কক্সবাংলা ডটকম(২৪ মার্চ) :: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কর্মসূচির ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, কর্মসূচির বিপরীতে যেসব শর্ত রয়েছে, তা এগিয়ে নিচ্ছে সরকার; আগামী জুন মাসে ঋণের পরবর্তী কিস্তি পেতে চায় বাংলাদেশ।
ঈদের ছুটির পর প্রথম দিন মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন।
তার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন।
বৈঠকের আলোচনার বিষয় জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আইএমএফের সঙ্গে আমাদের এই কর্মসূচি তো বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। এটা আবার পরবর্তী মূল্যায়নেও যাবে, তাতে অসুবিধা নাই।
এই সময়ে অর্থনীতির যে অবস্থা, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য যে প্রোগ্রামগুলো আছে… এই সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে, সেগুলো আমরা আলাপ করেছি।
“এরকম একটা অবস্থা থেকে উত্তরণ করতে গেলে আমাদের অনেকগুলো সংস্কার দরকার, অনেক জটিল নিয়মকানুন শিথিল করা (ডিরেগুলেশন) দরকার।
ব্যাংকিং খাত তো অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় আছে, শেয়ারবাজার খুবই খারাপ অবস্থায় আছে। কর-জিডিপি অনুপাতও কঠিন অবস্থায় রয়েছে।”
“এগুলো থেকে উত্তরণ করতে হলে ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো বাস্তবায়নে আমরা একটার পর একটা পদক্ষেপ নিয়ে যাচ্ছি এবং বাকিগুলো শিগগিরই নেওয়া হবে।
ইতোমধ্যে সামাজিক খাতে অনেক কাজ শুরু হয়েছে; ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও কৃষিঋণ মওকুফসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে” বলেন মন্ত্রী।
আগামী জুনের মধ্যে কিস্তি ছাড় হচ্ছে কি না এবং আইএমএফের কাছে বাড়তি সহায়তা চাওয়া হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী বলেন, এপ্রিলে ওয়াশিংটনে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক হবে। সেখানে এসব নিয়ে আলোচনা হবে।
কর্মসূচির বিপরীতে যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করা হবে জনিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সব একসঙ্গে করা যাবে না, আমরা বরং আমাদের মতো করে করব।”
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাসে ওয়াশিংটনে আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে ঢাকায় আইএমএফের একটি মিশন আসবে।
সেই মিশনের প্রতিবেদন আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদে পেশ হবে। আগামী জুনে পর্ষদ বৈঠক আছে; পরের মাস জুলাইয়েও আছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সফররত আইএমএফের দলের কাছে জুনের পর্ষদ বৈঠকে কিস্তি ছাড়ের প্রস্তাব উত্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে। আভাস পাওয়া গেছে, শেষ পর্যন্ত তা জুলাইয়ে গড়াতে পারে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি শুরু হয়।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়।
আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলারের ঋণসহায়তা। বাকি আছে ১৮৬ কোটি ডলার। গত ডিসেম্বরে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যে ‘অর্থনৈতিক সংকটে’ থমকে গেছে, সে কথা তুলে ধরে আমির খসরু বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অনেক কিছু থমকে গেছে, এগুলোকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। আর তা করতে গেলে সংস্কারের মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।
অর্থনীতিকে একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য উদারীকরণ, ব্যবসা সহজীকরণ, ব্যবসার খরচ কমানো ইত্যাদি নানা বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আগামী বাজেটেই এসবের প্রতিফলন থাকবে।
বৈঠক শেষে আইএমএফ কর্মকর্তা কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনকে বাংলাদেশে অর্থায়ন করা নিয়ে এক প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অর্থায়ন সংক্রান্ত আলোচনা নীতিনির্ধারণী সংলাপের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তা সরকারের সঙ্গে অব্যাহত রয়েছে।
“অর্থায়ন নিয়ে যে কোনো আলোচনা নীতিগত আলোচনার ভিত্তিতেই হয়, আর আজ সকালে মন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের সেটিই হয়েছে।”
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, “সব দেশই এখন খুব কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ প্রতিটি দেশের জন্যই এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন।”
এক্ষেত্রে আইএমএফ কীভাবে সহায়তা করবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এই বিষয়গুলো নিয়েই আমরা মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করছি এবং আমরা এ নিয়ে আরও কাজ করব।”
অর্থমন্ত্রী বলেন, “সরকারের মাত্র এক মাস হয়েছে। এই এক মাসের মধ্যে রমজান মাস ছিল, এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সংকট সত্ত্বেও পরিবহনে কোনো সমস্যা হয়নি। ঈদের সময় সবাই বাড়িতে যেতে পেরেছে, ভাড়া বাড়েনি, দ্রব্যমূল্যও স্থিতিশীল ছিল।
“গার্মেন্টস খাতে প্রতি বছর ঈদের আগে যে সমস্যাগুলো হয়, এবার তেমন কোনো অস্থিরতা ছিল না। কারণ এগুলো আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফল।
আমরা আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে পুরো রমজানজুড়ে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল।”
আমির খসরু বলেন, “তেলের বড় সংকট থাকা সত্ত্বেও তেলের অভাবে কোনো পরিবহন বন্ধ ছিল না এবং গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন সময়মতো দেওয়া হয়েছে; কোনো অস্থিরতা ছিল না।
“এ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু সরকার একা পারবে না। আমরা দেশবাসীর কাছে আবেদন করব—সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, সহানুভূতিশীল হতে হবে, আমাদের মধ্যে সংযম আনতে হবে।”
“যেহেতু যুদ্ধ কোনো সরকারের হাতে নেই, যুদ্ধ হচ্ছে অন্য জায়গায়, এর প্রভাব আমরা ভোগ করছি।
এজন্য আমাদের সংযমী হতে হবে এবং সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সবাই মিলে আমরা সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারব এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারব” আশা প্রকাশ করেন মন্ত্রী।














