসনের ফলে প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয়, আর্থিক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হয়, রাজনৈতিক বিভাজন গভীর হয় এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যা সৃষ্টি হয়। ফলে কেবল সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদ বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিতভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে এলেও তা এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ জ্বালানি সরবরাহে নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। এলএনজি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাসের ঘাটতি এবং শিল্পে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা দেশের উৎপাদন ও রপ্তানিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, সরকার মালয়েশিয়া ও মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিচ্ছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংক খাত ও রাজস্বে দুর্বলতা
অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে ব্যাংক খাতের সংকট। দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং কিছু ব্যাংকের তারল্য সংকট পুরো আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়েছে।
চলতি বছরের মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে। অন্যদিকে জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন।
রাজস্ব আহরণেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা উন্নয়ন ব্যয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা
উচ্চ সুদহার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও জিডিপির এক শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ১০ হাজার। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক দশকে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের মধ্যে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের।
এদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানিয়েছেন, গ্যাস সংকটের কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। গত দুই বছরে শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন।
ঋণের চাপ বাড়ছে
সরকারি ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালের জুনে সরকারের মোট ঋণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ২১ হাজার ৩৭ কোটি টাকায়। অর্থ বিভাগের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতেই অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।
পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল দেনা, ব্যাংক খাতের সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে তিনি শেয়ারবাজারসহ কয়েকটি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)সহ উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
কর প্রশাসন আধুনিকীকরণ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারকে আরও বাজারভিত্তিক করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।
সম্প্রতি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ঋণমানের পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’ থেকে ‘নেতিবাচক’-এ নামিয়ে এনেছে।
সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক খাতের ঝুঁকির কারণে আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি আরও মন্থর হতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের জন্য অতীতের অর্থ পাচার ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সামনের পথ কঠিন
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বা রাজস্ব বৃদ্ধি নয়; বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে সুশাসন, কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক সংস্কার ছাড়া এই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।














