মোঃ রমজান আলী, মহেশখালী ::কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বা ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টস প্রাইভেট লিমিটেড প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করবে। কারিগরি অংশীদার হিসেবে যুক্ত থাকবে চীনের চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড।
প্রস্তাবিত প্রকল্পটি শুধু জাহাজ মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পর্যায়ক্রমে জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক প্রকৌশল, জাহাজের যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পকে একই অবকাঠামোর আওতায় এনে মাতারবাড়ীকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক শিল্পকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের অধীনে চলছে।
প্রকল্পের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ২০০ একর জমি ও বিদ্যমান স্থায়ী সম্পদের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে। বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তা রাষ্ট্রের মালিকানায় ফিরে আসবে। ফলে সরকারের ওপর সরাসরি ঋণের দায় না চাপিয়ে বেসরকারি মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের আওতায় দুটি বৃহৎ শুষ্ক ডক নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে প্রথম ডকের দৈর্ঘ্য হবে ৬০০ মিটার ও প্রস্থ ৯৫ মিটার। দ্বিতীয় ডকের দৈর্ঘ্য হবে ৪৬০ মিটার এবং প্রস্থ ৮৫ মিটার। ভবিষ্যতে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের চাহিদা বাড়লে তৃতীয় একটি শুষ্ক ডক নির্মাণের সুযোগও রাখা হচ্ছে।
শুষ্ক ডকের পাশাপাশি জাহাজ মেরামতের ঘাট, ভবিষ্যতে জাহাজ নির্মাণের ঘাট, জাহাজের কাঠামো ও যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা, পাইপ ও যান্ত্রিক কাজের কারখানা, বৈদ্যুতিক ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারখানা, গুদাম এবং ভারী যন্ত্রপাতি ওঠানো-নামানোর সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষায় আধুনিক সবুজ প্রযুক্তিও ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রথম ৬০০ মিটার দীর্ঘ ডকটি বড় আকারের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দ্বিতীয় ডক চালু হলে একই সময়ে একাধিক বড় জাহাজের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা তৈরি হবে। বর্তমানে বড় ধরনের মেরামতের জন্য বাংলাদেশের অনেক জাহাজকে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীনের মতো দেশে পাঠাতে হয়।
মাতারবাড়ীতে আন্তর্জাতিক মানের জাহাজ মেরামত সুবিধা চালু হলে বিদেশে জাহাজ পাঠানোর প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এতে মেরামতের সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ছাড়াও দেশের অন্যান্য বন্দর এবং বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী বড় বাণিজ্যিক জাহাজও এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
প্রস্তাবিত স্থাপনাটিকে বাংলাদেশের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক সবুজ জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে কম নিঃসরণকারী জ্বালানি ও শক্তি ব্যবস্থা, ব্যবহৃত পানি পুনঃপরিশোধন এবং বিপজ্জনক রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরাসরি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ জন দক্ষ প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীর কর্মসংস্থান হতে পারে। পাশাপাশি আরও প্রায় ২ হাজার ৬০০ জনের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে স্থানীয় প্রকৌশল, ইস্পাত উৎপাদন, পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি সামুদ্রিক ব্যবসার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
প্রস্তাবিত জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্রে বাণিজ্যিক জাহাজের পাশাপাশি বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের জাহাজও আন্তর্জাতিক মানের মেরামত সুবিধা পেতে পারে। এতে গুরুত্বপূর্ণ নৌযানের বড় ধরনের মেরামতের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন সামুদ্রিক প্রকৌশলী ও এআইএস মেরিন ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম।
মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকায় বন্দর, জ্বালানি, শিল্প ও পরিবহনকেন্দ্রিক যে বৃহৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠছে, তার সঙ্গে প্রস্তাবিত জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতকেন্দ্রের সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হতে পারে। গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজ নির্মাণ, মেরামত ও সামুদ্রিক প্রকৌশলসেবার চাহিদাও বাড়বে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মাতারবাড়ী শুধু গভীর সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক এলাকা হিসেবে নয়, ধীরে ধীরে জাহাজ নির্মাণ, মেরামত ও সামুদ্রিক প্রকৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের সামুদ্রিক শিল্পের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে প্রায় ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকার এই বৃহৎ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নিরপেক্ষ কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্বার্থে এত বড় বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা, পরিবেশগত প্রভাব, আর্থিক কাঠামো, বিনিয়োগের ঝুঁকি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল যথাযথভাবে যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।













