বৃহস্পতিবার ১৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি

🗓 বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

👁️ ৩৭ বার দেখা হয়েছে

🗓 বৃহস্পতিবার, ০৭ মে ২০২৬

👁️ ৩৭ বার দেখা হয়েছে

কক্সবাংলা ডটকম(৭ মে) :: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দেশে গত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়।

এতে তেলের দাম ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।

ফলস্বরূপ, খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেয়।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা মিলেই এই মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করেছে।

তবে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা পূর্বাভাস দিয়েছে, জ্বালানি পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় উন্নতি এলে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে নেমে আসতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ।

একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। খাদ্য ও অখাদ্য—উভয় খাতেই মূল্যবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ঊর্ধ্বমুখী রেখেছে।

জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহেও প্রভাব পড়েছে।

অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রী, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং অটোমোবাইলসসহ বিভিন্ন খাতে মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বিস্তৃত হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছায়। পরে মার্চে কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে আসে।

জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তবে গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় বর্তমান মূল্যস্ফীতি কিছুটা কম হলেও এখনও তা উচ্চ পর্যায়েই অবস্থান করছে।

গ্রাম ও শহরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে। এপ্রিলে গ্রামে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৫ শতাংশ, আর শহরে ৯ দশমিক ০২ শতাংশ। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরির হারও কিছুটা বেড়েছে—মার্চের ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ থেকে এপ্রিলে তা বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের প্রান্তিকে ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

এ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতির পেছনে শাকসবজি ও মসলার দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। সুদের হার ও ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বিনিময় হার, জ্বালানি ব্যয় এবং বাজার তদারকি—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, মজুদদারি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি বলে তারা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম গড়ে প্রায় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিতে চাপ সৃষ্টি করবে।

এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর আলোচনা চলছে, যা কার্যকর হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৪৮ পয়সা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, জ্বালানি খাতে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে, যা তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ধারণা করছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে পরবর্তী অর্থবছরে বৈশ্বিক চাপ কিছুটা কমে এলে তা ৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সতর্ক করে জানিয়েছে, জ্বালানি দামের ওপর চাপ অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিও প্রত্যাশার তুলনায় বেশি হতে পারে।

সংস্থাটি ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিলেও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তা আরও বাড়তে পারে।

সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ চেইনের বিঘ্ন এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা—সব মিলিয়ে দেশের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি এখনো চাপে রয়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই বিভাগ এর আরো খবর

সর্বাধিক পঠিত খবর

এই বিভাগের আরো খবর