সোমবার ২০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০ চৈত্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হামের প্রাদুর্ভাব: কারণ, বাস্তবতা ও করণীয়

🗓 শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১২৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬

👁️ ১২৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৪ এপ্রিল) :: বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া এক্সপ্যান্ডেড প্রোগ্রাম অন ইমিউনাইজেশন (ইপিআই) দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও শিশুদের টিকার আওতায় এনে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি এবং মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১৯৭৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) কর্মসূচির আওতায় টিকা কেনা হতো।

কিন্তু ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৫ সালে অপারেশন প্ল্যান শেষ হলেও সেটি আর বর্ধিত করা হয়নি। ধারাবাহিকতা ধরে না রাখার ফলাফল হিসেবে টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

এই সময়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, পুষ্টিসহ অনেক কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যার অন্যতম প্রাদুর্ভাব হামের সংক্রমণ। শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে; আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

হাম একটি উচ্চ সংক্রামক রোগ

ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ হাম, যা প্রধানত শিশুদের আক্রান্ত করে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজে বহু মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। রোগটি প্রতিরোধে টিকার প্রয়োজন হয়, যা বিঘ্নিত হলে অতিদ্রুত প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি করে।

প্রাদুর্ভাবের সম্ভাব্য কারণ

বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী থাকলেও ২০২৫ সালে প্রশাসনিক ও নীতিগত পরিবর্তনের কারণে টিকা সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে। অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল হওয়া। নতুন ক্রয় পদ্ধতিতে বিলম্ব। বিকল্প ব্যবস্থা প্রস্তুত না থাকার ফলে টিকা সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহে দেরি হয়েছে।

টিকাদান কার্যক্রমের সফলতা একটি ধারাবাহিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে টিকা সংকট, স্টোরে টিকা না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এতে শিশুদের নির্ধারিত সময়মতো টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রশাসনিক ও সমন্বয়হীনতার অভাব

নীতিগত পরিবর্তনের সময় যথাযথ প্রস্তুতির অভাব বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া পুনর্বিন্যাস, নতুন প্রস্তাবনা দেরিতে তৈরি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অর্থছাড়ে বিলম্ব হয়েছে। ফলে টিকাদান কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।

ইমিউনিটি গ্যাপ

টিকাদানে বিঘ্ন ঘটলে সমাজে একটি ‘সংবেদনশীল শ্রেণি তৈরি হয়; অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। হার্ড ইমিউনি ভেঙে পড়ে, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে যায়।

কেন এটি উদ্বেগজনক

হামের প্রাদুর্ভাব মানে বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। হাম শুধু একটি রোগের বিস্তার নয়। এটি বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।

অতীত সাফল্য বনাম বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন, দুর্যোগÑ সবকিছুর মধ্যেও ইপিআই সচল ছিল। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও টিকাদান কার্যক্রম চালু ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের অভাবে এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে।

করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। টিকা সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক করা। ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও সরবরাহ চেইন পুনর্গঠন। ক্যাচ-আপ ভ্যাকসিনেশন যারা মিস করেছে, তাদের দ্রুত টিকা দেওয়া। নজরদারি জোরদার করা। প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানো। সবোপরি জনসচেতনতা তৈরি ও অভিভাবকদের শিশুদের টিকাদানে উৎসাহিত করা।

দেশের টিকাদান কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে একটি সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিত হয়ে এলেও সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব দেখিয়েছে এ ধরনের কর্মসূচিতে সামান্য পরিমাণ বিঘ্নও বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি বজায় রাখা। স্বাস্থ্য খাতে টেকসই সংস্কার বাস্তবায়ন ও নিরবচ্ছিন্ন টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখা। শিশুদের এসব সুরক্ষা নিশ্চিত করলে ভবিষ্যতে এমন মহামারি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

ডা. এম আর করিম রেজা

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর