কক্সবাংলা ডটকম :: অর্থমূল্য বিবেচনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ মোট ৩৯ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছে। এর ৫০ শতাংশেরই গন্তব্য ছিল ইউরোপের ২৭টি দেশ।
গত বছরের আগস্টে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের পোশাক আমদানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয় ১৫ শতাংশের বেশি। কিন্তু এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ইউরোপে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি কমেছে।
সর্বশেষ জানুয়ারিতে কমেছে ২৫ শতাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকে ঘিরে ইউরোপে পোশাক রফতানির ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বরে ২০২৪ সালের নভেম্বরের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের পোশাক আমদানি কমে ১০ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
এরপর ডিসেম্বরে ১২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ কমে আমদানির অর্থমূল্য দাঁড়ায় ১৩৫ কোটি ৫৯ লাখ ইউরো। সর্বশেষ চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২০২৫ সালের জানুয়ারির তুলনায় আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ২৫ শতাংশ। অর্থমূল্য ছিল ১৪২ কোটি ৮৯ লাখ ইউরো।
রফতানিকারকরা বলছেন, দেশের প্রধান রফতানি বাজারগুলোতে পোশাকের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে কমছে। বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যা আগামী জুন পর্যন্ত অব্যাহত থাকার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি পোশাকের আমদানি মূল্য ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমেছে। আর আমদানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৩৬ এবং দাম হ্রাস পেয়েছে ৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
তবে আমি মনে করি, জানুয়ারির নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ইউরোপের যে মন্দা দেখা যাচ্ছে সেটা চলতি বছর মধ্যভাগের পর ঠিক হবে এমন আশা ছিল। আমাদের বিশ্লেষণ বলছিল এপ্রিলের পর থেকেই অর্ডার ও শিপমেন্টে গতি আসবে। পরবর্তী সময়ে যা আরো বৃদ্ধি পেয়ে বছর শেষে রফতানি স্বাভাবিক অবস্থায় যাবে। যদিও নতুন যুদ্ধের ফলে এখন কী হয় তা অনিশ্চিত।’
বিকেএমইএ ও বিজিএমইএর শীর্ষ নেতাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মূল্যস্ফীতির চাপে বিদেশী ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাকের বিক্রিতে। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল অভিমুখে জাহাজ চলাচলে সৃষ্ট জটিলতায় পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিকেএমইএ যেখানে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘসূত্রতা ও অর্ডার সংকটের কথা বলছে, বিজিএমইএ সেখানে আকাশপথে পণ্য পরিবহনে রুট পরিবর্তনের সমস্যার কথাও উল্লেখ করেছে। সব মিলিয়ে যুদ্ধের প্রভাবে সেলস লস এবং শিপমেন্টের অনিশ্চয়তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা।
রফতানি কমে যাওয়ার বিষয়ে যুদ্ধের আগে থেকেই বড় উদ্বেগ ছিল জানিয়ে বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এখন আশঙ্কা করছি রফতানি আরো কমে যাবে। আমাদের পণ্যের চূড়ান্ত ভোক্তা
পর্যায়ে এবং যারা ক্রেতা প্রতিষ্ঠান আছে তাদের সেলস কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কারণ মূল্যস্ফীতি হলে ক্রেতারা কেনাকাটা কমিয়ে দেন। এ প্রবণতার শুরুতে ক্রেতারা জামাকাপড় বা পোশাক কেনেন না। প্রথমে তাদের কনসার্ন থাকে খাদ্যসামগ্রী বা খাওয়া-দাওয়া নিয়ে। ফলে সেলস কমে যাবে।’
ইনামুল হক খান আরো বলেন, ‘আমাদের রফতানি সব ঠিক আছে। তবে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে রাউটিং করা যাচ্ছে না, ঘুরে যেতে হচ্ছে। সমুদ্রপথে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত সব ঠিক আছে। স্বাভাবিকভাবেই শিপমেন্ট হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত জাহাজ নিয়ে বড় কোনো ইস্যু আসেনি। ক্রেতাদের কাছ থেকেও শিপমেন্ট হোল্ড করতে হবে বা পণ্য এখন না পাঠানো—এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসেনি। বাংলাদেশের জাহাজ এখনো কোথাও আটকায়নি। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে রেড সি হয়ে সুয়েজ খাল দিয়ে পণ্য চলে যাচ্ছে। সেই পথে কোনো সমস্যা নেই।
ঈদের ছুটি শেষে কারখানা খোলার পর নতুন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কিনা সেটা বোঝা যাবে। কারণ যুদ্ধের অবস্থা খুবই খারাপ। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলার পর কী ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত তা বোঝা যাবে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘বড় বাজারগুলোতে রফতানি ধারাবাহিকভাবে কমছে। আগামী জুন পর্যন্ত অবস্থা এ রকমই থাকার সম্ভাবনা, এখন পর্যন্ত বাড়ার কোনো পূর্বাভাস আমাদের কাছে নেই।
যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে এটা আরো বেশি কমতে পারে। এরই মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নানামুখী সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি পুরোপুরি বন্ধ। ইউরোপে সুয়েজ খাল দিয়ে যে জাহাজগুলো যেত সেগুলো এখন আর সেখান দিয়ে যেতে পারছে না।
৮-১০ দিন অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে তাদেরকে কেপপয়েন্ট হয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে আটলান্টিক হয়ে যেতে হয়। এ পরিস্থিতিতে রফতানি আরো কমার আশঙ্কা আছে। একে তো অর্ডার কম, তারপর প্রাইস (দাম) কম। ফলে আমরা পর্যাপ্ত অর্ডার নিতে পারছি না।
ব্যাংকগুলো রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায় বিভিন্নভাবে অসহযোগিতা করছে, এমন অভিযোগ জানিয়ে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘অসহযোগিতা কমাতে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। অন্যথায় রফতানি আরো কমবে।’














