শুক্রবার ১৪ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এজলাস ও জনবল সংকটে দেশের জেলা আদালত, ভোগান্তিতে বিচারপ্রার্থীরা

🗓 বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

👁️ ১৮ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(১৩ আগস্ট) :: ন্যায়বিচারের আশায় আদালত প্রাঙ্গণে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ-বৃষ্টিতে অপেক্ষা করছেন বিচারপ্রার্থীরা। আদালতের বারান্দায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

বসার জায়গা না পেয়ে কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ সিঁড়িতে, আবার কেউ খোলা মাঠে অপেক্ষা করছেন শুনানির জন্য। শুধু বিচারপ্রার্থীরাই নন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পৃথক এজলাস, বিচারক ও সহায়ক জনবলের সংকটে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে খোদ বিচারকদেরও।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের চিত্র বলছে, অবকাঠামোগত সংকট, বিচারকের শূন্যপদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘাটতি—এই তিন চাপে কার্যত হোঁচট খাচ্ছে জেলা পর্যায়ের বিচারব্যবস্থা।

কোথাও একাধিক বিচারককে একটি এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ চালাতে হচ্ছে, কোথাও পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে আদালতের কার্যক্রম। আবার কোনো কোনো আদালতে স্টেনোগ্রাফার না থাকায় দাপ্তরিক লেখালেখির কাজও করতে হচ্ছে বিচারকদের।

একদিকে মামলার পাহাড়, অন্যদিকে পর্যাপ্ত এজলাস ও জনবলের অভাব। ফলে অনেক আদালতে বিচারকদের পালা করে এজলাসে বসতে হচ্ছে। কোথাও নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা হলেও দেওয়া হয়নি পৃথক এজলাস, খাসকামরা কিংবা প্রয়োজনীয় সহায়ক জনবল।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিচারপ্রার্থীদের ওপর। বছরের পর বছর মামলা চললেও অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সময়ে বিচার পাচ্ছেন না।

প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। অধস্তন আদালতের অনেক ভবনও পুরোনো ও জরাজীর্ণ। ফলে মামলার চাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা।

খুলনায় মামলার পাহাড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র এজলাস সংকট। পর্যাপ্ত এজলাস না থাকায় বিচারকদের ভাগাভাগি করে বসতে হচ্ছে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ আদালত ভবনের কারণে বর্ষাকালে ১০ থেকে ১২টি এজলাসে পানি পড়ে। এতে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত বিচারকাজ।

আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় ৫৪টি আদালতের বিপরীতে বিচারক রয়েছেন ৫৩ জন। জেলা আদালতে এজলাসের ঘাটতি রয়েছে ১৩টির। এসব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। তীব্র এজলাস সংকটের কারণে কোনো কোনো আদালতে পাঁচ-ছয়জন বিচারককে মাত্র দুটি এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলা জজকোর্টে সম্প্রতি কয়েকটি নতুন আদালত সৃষ্টি করা হলেও সেগুলোতে এখনো বিচারকদের পূর্ণাঙ্গ পদায়ন হয়নি। বিদ্যমান আদালত ভবনে নতুন বিচারকদের জন্য পর্যাপ্ত খাসকামরা, এজলাস ও বসার ব্যবস্থা নেই। ভবনটির ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণেরও সুযোগ সীমিত।

এদিকে আদালতে প্রায় ১২০টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদ শূন্য রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৪ হাজার মামলা বিচারাধীন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ওই আদালতে কোনো বিচারক নেই। সাব-জজ ওয়ান ও টুতে বর্তমানে মোট আটটি আদালতের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র দুজন বিচারক।

রংপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পরিস্থিতিও সংকটাপন্ন। এখানে দুটি আদালতের নিজস্ব এজলাস নেই। নিজস্ব ভবন না থাকায় মহানগর দায়রা জজ আদালতের ৯টি আদালত ও ৬টি ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ভবনে।

এ ছাড়া পরিত্যক্ত ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ১১টি আদালতের কার্যক্রম চলছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ভবন ও এজলাস সংকটে বিঘ্নিত হচ্ছে বিচারিক পরিবেশ।

নিজস্ব এজলাস না থাকায় ভবন ভাড়া করে আদালতপাড়ার বাইরে শ্রম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। একইভাবে পরিত্যক্ত ভবনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তিনটি আদালত, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল, স্পেশাল জজ আদালত এবং সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ছয়টির বিচারিক কার্যক্রম চলছে।

জয়পুরহাট জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পর্যাপ্ত এজলাসকক্ষ না থাকায় নতুন বিচারকদের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গিয়ে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

আদালত সূত্র জানায়, জেলা ও দায়রা জজ এবং চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অনুমোদিত পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত বিচারক নেই। সম্প্রতি নতুন তিনটি বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারক পদায়ন করা হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পৃথক এজলাসকক্ষ এবং সহায়ক জনবল বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

ফলে নতুন আদালতগুলো আপাতত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের পঞ্চম তলার এজলাস ব্যবহার করে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

লালমনিরহাট আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন আদালতে ৩১ হাজার ৬৪৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারকের ৯টি পদের মধ্যে ৬টিই শূন্য। জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তিনটি পদও দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা।

লালমনিরহাট জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান বলেন, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য স্বতন্ত্র ভবন নেই। ছোট ছোট কক্ষে আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় এজলাসগুলোতে পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। ফলে আইনজীবীদের দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়।

তিনি আরও বলেন, ভিন্ন ভিন্ন মামলার আসামিদের অনেক সময় একই এজলাসে রাখতে হয়। আসামির সংখ্যা বেশি হলে আদালতকক্ষের বাইরে রেখেই হাজিরা নেওয়া হয়। নারী বিচারপ্রার্থীদের জন্য নিরাপদ বসার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শৌচাগার, নামাজের স্থান ও ব্রেস্টফিডিং কর্নারের মতো মৌলিক সুবিধাও নেই।

বরগুনায় নতুন প্রতিষ্ঠিত শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল, পারিবারিক আপিল ট্রাইব্যুনাল, ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল ও পারিবারিক আদালতের জন্য পৃথক এজলাস এবং বিচারকদের খাসকামরার ব্যবস্থা নেই।

ফলে একাধিক আদালতকে একই এজলাস ভাগাভাগি করে বিচারকার্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। একই আদালতকক্ষ দুজন বিচারক পালাক্রমে ব্যবহার করায় শুনানির সময়সূচি সমন্বয়েও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও রয়েছে তীব্র স্থান ও জনবল সংকট।

বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনগুলোতে বর্তমানে মোট ১৬টি এজলাস রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি অস্থায়ী সেমিপাকা ভবনে। বিচারকদের ১৭টি খাসকামরার মধ্যে পাঁচটিও অস্থায়ী স্থাপনায়। জনবল সংকট মোকাবিলায় নিরাপত্তাপ্রহরী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কোনো কোনো কাজ চালাতে হচ্ছে।

মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা। জমিজমা সংক্রান্ত ২০০৭ সালের একটি মামলাও ১৮ বছর পর এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন বলেন, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জন্য স্বতন্ত্র ভবন না থাকায় বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী—সবাইকে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল হাবীবুর রহমান বলেন, জেলা পর্যায়ের অধস্তন আদালতের নানামুখী সংকটের বিষয়ে তারা ওয়াকিবহাল। এবারের বাজেটে সরকার গত বছরের তুলনায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজ করতে না পারায় একদিকে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি হচ্ছে, অন্যদিকে বিচারকদের আমলনামা বা এসিআরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, যা তাদের চাকরিজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। এজলাস ভাগাভাগি করে ব্যবহারের কারণে দিনের দ্বিতীয়ার্ধে বিচারকার্যে পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকে না, যা সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে অন্তরায়।

রেজিস্ট্রার জেনারেল আরও জানান, অনেক জেলায় সিভিল জজদের স্টেনোগ্রাফার নেই। ফলে দাপ্তরিক লেখালেখির কাজও বিচারকদের নিজেদের করতে হচ্ছে। বর্তমানে ন্যূনতম সাড়ে ৩ হাজার বিচারক প্রয়োজন। এসব সংকটের বিষয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা রাজনৈতিক সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। শুধু বিচারক নিয়োগ করলেই হবে না, বিচারকদের কাজের উপযোগী পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে বিপুল জনসংখ্যার এই দেশের বিচারব্যবস্থা আরও পিছিয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারব্যবস্থার এই অবকাঠামোগত ও জনবল সংকট দ্রুত সমাধান করা না হলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আরও বাড়বে। দীর্ঘ হবে বিচারপ্রক্রিয়া, বাড়বে মামলার জট। আর বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে ঘুরতে থাকা বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার প্রহরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে।

ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু নতুন আদালত ও বিচারক নিয়োগ নয়, একই সঙ্গে পর্যাপ্ত এজলাস, বিচারকদের খাসকামরা, সহায়ক জনবল, আধুনিক আদালত ভবন এবং বিচারপ্রার্থীদের জন্য মৌলিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি কমানোর পরিবর্তে সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর